বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীর নয়া পল্টনে পুলিশি হানায় তছনছ হওয়া দলীয় কার্যালয় পরিদর্শন শেষে অনির্ধারিত এক বিশাল জমায়েতে গণহত্যার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে প্রধানমন্ত্রীর বিচার করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, সরকার দেশে গণহত্যা চালিয়েছে। ১৭০ জন হত্যার জন্য সরকারের বিচার করা হবে। তখন এ সরকারের সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। এক নম্বর থেকে ধরে ধরে সবার বিচার হবে।
তিনি বলেন, মঞ্চ-টঞ্চ বন্ধ করুন। জনগণের মঞ্চ হলে পালাবার পথ পাবেন না। খালেদা জিয়া ১৮ ও ১৯ মার্চের হরতাল সফল করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, এখনো সময় আছে, সরকারের বোধোদয় হোক। তাদের বলব, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করে দ্রুত আপনারা ক্ষমতা ছেড়ে দিন। আটক নেতাকর্মীদের আজকের মধ্যে মুক্তি দিন। নইলে ১৮ ও ১৯ মার্চ সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল হবে। এরপর হরতাল-অবরোধসহ আরো কঠিন কর্মসূচি হবে। তখন আপনারা পালাবার পথ পাবেন না। হরতালে দোকানপাট খুলবে না। গাড়ি-ঘোড়া চলবে না। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান থাকবে হরতালে আপনাদের একটু কষ্ট করতে হবে। এই রক্তপিপাসু সরকারকে বিদায় করতে আপনারা একটু কষ্ট করুন। এই সরকারের অবশ্য পতন ঘটবে।
গত সোমবার পুলিশ দলীয় কার্যালয়ে হানা দিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। গ্রেফতার করে দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে। এই নজিরবিহীন দৃশ্য অবলোকনের জন্য প্রায় দুই বছর পর গতকাল বুধবার বিকালে দলের সদর দফতরে যান বেগম খালেদা জিয়া। হাজার মানুষের স্রোত পেরিয়ে বিকাল ৫টা ৫৩ মিনিটে তিনি প্রবেশ করেন অফিসের ভেতরে। এ সময় সড়কমালা শ্লোগানে উত্তাল ছিল। ‘খালেদা তোমার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘আপোষ না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ’আ’-তে আওয়ামী লীগ, তুই রাজাকার তুই রাজাকার, ম-তে মখা, তুই রাজাকার তুই রাজাকার, ১৮ ও ১৯ মার্চ সারাদেশে হরতাল হরতাল’ সহ বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন। বেগম জিয়া অফিসের তৃতীয় তলায় মহাসচিবের দফতরসহ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষগুলো পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি দেখেন দলের মনোগ্রামসহ চেয়ার উল্টিয়ে পড়ে আছে। মহাসচিবের টেবিলের কাঁচ ভাঙা। দুইটি দরজা কুড়াল দিয়ে পুলিশ ভেঙেছে। এ সময় পাশে দাঁড়ানো মহানগর সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা বেগম জিয়াকে জানান, এই ছোট কক্ষটিতে পুলিশের ভয়ে সেলিমা রহমানসহ ৬০ জন নেতাকর্মী আশ্রয় নিয়েছিলো। তাদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর তিনি যান দপ্তর অফিসে। সেখানে কম্পিউটার ও কাগজপত্র লণ্ডভণ্ড পড়ে ছিল। এসব দেখে খালেদা জিয়া বলেন, মনে হচ্ছে এখানে ডাকাত এসেছিলো। একটা দলের কার্যালয়ে এভাবে ভাঙচুর করে। এরকম দৃশ্য দেখে খালেদা জিয়া তছনছ এবং লণ্ডভণ্ড দৃশ্যমালা দেখে ক্ষোভে রীতিমত কাঁপছিলেন। পরিদর্শন শেষে বেগম জিয়া কার্যালয়ের দুই তলার বারান্দায় তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমবেত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। খালেদা জিয়া বক্তৃতা দেয়ার সময় দলীয় কার্যালয়ের বারান্দায় শুধু স্থায়ী কমিটির সদস্যদের দাঁড়ানোর জন্য মাইকে অনুরোধ করা হলেও অনেক নেতাই বারান্দায় ছিলেন। দশ মিনিটের মতো বক্তৃতা দেয়ার পর মাগরিবের আজান পড়ায় তিনি বক্তব্য শেষ করেন। বক্তৃতা শেষে তার নিজের কক্ষে যান। সেখানে ৭টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত ছিলেন। এরপর গুলশানের উদ্দেশ্যে নয়া পল্টন ত্যাগ করেন।
