পবিত্র হজ্ব মানে মুসলিম মিল্লাতের বার্ষিক বিশ্ব সম্মেলন। যে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য ও ঐক্যের মেলবন্ধন গড়ে উঠে। দেশে দেশে মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব-দূরত্ব ও অশান্তি হানাহানি দূর হয় পবিত্র হজ্বের মিলনোত্সবের মাধ্যমে। হাজীদের সেবায় দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে এ বছর হজ্ব ও ওমরায় গমণেচ্ছুদের উদ্দেশ্যে পবিত্র হজ্ব ও ওমরা পালন যাতে সহজ ও নির্বিঘ্ন হয় এবং হজ্ব কার্যক্রমের বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি-অসঙ্গতি যেন লাঘব হয় সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সহ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের দেশে সরকারি অফিস আদালতে অব্যবস্থাপনা নতুন কিছু নয়। পাসপোর্ট অফিসে এমনিতেই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও হয়রানি একটি সাধারণ চিত্র। হাজীদের সুবিধার্থে ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ বিভাগীয় ও জেলা
শহরগুলোতে পাসপোর্ট অফিসে আলাদা হজ্ব বুথ স্থাপন করা জরুরী। এতে হজ্ব গমণেচ্ছুদের ভোগান্তি অনেকাংশে লাঘব হবে। মক্কা-মদীনা শরীফে উজরাতুল হজ্ব বা হজ্ব মিশনে আরবী-ইংরেজি-বাংলা ভাষা জানা দক্ষ লোকবল সংকটের কারণে হাজী সাহেবানরা ভোগান্তিতে পড়েন। সৌদি মুয়াস্সাসা বা ধর্ম মন্ত্রণালয়েও দোভাষী লোকের সংকট আছে। ফলে সেখানে অতি প্রয়োজনীয় মুহুর্তেও মন খুলে কথা বলতে ব্যর্থ হন বাংলাদেশী হাজীসহ প্রবাসীরা। তাই বাংলাদেশ দূতাবাস, মক্কা-মদীনার হজ্ব মিশনসহ সংশ্লিষ্ট অফিস সমূহে বাংলা ভাষা সহ বিভিন্ন ভাষা জানা দক্ষ লোক নিয়োগে সরকারের কূটনৈতিক প্রয়াস চালাতে হবে। তাছাড়া হজ্ব যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ওপেন স্কাই (Open sky) তথা সকল এয়ারলাইন্সকে হজী পরিবহনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি এয়ারলাইন্সের একতরফা সিদ্ধান্ত ও খামখেয়ালীপনার কারণে বাংলাদেশের হজ্বযাত্রীরা এ দুটি এয়ারলাইন্সের কাছে একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়ে। এ দুটি এয়ারলাইন্সের একগুঁয়েমীর ফলে কোন হাজী জরূরী প্রয়োজনেও পছন্দ অনুযায়ী আসা যাওয়া করতে ব্যর্থ হয়। ৩০ দিনের স্থলে কোন কোন হজ্বযাত্রীকে ৪০-৪৫ দিন পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্ব্বেও বিমানের শিডিউল না পাওয়ার কারণে অলস সময় কাটাতে হয় সৌদি আরবে। আবার বাংলাদেশ থেকে কাঙ্খিত দিনে সৌদি আরবে যেতে পারেনা এয়ারলাইন্স দুটির অসহযোগিতার কারণে। তাই হজ্বযাত্রীদের সুবিধার জন্য হজ্বযাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে ওপেন স্কাই (Open sky) তথা আকাশ খুলে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে। কাতার, এ্যামিরেটস, কুয়েত, গালফ, এয়ার এরাবিয়া সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের হজ্বযাত্রী পরিবহনের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ সরকার ঐসব এয়ারলাইন্সকে হাজী পরিবহনের সুযোগ দেয়না। যার ফলে হাজীদের এহরাম পরিধানরত অবস্থায় এয়ারপোর্টের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা যায় যা পবিত্র হজ্বব্রত পালনের জন্য বিশুদ্ধতার পরিপন্থী। অপরদিকে হাজীদের তদারকির জন্য মালটিপল ভিসা দেওয়া হয়, অথচ হজের সময় মাল্টিপল ভিসাধারী কেউ হাজীদের সঙ্গে থাকলে তাকে পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হয়। এই অযৌক্তিক নিয়ম সংশোধন করতে হবে। এবং হজ্বের চুক্তির টাকা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ রমজান পর্যন্ত বাড়ানো আবশ্যক। হজ্ব এজেন্সি ও হাজীদের স্বার্থে রিপ্লেসমেন্ট পদ্ধতি বহাল রাখতে হবে। হজ্ব গমণেচ্ছুদের একটা বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত যে, একজন হজ্বযাত্রীর মনোবাঞ্ছা হলো নির্বিঘ্নে হজ্বের যাবতীয় রুকনগুলো আদায় করে পরিপূর্ণতার সাথে হজ্ব পালন; আর একটা কাফেলার দায়িত্ব হবে তার হাজীদের হজ্ব পালনে সার্বিক সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের দেশের হাজীদের বেলায় যা দেখা যায়- কাফেলার অতীতের অজ্ঞিতা যাচাই না করেই কম টাকায় হজ্ব করার প্রলোভনে পড়ে পুরো হজ্বটাই নস্ফিল করে দেন। কেননা কম টাকায় বেশি সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা আদৌ সম্ভব নয়। তাই স্মর্তব্য যে, স্বাভাবিক খরচের চেয়ে কম টাকায় হজ্ব চুক্তি করে যারা হজ্বে যাচ্ছেন তারা নিশ্চিত দুর্ভোগের শিকার হবেন। এ বছর হজ্ব পালনে যারা ইচ্ছা পোষণ করছেন মহান আল্লাহর দরবারে তাদের সকলের হজ্ব কবুল হোক এই প্রার্থনা করছি, আমিন।
লেখক :ব্যবস্থাপনা অংশীদার,
শাহ আমানত হজ্ব কাফেলা ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস
