‘প্রস্তুতি নিয়েই লেখালেখি শুরু করি’

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৩, ১৯:১২
হরিশংকর জলদাস এ বছর কথাসাহিত্যে ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন। জীবনের চল্লিশ বছর পেরিয়ে লিখতে বসেন তিনি। লেখার যে খুব ইচ্ছে ছিল, এমন নয়। বলা যায়, সামাজিক অপমানের প্রতিশোধ নিতেই কলম ধরেন তিনি। গবেষণাকর্ম দিয়েই তাঁর লেখকজীবনের সূচনা। গবেষণার চাপ থেকে বাঁচবার জন্যেই হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস-গল্প লেখা। প্রথম উপন্যাস ‘জলপুত্র’ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চট্টগ্রামের এক জেলেপল্লিতে জন্ম নেওয়া হরিশংকর জলদাস আজ বাংলাদেশের সাহিত্যসভার একটি পরিচিত নাম। বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণের পর তাঁর সঙ্গে কথা বলেন মোহিত কামাল সৃষ্টিশীল সাহিত্যচর্চার দশকপূর্তির আগেই আপনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পেলেন। এ বিষয়ে আপনার নিজের মূল্যায়ন কী? আমি লেখালেখি শুরু করেছি ১৯৯৯ সাল থেকে। সে হিসেবে আমার লেখালেখির সময় ১২ বছর পেরিয়ে গেছে। প্রথম দিকে প্রবন্ধই লিখতাম। ‘ছোটগল্পে নিম্নবর্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘কবিতা ও ধীবর জীবন কথা:কবি অদ্বৈত মল্লবর্মণ’ এবং ‘লোকবাদক বিনয়বাঁশী, ‘জীবনানন্দ ও তাঁর কাল’ আমার প্রথম দিকের লেখা বই। এটা ঠিক যে, কথাসাহিত্য আমি লিখতে শুরু করি ২০০৭ সাল থেকে। ৪৪ বছর বয়সে লিখতে আসা আমার। ক্লাস সেভেনে পড়াকালে আমার পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়া শুরু। বাড়িতে ছিল রামায়ণ, মহাভারত, জাতকের বই। মহাভারত আমার প্রিয় বই ছিল। মহাভারত পড়তে পড়তে নানা কাহিনি, নানা চরিত্র আমাকে আন্দোলিত করত। গোটা জীবনের পড়াশোনার প্রস্তুতি নিয়েই লেখালেখি শুরু করি। জীবনের অভিজ্ঞতা আমার কথাসাহিত্যের ভিত্তি তৈরিতে কাজ করেছে। এসব কারণে হয়তো আমার কথাসাহিত্য বাস্তবতা ও জীবনলগ্নতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেনি। সেই জন্যই হয়তো আমার উপন্যাস আর গল্প পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছে। আর ওই ভালোবাসাই আমার মূলধন। তাই দশকপূর্তির আগেই বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার আমার জন্যে অস্বস্তির নয়। দলিত-লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানুষদের জীবনকথা আপনি তুলে এনেছেন আপনার লেখনীতে। আমাদের প্রশ্ন দুটো—এসব রচনা যাঁদের নিয়ে, তাঁরা পড়ছেন না। আপনার অনুভূতি কী? দ্বিতীয়টি—আসলেই কি তাঁদের জীবন সহনীয় করে তোলায় সাহিত্য কোনো রকম ভূমিকা রাখতে পারে? কিংবা যাদের কারণে বা যে সিস্টেমের ফলে তাঁদের এমন অবস্থান, তাতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ে? এ এক ভাবনার ব্যাপার। আসলেই আমি যাঁদের নিয়ে লিখি, তাঁরা আমার লেখা পড়েন না। জেলেদের নিয়ে আমার দুটো উপন্যাস—‘জলপুত্র’ আর ‘দহনকাল’, দেহজীবিকাদের নিয়ে ‘কসবি’ এবং হরিজনদের নিয়ে ‘রাম গোলাম’। এদের কারও আমার উপন্যাস পড়ার উপায় নেই। দু-চারজন জেলে লেখাপড়া করলেও সিংহভাগ এখনও অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে আছে। অন্নসংস্থানে তাদের উদয়াস্ত কাটে। হরিজনদের অবস্থাও তা-ই। দেহজীবিকাদের তো পড়ার কথা অচিন্ত্যনীয়। মাঝেমধ্যে বিপন্ন বোধ করি। ভাবি—হায়, আমার লেখা কি ওদের কাছে অপঠিতই থেকে যাবে! ওরা যেহেতু পড়ে না বা পড়তে পারে না, তাই আমার উপন্যাস বা গল্প ওদের মানসিকতা পরিবর্তনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি না। তবে হ্যাঁ, অন্য সম্প্রদায়ের শিক্ষিত মানুষেরা তো আমার কথাসাহিত্য পড়েন। দলিত-লাঞ্ছিত মানুষদের ঘিরেই তো এসব শিক্ষিতজনেরা আছেন। হরিজন-জেলে-যৌনকর্মীদের যে অবমাননাকর অবস্থান, তার জন্য তো দায়ী অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ। আমার লেখায় শিক্ষিতজনের মানসিকতার পরিবর্তন হলে লাঞ্ছিত মানুষদেরও