প্রশাসনের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আপনাদের বেতন হয়। গুলি চালানো বন্ধ করুন। এভাবে গুলি চালালে জনগণ একদিন আপনাদের বিচার করবে। এ গণহত্যার জন্য ট্রাইব্যুনাল হবে। তিনি বলেন, এই সরকার রক্তপিপাসু। এদের হাতে জনগণের রক্ত। এতো টাকা লুট করেছে যে, দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন পালাবার পথ খুঁজছে। পালাবার পথ খুজে পাবে না। এই সরকারকে এটাও বলে দিতে চাই এসব মঞ্চ-টঞ্চ বন্ধ করেন। জনগণের মঞ্চ তৈরি হলে আর কোন রক্ষা নাই।
খালেদা জিয়া বলেন, সোমবার পুলিশ আমাদের অফিসে ঢুকে জরুরি কাগজপত্র, টাকা-পয়সা সমস্ত কিছু নিয়ে গেছে। সবকিছু তছনছ করেছে। কাউন্সিলের কাগজপত্রও নিয়ে গেছে। জনগণের সেবক না হয়ে পুলিশ গুম, হত্যা ও লুটপাটে নেমেছে। তারা নিজেরা প্রথমে বোমা ফাটিয়েছে। অফিসে ঢুকে সবাইকে বের করে দিয়ে নিজেরা বোমা রেখেছে। বোমা রেখে বলছে বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এটা করা হয়েছে। পূর্ব পরিকল্পিত এটা বোঝা যায়। বোমা নাটক সাজিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের ফাঁসানো হচ্ছে। আমরা রাজনীতি করি বোমাবাজি করি না।
খালেদা জিয়া বলেন, সোমবার পুলিশের গুলিতে অনেক নেতা আহত হয়েছেন। পুলিশ অনেক নেতাকর্মীকে নিয়ে গেছে। অন্যদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে। সরকার পরিকল্পিতভাবে এসব করেছে। এটা জনগণের সরকার নয়, খুনি সরকার। সরকার গণহত্যা করেছে। একের পর এক মা বোন সবাইকে হত্যা করেছে। বেগম জিয়া বলেন, তারা পাবনায় আমাদের এক চেয়ারম্যানকে পুলিশ ও র্যাব ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। পরে ভেড়ামারায় লাশ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সরকার দেশে গণহত্যা চালিয়েছে। এই গণহত্যার জন্য আবারো বিচার হবে। ট্রাইব্যুনাল হবে। ১৭০ জনকে তারা হত্যা করেছে। গণহত্যার জন্য তাদের বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা আগেও বলেছি যুদ্ধাপরাধের বিচার আমরাও চাই। কিন্তু সে বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ বিচার। আমরা ক্ষমতায় গেলে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবো। সে বিচার হবে আন্তর্জাতিক মানের। তখন সব রাজাকারের বিচার হবে, আওয়ামী লীগে যেসব যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আছে তাদেরও বিচার করবো। এসময় তিনি হোম মিনিস্টারও একজন রাজাকার বলে দাবি করে বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে তাদের বিচার হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, দেশ আজ মহাবিপদের মুখে। মহাসংকটের মুখে। সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। জনগণের কোন সমর্থন নেই। সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সরকার মানুষ হত্যা করছে। নানাভাবে মানুষের উপর জুলুম চালাচ্ছে। কিসের জন্য জানেন? তাদের অপকর্ম ঢাকার জন্য। তাদের দুর্নীতি চাপা দেয়ার জন্য। হলমার্ক, ডেসটিনি, শেয়ার, পদ্মাসেতু। সেগুলো ধামাচাপা দেয়ার জন্য এসব করছে। আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালিয়েছে। একের পর এক মানুষ হত্যা করছে। এই সরকারকে এখন আর সময় দেয়া যায় না। তিনি বলেন, একদিকে সরকার বিধর্মী ও নাস্তিকদের পুলিশ পাহারায় সমাবেশ করতে দিচ্ছে। তাদের নাস্তা-হালুয়া দিয়ে লালন-পালন করছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের সমাবেশ-মিছিলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করেছে। সারাদেশে গণহত্যা চালাচ্ছে। পরিষ্কার ভাষায় বলে দিতে চাই, ‘এখনো সময় আছে। বোধোদয় হলে পদত্যাগ করে নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করুন। আন্দোলন কখনো বৃথা যায় নাই। বৃথা যায় না। আমরা শান্তিতে কর্মসূচি পালন করতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘প্রশাসনকে বলতে চাই, আপনারা এ দেশের নাগরিক। আপনারা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলেন। কথায় কথায় গুলি চালানো বন্ধ করুন। এভাবে চললে একদিন অবশ্যই জবাব দিতে হবে।’
খালেদা জিয়া বলেন, সরকার সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করছে। এই দেশ আমাদের সকলের। সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বন্ধ করুন। না হলে এর জন্য আপনাদের শাস্তি পেতে হবে। এই সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য আমরা আপনাদের পাশে আছি। সব সময় আপনাদের পাশে থাকবো। আমাদের লোকদের নির্দেশ দিয়েছি তারা সংখ্যালঘুদের পাহারা দেবে।
বক্তব্যের সময় চেয়ারপারসনের পাশে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান, আসম হান্নান শাহ, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সহ-সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, মুশফিকুর রহমান, মাহমুদুল হাসান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, রুহুল আলম চৌধুরী, হারুন অর রশীদ, শামসুজ্জামান দুদু, আবদুল হালিম, আবদুল মান্নান, আহমেদ আজম খান, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন, যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, গোলাম আকবর খন্দকার, মশিউর রহমান, আসাদুল হাবিব দুলু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কেন্দ্রীয় সাবেক নেতা নিতাই রায় চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, নাসির উদ্দিন অসীম, খায়রুল কবীর খোকন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ পরির্দশনকালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সিনিয়র নেতারা ছাড়াও ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, মহাসচিব মুফতি মুহাম্মদ ফয়েজুল্লাহ, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ ১৮ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতাও ছিলেন।
এদিকে, খালেদা জিয়ার আগমনকে কেন্দ্র করে বেলা দুইটার পর বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সম্মুখ সড়কে সমবেত হতে থাকেন। বিকাল ৫টার মধ্যে এক বিশাল সমাবেশে রূপ পরিগ্রহ করে। কাকরাইলে নাইটেংগেল মোড় থেকে ফকিরেরপুল মোড় অব্দি পুরো সড়কমালা নেতা-কর্মীর মুখর উপস্থিতি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তাদের অবিরল শ্লোগান নিনাদ এক উত্সব আবহ রচিত হয়। তবে গতকাল পুলিশের যুদ্ধংদেহী অবয়ব দেখা যায়নি। বিএনপির কার্যালয় এলাকায় কোনো পুলিশকে দেখা যায়নি। পুলিশ পল্টন থানার সামনে ও নাইটেংগেল মোড়ে অবস্থান নেয়। খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল মহানগর নাট্যমঞ্চে দলের নির্বাহী কমিটির সভা শেষে কার্যালয়ে এসেছিলেন। এর আগে ২০১১ সালের ১৭ মার্চ প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে নয়াপল্টন এলেও সে যাত্রায় তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করেননি।
