বিজয় সরকার

কবিগানের মুকুটবিহীন সম্রাট

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৩, ১৯:১১
বিজয় সরকার প্রায় সারা জীবন এমন এক ধরনের গানের পেশাদার শিল্পী ছিলেন, যে গানের নামের সাথে কবি শব্দটি জড়িত। লোকগানের এই ধারাটির নাম কবিগান, আর এই গানের গায়ককে বলা হয় কবিয়াল। কবিগানের প্রচলন এখনও বাংলাদেশে রয়েছে, তবে বাঙালিদের বিনোদনের নানা উপকরণের ভীড়ে অনেক সময় তা চোখে পড়ে না। তাছাড়া মূলত হিন্দুদের পূজা-পার্বণ উপলক্ষে এই গানের আয়োজন হয়ে থাকে এবং এই গানের অনেকটা জুড়ে হিন্দুধর্ম ও পুরাণের প্রসঙ্গ থাকায় অন্যান্য ধর্মের মানুষ এতে শ্রোতা হিসেবে কম উপস্থিত থাকেন। কিন্তু যারা এই গান শুনেছেন, তারা জানেন এই গান নেহায়েতই হিন্দুয়ানি কোনো ব্যাপার নয়। রেডিও কিংবা টেলিভিশনে কালেভদ্রে অবশ্য কবিগান পরিবেশিত হয়, অনেকেই তা শুনে কবিগান সম্পর্কে হয়তো একটা খণ্ডিত ধারণা পেয়ে থাকবেন। এসব প্রচার মাধ্যমের কবিগান আধঘণ্টা থেকে বড়জোর একঘণ্টা ধরে চলে। কিন্তু সত্যিকারের কবিগান গাইতে অন্তত ঘণ্টা ছয়েক সময় তো লাগবেই, ক্ষেত্রবিশেষে তা শেষ হতে একটানা আট-দশ ঘণ্টাও লাগে। ফলে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের এই কবিগান শুনে কবিগানের প্রকৃত রূপটি বোঝা যাবে না। কবিগান মূলত একরকম প্রতিযোগিতামূলক গান; একে সাঙ্গীতিক বিতর্ক বললেও ভুল হয় না। তবে এই বিতর্কে শুধু খটখটে ক’টি তথ্য, যুক্তি আর তর্কের প্যাচ জানলেই চলে না। এতে লাগে বাগ্মিতা, নানা বিষয়ের জ্ঞান বিশেষত বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র বিষয়ে জ্ঞান, গানের গলা, গান ও ছড়া বাঁধার শক্তি, প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব, অভিনয় দক্ষতা, ছন্দে ছন্দে কথা বলার ক্ষমতা এমনকি শারীরিক ভাষাও। সমগ্র পৃথিবীর ফোকলোর চষে বেড়ালেও হয়তো এমন একটি ধারা মিলবে না, যেখানে কোনো লোকধারার শিল্পীকে একসাথে এতগুলো গুণ প্রায় সমভাবে প্রয়োগ করতে হয়। কবিগান এজন্য সংস্কৃতির অনন্য একটি শাখা। একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন হয় বলে কবিগান গেয়ে সাফল্যলাভ করা সহজসাধ্য নয়। আর শুধু মুখস্ত করে আর শিখেও এই গানে খুব সুবিধে করা যায় না। একজন কবিয়ালকে সবসময় হতে হয় সৃজনশীল। গানের আসরে বসে বসেই কবিয়ালকে শত শত রাতজাগা চোখের সামনে হঠাত্ হঠাত্ তৈরি করে ফেলতে হয় এক একটি গল্প অথবা এক একটি কালজয়ী গান, কিংবা প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার নতুন কোনো জোরালো প্যাঁচ। বিজয় সরকার মূলত এই কবিগানের একজন পেশাদার শিল্পী ছিলেন; এই গানের সূত্রেই তিনি কবিয়াল বা লোককবি। এই গানকে তিনি এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁকে যদি সর্বকালের সেরা কবিয়াল বলা হয় তাহলেও বাড়িয়ে বলা হয় না। কবিগানের শুরুটা অবশ্য তেমন শোভন রূপে হয়নি। বিশেষত কলকাতার আশেপাশের কবিগানের গায়করা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ধর্ম, সমাজতত্ত্ব, গ্রাম্য