অবস্থানগত পরিবর্তন হবে—আশা করি। ‘কসবি’তে প্রচুর তথ্যের সন্নিবেশ ঘটেছে। গল্পও ঘটনাবহুল; যদিও সমাপ্তি যেন আকস্মিক এবং অনাকর্ষণীয়। এতে শিল্পবোধ ও সাহিত্যরসের ঘাটতি হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন, আপনার মন্তব্য কী? কসবি পল্লির সঙ্গে আমার আশৈশব পরিচিতি। ওদের জীবন খুব কাছ থেকে দেখা আমার। ওদের অনেককেই আমি চিনতাম। তাদের হাহাকারের ইতিহাস ওদের মুখ থেকেই শোনা। ফলে বলা যায়—দীর্ঘ ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই উপন্যাস লিখতে বসা আমার। কসবির সমাপ্তি আকস্মিক—এ কথা মানতে রাজি নই আমি। উপন্যাসের শেষের দিকে কালু সর্দারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় দেবযানী এবং হত্যা করে। হত্যার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ হঠাত্ করেই নেয়। পরিকল্পনা করে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় প্রফেশনাল খুনিরা। দেবযানী প্রফেশনাল খুনি নয়। যে সর্দার তার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে, তার আশ্রয়দাত্রী মোহিনার পুত্রকে খুন করেছে, কসবি পল্লির অনেক নারীর জীবনকে লাঞ্ছনার আগুনে পুড়িয়েছে, পোড়াচ্ছে—তাকে একজন সচেতন নারী খুন করা অস্বাভাবিক বা আকস্মিক কিছু নয়। আর পরিণতি অনাকর্ষণীয় কি না, জানি না। এ পর্যন্ত এ কথাটি আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি। ঘটনা পরম্পরায় কালু সর্দারকে খুন করাই তো উচিত। এ ছাড়া অন্য কোনো পরিণতি তো ভাবাই যায় না। আমি মনে করি না, ‘কসবি’র পরিণতি অনাকর্ষণীয়। শিল্পবোধ আর সাহিত্যরসের ঘাটতির প্রসঙ্গ তুলেছেন। দেখুন, এই বিষয় দুটো সম্পর্কে এক-একজন পাঠকের এক-এক রকম অভিমত। কারও কাছে যেটা ঘাটতি বলে মনে হয়েছে, অন্যজনের কাছে সেটা তা মনে হয়নি। আমার সঙ্গে আলাপকালে অনেক বোদ্ধা পাঠক ‘কসবি’কে আমার সেরা উপন্যাস বলেছেন। ফরমায়েসি লেখা কি লেখেন? বেশি লিখতে গিয়ে লেখার মান হ্রাস পাচ্ছে বলে কি আপনার মনে হয়? সম্পাদকদের দাবির কারণে লেখা যে লিখি না, তা নয়। তবে উপন্যাস নয়। গল্প কখনও কখনও লিখি। উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার ভেতরের দাবিটাই প্রধান। বিষয় নির্বাচনে ভেতরের দাবিকে প্রাধান্য দিই। আর লেখার ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট কৃপণ। বছরে একটি উপন্যাস ৩-৪টি গল্প লিখতে পারলে যথেষ্ট হয়েছে বলে আমি মনে করি এবং তা-ই করে থাকি আমি। এ বছর আমি ‘মোহনা’ ও ‘হূদয় নদী’ নামে দুটো উপন্যাস লিখেছি। ‘হূদয় নদী’ লিখেছি সম্পাদকের দাবিতে নয়, হুমায়ূন আহমেদের বোন সুফিয়া হায়দারের দাবিতে। তিনি মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার দাবি করেছিলেন আমার কাছে। মধ্যবিত্ত একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব অধ্যাপিকার জীবন নিয়ে লেখা ‘হূদয় নদী’। যেহেতু আমি বেশি লিখি না, যা লিখি চিন্তা-ভাবনা করে লিখি। তাই এখনও আমার লেখার মান হ্রাস পাচ্ছে বলে মনে করি না। যে-দিন বুঝতে পারব, আমার লেখার মান ঠিক থাকছে না, তাহলে আগের লেখার মান এবং আমার মর্যাদা রক্ষা করার জন্য কলম অবশ্যই থামিয়ে দেব। যেমন করে থামিয়ে দিয়েছিলেন মাহমুদুল হক, যেমন করে থামিয়ে রেখেছেন হেলাল হাফিজ। বর্তমানে যাঁরা গল্প-উপন্যাস লিখছেন, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে যাঁরা লেখালেখি করছেন, তাঁদের লেখার মান, বিষয়বৈচিত্র্য—এসব নিয়ে কিছু বলুন। তরুণ লেখকেরা একটা দেশের সাহিত্যস্রোতের প্রধান অনুষঙ্গ বলে আমি মনে করি। তাঁরাই নির্দ্বিধায় প্রবীণ লেখকদের অকল্পনীয় কোনো বিষয়কে অবলম্বন করে গল্প-উপন্যাস লেখেন, কাঠামোগত টেকনিক নিয়ে তাঁরাই বেশি করে ভাবনা-চিন্তা করেন। বাংলাদেশের তরুণ লেখকেরা সাহিত্যসভাকে তাঁদের মেধা ও সৃষ্টি দিয়ে ঐশ্বর্যময় করে তুলছেন বলে আমি বিশ্বাস করি। সবার লেখার মান যে ভালো—এমন নয়। তবে দু-চারজন যে ভবিষ্যত্ সাহিত্যসভার উজ্জ্বল আলো হবেন—এ কথা নিঃসংকোচে বলা যায়।