রাজনৈতিক কর্মসূচি দ্বারা সৃষ্ট আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গিয়ে পুলিশ অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সন্ত্রাসীদের তথ্য হালনাগাদ করার ‘বিট পুলিশ’ কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়েছে। শুরুতে এর তত্পরতায় জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া মিললেও এখন এর কার্যক্রম চলছে অনেকটা ঢিমেতালে। বিট পুলিশ কার্যক্রমের যাত্রা শুরুর দুই বছর পরও এর কোন সুফল মিলছে না। বিট পুলিশ কার্যক্রম থেকে রাজধানীর দাগী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের কোন তথ্যই পুলিশ রাখতে পারছে না। এ কারণে ছিনতাই, চুরি ও খুনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, গত ৬ মাসে রাজধানীতে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে বিট পুলিশের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি। পুলিশকে দিনের বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার কাজ করতে হয়েছে। দৈনন্দিন অপরাধ যেমন-ছিনতাই, চুরি ও পারিবারিক খুনের ঘটনা একদিকে যেমন বাড়ছে, অপরদিকে, এসবের তেমন কোন তদন্তও হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড পাবলিক রিলেশন শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এখন পুলিশকে বেশি সময় দিতে হচ্ছে। এ কারণে বিভিন্ন মামলার তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেফতার, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার কার্যক্রম অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। দাগী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তথ্য সংগ্রহের কাজও ঢিমেতালে এগিয়ে চলছে।’ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড কমিউনিকেশন শাখা থেকে গত দুই মাসে সাংবাদিকদের জন্য পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৫০টি থানায় কোন আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। মাদকের চালান উদ্ধারের মধ্যে গত মার্চে রাজধানীতে ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে আড়াই মাসে রাজধানীতে লাশ উদ্ধারসহ ১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে শুধু ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন খুনের ক্লু বের করা ছাড়া আর কোন সাফল্য নেই।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড পাবলিক রিলেশন শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে জাপানি পুলিশিংয়ের আদলে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিট পুলিশ দিয়ে বিট নোট বুক চালু করে। ‘বিট পুলিশ’ নামে ডিএমপির এই ইউনিটে একজন সাব-ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে ৩ জন করে কনস্টেবল দেয়া হয়। পুলিশী সাহায্য পেতে পাড়া-মহল্লায় রাস্তার পাশে অফিস নেয়া হয়। সেই সঙ্গে দেয়ালে দেয়ালে বিটের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টরের মোবাইল নম্বর লিখে তা টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়। ৫০ থানার পাড়া-মহল্লাকে ৬শ’ বিটে ভাগ করে প্রায় ৫ হাজার বিট ক্রাইম নোট বুক সরবরাহ করা হয়। একটি নোট বুকে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৩৮টি কলাম করা রয়েছে। প্রতিটি কলামে অপরাধের ধরন বা ঘটনা লিখতে হয়। একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে তার ৮ ঘণ্টা ডিউটিকালীন ওই থানা এলাকার সবধরনের অপরাধ বা সম্ভাব্য অপরাধের ঘটনা অথবা সন্ত্রাসীদের অবস্থান সম্পর্কে এই বিট ক্রাইম নোট বুকে লিখে সংশ্লিষ্ট থানার ডিউটি অফিসারের কাছে জমা দেয়ার কথা। ডিউটি অফিসার নোট বুক পড়ে সেখান থেকে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন। থানায় একজন সাব-ইন্সপেক্টর এই বিট ক্রাইম নোট বুক নিয়ন্ত্রণ করেন।
তবে এ ব্যাপারে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, খিলগাঁও, উত্তরা পশ্চিম ও পূর্ব, কলাবাগান, মিরপুর, শাহআলী, দারুস সালাম, কাফরুল, মোহাম্মদপুর, আদাবর, কোতয়ালী, শ্যামপুর, সুত্রাপুরসহ ২০টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ‘বিট পুলিশ’ কার্যক্রমের ব্যাপারে তারা জানান, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, ব্যক্তিগত অপরাধমূলক মামলার তদন্ত, মাদক দ্রব্য উদ্ধার কার্যক্রমে তেমন কোন সাফল্য নেই। গত ২/৩ মাস ধরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশকে বেশি সময় দিতে হচ্ছে। থানার সাব-ইন্সপেক্টররা ‘বিট পুলিশ’ কার্যক্রমে তাদের প্রতিদিনের ডায়েরিতে তথ্যও লিখতে পারছেন না। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড পাবলিক রিলেশন শাখার ঐ পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, বিট পুলিশের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। এর কার্যক্রম আছে এবং থাকবে। এটাকে আরো গতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