পণ্ডিতী আর খিস্তি একইসাথে মিশিয়ে যে বস্তু পরিবেশন করতেন তা হজম করা সহজ ছিল না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, কোথাও কোনো ঝগড়াঝাটিতে যদি দুই পক্ষ ভয়ানক মুখ খারাপ করে প্রতিপক্ষকে গালাগাল করতো তাহলে তাকে কবির লড়াইয়ের সাথে তুলনা করা হতো। বিজয় সরকার যদি এই জাতীয় একজন কবিয়াল মাত্র হতেন, তাহলে তাঁকে আমরা ভুলে যেতে পারলেই খুশি হতাম। কিন্তু নেহায়েত বায়না গেয়ে হাতেগরম কিছু বাহবা ও টাকা পেয়ে বিজয়ের প্রতিভা ফুরিয়ে যায়নি। বরং এই গানে তিনি এমন মৌলিক কিছু সংযোজন আনেন, যা কবিগানের আসরে ছিল অভিনব। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ধুয়া গান। ধুয়া গান হলো কবিগানের ছড়া পাঁচালির মধ্যে মধ্যে গাওয়া একটি স্বতন্ত্র গান। স্বরোচিষ সরকার লক্ষ করেছেন, “কলকাতা পর্বের কবিগানে আদিরসাত্মক প্রসঙ্গ যেমন শ্রোতাদের বাড়তি আগ্রহের বিষয়” ছিল, পূর্ববঙ্গ পর্বে ধুয়া গান ছিল বাড়তি একটি আগ্রহের বিষয়। গানের মধ্যে তারা মাঝে মাঝে চিত্কার করে বলে উঠতেন, ‘লাল দাও’, ‘মোটা দাও’। এই দাও-এর মানে হলো আদিরস দাও। এই লাল ও মোটা বস্তুদ্বয়ের প্রতি যেসব শ্রোতার ঝোঁক, তাদের যদি শুধু গান আর ধর্মতত্ত্ব শুনিয়ে সারারাত শান্ত রাখা সহজ কথা নয়। তা করতে হলে প্রয়োজন এমন অনন্য ভাব ও সুরের, যা তাদেরকে অশ্লীলতার দুর্নিবার আকর্ষণ থেকে সরিয়ে এনে মগ্ন শ্রোতা করে তুলতে পারে। তারক সরকার (১৮৪৭—১৯১৪) থেকে শুরু করে পূর্ববঙ্গের কবিয়ালরা এই চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু কাজটি ঠিক ঠিকভাবে করা হয়ে উঠছিল না। বিজয় সরকারও এই চেষ্টা করতে গিয়ে উপযুক্ত কথা ও সুর-সমৃদ্ধ গানের অভাব বোধ করেছিলেন। একপর্যায়ে তো এসব স্থলে রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১—১৯৪১), নজরুল (১৮৯৯—১৯৭৬) ও জসীউদ্দীনের (১৯০৩—১৯৭৬) লেখা গান ধুয়া হিসেবে গাইতেন। এই অভূতপূর্ব ধুয়াও নাকি বিজয় সরকারের পরিবেশনের গুণে বেশ উতরে যাচ্ছিল, কিন্তু তাতে কবিগানের মজাটা ঠিক ঠিক হচ্ছিল না। ফলে অচিরেই এসব গানকে ছুটি দিয়ে বিজয় সরকার নিজেই গান লিখে তাতে সুর দিতে থাকলেন। ধুয়া হিসেবে গাওয়া এবং না গাওয়া এরকম প্রায় পৌনে চারশত গান তিনি লিখেছিলেন ও তাতে সুরারোপ করেছিলেন। তাঁর জন্মের পর একশত দশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আজও সেই গানগুলো অসাধারণ আবেদন নিয়ে বাঙালি লোকসংগীতের শ্রোতাদের মুগ্ধ করে যাচ্ছে। বিজয় সরকারের জন্ম হয়েছিল ১৯০৩ সালে নড়াইল জেলার ডুমদী গ্রামে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বিজয়কৃষ্ণ অধিকারী। তবে অধিকারী উপাধিটাও বিজয় সরকারের নিজের দেওয়া। তাঁর পারিবারিক উপাধি ছিল বৈরাগী। তাঁর পিতার নাম নবকৃষ্ণ বৈরাগী, মায়ের নাম হিমালয় কুমারী। বাল্যকালে যখন তাঁর উপাধি পাল্টানোর মতো বুদ্ধি হয়নি, তখন তিনিও নিশ্চয়ই বিজয়কৃষ্ণ বৈরাগীই ছিলেন। ১৯২৯ সালে থেকে তিনি কবিগানের দলনেতা হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন। তখনকার সময়ে বিভিন্ন লোকগানের দলের দলপতিদের অধিকারী হিসেবে সম্বোধনের চল ছিল। বিজয় যে বৈরাগী উপাধি ত্যাগ করে অধিকারী উপাধি বেছে নিয়েছিলেন, কবিগানের দলনেতা হওয়া তার একটি কারণ হতে পারে। তবে কবিগান গাইতে গিয়ে তাঁর এই অধিকারী উপাধিও তিনি একপ্রকার হারিয়ে ফেলেছিলেন। কবিগানের গায়কদের আজও লোকে ‘কবির সরকার’ বলে চেনে। কবিয়ালের পৈত্রিক উপাধি যাই হোক না কেন, শ্রোতাদের কাছে সব কবিয়ালই আসলে ‘সরকার’। এভাবে বিজয়কৃষ্ণ অধিকারী শ্রোতাদের কাছে বিজয় সরকারে রূপান্তরিত হন; একপর্যায়ে বিজয় নিজেও নাম সই করার সময় ‘অধিকারীর’ পরে একটি বন্ধনী দিয়ে ‘সরকার’ লিখতেন। এভাবে একজীবনে তিনি তিনটি উপাধি ধারণ করেছিলেন। বিজয় সরকারের জীবনের সাথে আরও বিচিত্র সব বৈশিষ্ট্য জড়িত। তিনি নিজে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ, দুটো স্বাধীনতা সংগ্রাম একবারে ভিতরে থেকে দেখেছেন। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শাসন, পাকিস্তানি সামপ্রদায়িকতাবাদী শাসন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পশ্চিমবঙ্গের বাম শাসন, অনেকরকম সামরিক শাসন, অনেকগুলো সামপ্রদায়িক দাঙ্গা—এসব তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। বাল্যবয়সে তাঁকে আর্থিক দৈন্যের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। পরিণত বয়সে সেই তিনিই বাংলাদেশের কবিগান গায়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় করেন। ১৯২৯ সালে শুরু করে টানা পঞ্চাশ বছরেরও বেশি তিনি কবিগান গেয়েছেন। জানা যায়, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি চার হাজারেরও বেশি আসরে কবিগান পরিবেশন করেন। এছাড়া তিনি বিনা পারিশ্রমিকে রামায়ণ গানও পরিবেশন করতেন। ফলে ধরে নেওয়া যায়, তিনি সামনাসামনি দাঁড়িয়ে সারা জীবনে অন্তত কোটি খানেক দর্শককে গান শুনিয়েছেন; এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই খালি গলায় তাঁকে এই কাজটি করতে হয়েছে। তাঁর আগে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কেউ এত বিরাট সংখ্যক শ্রোতাকে এভাবে খালি গলায় গান শোনাতে পেরেছেন কিনা, সন্দেহ করি। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসেও বৈচিত্র্য ছিল অসাধারণ। জানা যায়, প্রথম জীবনে বিজয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাঁদঘাট চাদড়া গ্রামের সাধক লোকনাথ ফকিরের ধর্মীয় মতে বিশ্বাস স্থাপন করে জপতপ করতেন। গোপালগঞ্জের দুর্গাপুরে মনোহর সরকারের কাছে যখন তিনি কবিগান শিখছিলেন, তখন তিনি হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২—৭৮) প্রবর্তিত মতুয়া মতে দীক্ষা লাভ করেন। তাঁর আরেক কবিগানের গুরু রাজেন্দ্রনাথ সরকারের (১৮৯২—১৯৭৪) প্রভাবে কিছুদিন পর তিনি ‘আকারও নিরাকারবাদে’ বিশ্বাস স্থাপন করেন। আবার জীবনের শেষ বেলায় তিনি বৈষ্ণব মতের আদর্শ নিষ্ঠা রেখে শিষ্যদের দীক্ষাদান শুরু করেন। এছাড়া তাঁর ভবানী বিষয়ক গান শুনলে তাঁকে অনায়াসে একজন শাক্তভক্ত বলে শনাক্ত করা চলে। তবে এর মধ্যে আরেকটা ব্যাপার তিনি ঘটিয়েছিলেন, যে কাজের সাথে তাঁর সময়কার কেবল রমেশ শীলের ধর্মচর্চার কিছুটা তুলনা চলে। রমেশ শীল চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডারী তরিকার পীর সৈয়দ গোলামুর রহমানের (১৮৬৫—১৯৩৭) কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে একপ্রকার প্রেমবাদী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন; হিন্দুধর্ম ও ইসলাম ধর্ম মিলিয়েই তিনি উপাসনা করতেন। সারা জীবন তিনি অসামপ্রদায়িক ও মানবতাবাদী ধারার সঙ্গীত সাধনা করেন। বিজয় সরকারও তাঁর ধর্ম জীবনের এক পর্বে পেড়লীর পীরসাহেব কেবলা মাওলানা ফয়েজ আহমদ ফায়েজীর বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফয়েজ আহমদ ফায়েজীর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন কিনা জানা যায়নি, তবে বিজয় সরকার গবেষক মহসিন হোসেন দাবি করেছেন বিজয় সরকার তাঁর কাছে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, দশ বছর যাবত তাঁর কালেব ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ জিকিরের শব্দ হয়েছে। বলা বাহুল্য, আল্লাহ নামের প্রতি আন্তরিক অনুরাগ ব্যতীত দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের জিকির চর্চা সম্ভব নয়। কয়েক বছর লোকনাথ ফকিরের নাম, কয়েক বছর হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের নাম, কয়েক বছর নিরাকার উপাসনা, কয়েক বছর ভক্ত মুসলমানের মতো আল্লাহর নাম, কয়েক বছর কৃষ্ণ নাম এবং প্রতিবছরই একাধিকবার দুর্গা কিংবা কালীর নাম—আমাদের একমুখীন ও ডগম্যাটিক ধর্মভাবনার সাথে এই ধরনের ধর্মচর্চা বিস্ময়েরই উত্পাদন করে। ব্রাহ্মবান্ধব উপাধ্যায় (১৮৬১—১৯০৭), কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া মূলধারার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার সাথে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এরকম উদাহরণ দেখা পাওয়া যায় না। বিজয়ের এই ধর্মচর্চা শুধু নেহায়েতই উপাসনার মধ্যেই সীমিত ছিল না। পাকিস্তানের প্রবল সামপ্রদায়িক পরিবেশ ও ধর্মান্ধতার মধ্যে বাস করেও তিনি বাস্তব জীবনে এমন কিছু উদাহরণ স্থাপন করেছেন যা অতুলনীয়। তিনি যখন কবিয়াল হিসেবে খ্যাতির মধ্যগগনে বিরাজ করছেন, তখন পাকিস্তান রাষ্ট্রটি শনৈঃ শনৈঃ দানবে রূপান্তরিত হচ্ছে। সামপ্রদায়িকতাকে নানাভাবে যত্ন করে বড় করে তোলা হচ্ছে। রাষ্ট্রনীতিতে ধর্মের প্রবল খেলা শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতিকর্মীরা তখন নানারকম নিষেধাজ্ঞা আর ভীতির মধ্যে কালযাপন করছেন। তখন কিন্তু বাংলার গ্রামে গ্রামে রাতের পর রাত জেগে বিজয় সরকার অসামপ্রদায়িকতা, পরধর্মসহিষ্ণুতা আর মানবতার গান শুনিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর গানকে যে কেউ কেউ অর্ফিউসের বীণার সাথে তুলনা করেছেন, তা নেহায়েতই বাড়িয়ে বলা নয়। দুর্লঙ্ঘ্য দুর্যোগের মধ্যে সুরের মায়াজালে সকলকে প্রশান্ত ও আশান্বিত করা ছিল অর্ফিউসের বীণার একটি বিশেষত্ব। গ্রামে গ্রামে গানের সুরে সুরে বাঙালির চিরায়ত সমন্বয়ী দর্শনকে যেসব লোকসাধকরা যুগে যুগে সঞ্জীবিত রাখেন, বিজয় ছিলেন তাদেরই বিশ শতকীয় প্রতিনিধি। কবিগানে প্রায় রাতভর তিনি হিন্দুধর্মের নানান শাস্ত্র আউড়ে যেতেন, কিন্তু একটিবারও তাঁর মুখ দিয়ে বের হতো না যে, তাঁর ধর্মটাই একমাত্র সত্য বা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ধর্ম। কোনোভাবেই অন্য ধর্মকে হেয় না করেই হিন্দু ও মুসলমানের শাস্ত্রগ্রন্থ পাশাপাশি উল্লেখ করে দেখাতেন যে মানুষের পরমার্থিক গন্তব্য আসলে অভিন্ন। মূলধারার সংস্কৃতিকর্মীরা যেখানে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব আলোচনা তাদের কর্তব্যের মধ্যে গণ্য করেন না, সেখানে বিজয় সরকারের মতো লোকসংস্কৃতির কর্মীদের প্রতিদিন যাপন করতে হয়েছে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করার মতো অতি সংবেদনশীল একটি বিষয়কে আলোচনা করে। কিন্তু আশ্চর্য দক্ষতায় সারাজীবনে একটিবারও হিন্দু মুসলমান কারো রোষের উত্পাদন না করে গানে আলোচনায় গল্পে এই কাজটি করে গেছেন। এটিকেই বলে সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীলতা। শিল্পীর কাজ যে শুধু বায়না পেয়ে গান গেয়ে আসা নয়, বরং আনন্দে প্রমোদেও কীভাবে লোকচেতনা পরিবর্তনের কাজটি করে দেওয়া যায়, বিজয় প্রতিনিয়ত সেই চেষ্টা করে গেছেন। ধর্মের বাহ্যিক আড়ম্বর ও মাতামাতিকে তিনি বলতেন, “ছোবড়া নিয়ে টানাটানি করে লাভ নেই, নারিকেলের শাঁসটাই আসল। তাঁর অশেষ মূল্যবান উপলব্ধি, “বেদ-বেদান্ত-কুরআন-পুরাণ পড়ে কী হবে? মানুষের ভালোবাসার অনুভূতিই হলো প্রকৃত ধার্মিকের লক্ষণ।” পাকিস্তান আমলে যখন ‘সরকারি ধার্মিক ও রাজনীতিকরা’ অন্য ধর্মকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করাকে তাদের পবিত্র দায়িত্ব বলে গণ্য করছেন, তখন কবিয়াল বিজয় সরকারের মতো শিল্পীরা সব দেখেশুনেও অসামপ্রদায়িক ধর্ম ও সংস্কৃতির ধারাটি প্রবলভাবে ধরে রেখেছেন। বিজয়ের এই অসামপ্রদায়িক ধর্মচেতনা আজও আমাদের কাছে পাথেয় স্বরূপ। নজরুলের গানের মতো বিজয় সরকারের গানকেও অনায়াসে ইসলামি গান ও হিন্দুয়ানি গান বলে শনাক্ত করা যায়। ধর্মের ব্যাপারে আমরা মূলত ডগম্যাটিক ভাবনায় অভ্যস্ত, ফলে যখনই এই ডগম্যাটিক ধর্মের ছকের বাইরে গিয়ে কাউকে হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই ধর্ম নিয়ে সমান আন্তরিক গান বা কবিতা লিখতে দেখি, তখন তাঁকে একরকম সন্দেহ করি। ভাবি, লোকটি একই মুখে যখন হিন্দু ধর্মের মহিমা কীর্তন করছে আবার ইসলাম ধর্মেরও মহিমায় বিগলিত হচ্ছে, তখন লোকটির মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো দূরভিসন্ধি আছে। নজরুলের হিন্দুয়ানি ও মুসলমানি গানগুলোকে অনেকেই যেমন গ্রামোফোন কোম্পানির কাঁচা টাকার দোহাই দিয়ে এই রহস্যের একটা কিনারা করতে চেষ্টা করেছেন। বিজয় সরকারের ক্ষেত্রে এই সন্দেহ আরও প্রবল হতে পারে। কারণ, তিনি তো শুধু হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্ম নিয়ে গানই করেননি, লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে এই দুই ধর্মের শ্রেষ্ঠতম মহিমাসমূহ বর্ণনাও করেছেন। ১৯৭৮ সালের ২১শে মে খুলনার হাদিস পার্কে মোসলেম বয়াতি ও বিজয় সরকারের মধ্যে কবি ও জারির পাল্লা হয়েছিল। এখানে বিজয় নিয়েছিলেন মুসলমানের পক্ষ আর মোসলেম বয়াতি হিন্দুর পক্ষ। এই গানে বিজয় সরকার ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে যা বলেছিলেন, তা অনেকেরই বিস্ময় উত্পাদন করেছিল। বিজয় সরকারের এইসব ধর্মালোচনা কিংবা গানের সব কি হিন্দু ও মুসলমান শ্রোতাদের স্রেফ খুশি রাখার জন্য করতে হতো? সব কি নেহায়েতই বায়নার টাকা উসুল করার জন্য? তাহলে তিনি দশ বছর আল্লাহ নাম জিকির করছিলেন, তার ব্যাখ্যা কী হবে? মনে মনে জিকিরের কাজটিতো তিনি কারও বায়না পেয়ে করেননি! তাছাড়া দর্শকদের মধ্যে নগদ বাহবা পাওয়া কিংবা রাষ্ট্রের আনুকূল্য পাওয়ার সস্তা সুযোগও তাঁর ছিল। তাঁর সময়ের অনেকেই তো মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬—১৯৪৮), লিয়াকত আলী খান (১৮৯৫—১৯৫১), আইউব খান (১৯০৭—১৯৭৪) প্রমুখ পাকিস্তানের হর্তাকর্তাদের নিয়ে গান ও কবিতা লিখে খাতা ভরে ফেলেছেন। কেউ কি খুঁজে দেখাতে পারবেন বিজয় খ্যাতি বা আনুকূল্য পাওয়ার জন্য এদের নিয়ে একটি গানও গেয়েছেন? আমার মনে হয়, এভাবে শুধু লাভ-লোকসান আর দর্শকের কথা ভেবে তিনি হরেক রকম গান গেয়েছেন—এভাবে ভাবলে বিজয় সরকারের প্রতি সঠিক বিচার করা হয় না। আমার ধারণা, বিজয় নিজে যা বিশ্বাস করেননি, কবিগানের শ্রোতাদের কথা ভেবে তা পরিবেশন করেননি। তাহলে তিনি অনায়াসে কবিগানসুলভ অশ্লীলতার সোজা পথ বেছে নিতে পারতেন, পারতেন কায়েদে আজম কিংবা পাকিস্তান নিয়ে অনেকগুলো প্রশস্তি রচনা করতে। বিজয় সরকার নিজেকে পাগল বলেই প্রায় প্রতিটি গানের ভণিতায় উল্লেখ করেছেন। এই পাগল অভিধাটির মধ্যে তাঁর সারা জীবনের গানের মধ্যে একটি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। বিজয়ের উপলব্ধি, “দাও না ধরা যাও না দূরে আমাকে রেখে, লুকায়ে লুকায়ে হাসো আড়াল থেকে” অথবা “কত জনের ভালোবাসা পেলাম জীবনে, জীবন তো জুড়ায় না দয়াল তোমা বিহনে”। এই প্রিয়পরমের জন্য তিনি পাগল ছিলেন: এই পাগল মানসিক ভারসাম্যহীনতা নয় মোটেই, বরং স্রষ্টার প্রেমে আউলিয়া হয়ে যাওয়া। এজন্য তিনি তাঁর গানে অঝোরে কেঁদে গেছেন। তাঁর গান শুনলে মনে হয় অশ্রুই তাঁর উপাসনার শ্রেষ্ঠতম উপাচার। জীবনের যেসব উপাদান ও অনুষঙ্গে মানুষ কেঁদে ফেলে অথবা খুব মন খারাপ হয়ে যায়, বিজয়ের গান সেখানে স্পর্শ করেছে। এমনকি যেখানে মন খারাপের ব্যাপারটি আসে না, সেখানেও বিজয়ের গান শুনলেও মনে হয় একটু কেঁদে তৃপ্তি পাই। তাঁর অসংখ্য গান শুনলে এমন উপলব্ধি হয় যেন এগুলো শুধু গান নয়, বরং অঝোর ধারার সুরের অশ্রু যেন—অসীম ক্রন্দনে কেঁদে চলেছে। এটি বিজয়ের অনন্য বৈশিষ্ট্য। বাংলার কোনো মরমির গানে এত অশ্রু নেই। লালন শাহ (১৭৭২—১৮৯০), হাসন রাজা (১৮৫৪—১৯২২), রমেশ শীল (১৮৭৭—১৯৬৭) প্রমুখ সকলের কথা মনে রেখেও একথা বলা যায়। এসব মরমিদের গানে বক্তব্য আছে, শ্লেষ আছে, আধ্যাত্মিকতা আছে, তত্ত্ব আছে, প্রেম আছে, বিরহ আছে, অশ্রুও আছে। কিন্তু সবখানে এত মরমে কেঁদে যাওয়া নেই; এঁদের সুরের মধ্যে বিরহ ও কান্না সবচেয়ে প্রধান হয়ে ওঠেনি। প্রিয় বিচ্ছেদ আর ঈশ্বর বিচ্ছেদ বিজয়ের গানে একাকার হয়ে গিয়েছে। তাঁর কান্না ও বিরহবোধ ছিল সর্বত্রগামী—প্রিয়কে ভাবতে ভাবতে তিনি কেঁদেছেন, প্রিয়কে কাছে পেয়েও কেঁদেছেন, প্রিয় বিরহেও তিনি কেঁদেছেন। বিধাতাকে নিয়ে তো কান্না ছাড়া তার কোনো গানই নেই। এমনকি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন নিয়েও যে গানখানি, তাতেও কান্নার পরশ। বিজয়ের মিলনাত্মক গানেও অশ্রুভরা। সমগ্র বাঙালির লোক-অনুভূতির সবটুকু অশ্রু যেন বিজয়ের গানে মূর্ত সুর হয়ে গেছে। বিজয়ের গানের মাঝে যে বাজনাটুকু থাকে, সেখানে যে করুণ রসের পিচ থাকবে এটিই যেন স্বাভাবিক। কালজয়ী স্রষ্টাদের একটি প্যাটার্ন বা লক্ষণ সৃষ্টি হয়, যা দেখে তা শুনে বলে দেয়া যায়, ওটি কার। রবীন্দ্রনাথের গান অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু শুনেই বলে দেওয়া যায় যে, ওটি রবীন্দ্রনাথের। নজরুলেরও তাই। লালন, হাসন রাজারও তাই। বিজয়ের গানে ঠিক এই প্যাটার্নটি আছে। কবি আবদুল কাদির (১৯০৬—১৯৮৪) তাঁর গানে অনেকক্ষেত্রে ছন্দের ঘাটতি লক্ষ্য করেছিলেন, আমরাও তা লক্ষ্য করি। কিন্তু আমাদের কত ছান্দসিকও যে স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন! বিজয় তার এই আপাত কম ছন্দের গানে কী অপূর্ব সুর দিয়েছেন আর কীভাবে তা সারা বাংলার মানুষকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, তা দেখলে শিল্পী বিজয়ের অনন্যতা নিয়ে আর তর্ক করা লাগে না, ছন্দ নিয়েও কথা বলা নিরর্থক মনে হয়। জীবিত অবস্থায় বিজয় সরকার তাঁর শ্রোতাদের কাছে প্রায় কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। মত্যুর পরেও তিনি কিংবদন্তি। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর একজন ভক্ত বাসুদেব গোলদার ‘শ্রী শ্রীগুরু পাগল বিজয়ামৃত’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, গ্রন্থটি তাঁর শিষ্যদের কাছে রামকৃষ্ণ কথামৃতের মতোই পবিত্র। কিন্তু বিজয় হয়তো ঠিকই বুঝেছিলেন যে, কোনো জীবনী বা প্রশস্তি নয় তাঁর গানই তাঁকে কালোত্তীর্ণ করবে। তা না হলে তিনি কেন বলবেন, “আমি যখন মাটির ধরাতে, রইব না কালের ইশারাতে, গানের ছন্দে কইব কথা তোমাদের সাথে।” সত্যিই যেন ‘কালের ইশারাতে’ তিনি গানের ছন্দে প্রতিদিন আমাদের সাথে কথা বলে যাচ্ছেন। আর তিনি যে অনুরোধ করেছিলেন, “গানের মাঝে প্রাণের ভাব নিয়া, আমার কথা কইও দু’ফোটা চোখের জল দিয়া”, সেটির হয়তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ, তাঁর গান শুনতে শুনতে আমরা এমনিতেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ি।