মঞ্চনাটক

চিত্রাঙ্গদা

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৩, ১৯:১৩
৮ মার্চ, ‘বিশ্বনারী দিবস-২০১৩’ উপলক্ষে শিল্পকলার স্টুডিও থিয়েটার হলে ‘স্বপ্নদল’ প্রযোজনায় মঞ্চায়ন হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কাব্য নাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’। নাটকটির নিদের্শক জাহিদ রিপন। কাব্য নাটকটি প্রথম মঞ্চায়ন হয় রবীন্দ্রনাথের শার্ধশত জন্মবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি স্মারক প্রযোজনা হিসেবে । স্বপ্নদলের প্রযোজনায় কাব্য নাটক ‘চিত্রাঙ্গদা’র এটি ২২তম মঞ্চায়ন। মহাভরতের ‘চিত্রাঙ্গদা’ উপাখ্যান নিয়ে কিছু রূপান্তরসহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাব্যনাটক ‘চিত্রাঙ্গদা’ রচনা করেন ১৮৯২ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে। এই কাহিনি নিয়ে প্রায় ৪৪ বছর পর ১৯৩৬ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি রচনা করেন নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’। উল্লেখ্য নাটক দু’টির কাহিনি এক কিন্তু নাট্যরূপ আলাদা। নাটকটির শুরুতেই নির্দেশকের সুনিপুণ নির্দেশনায়, ফজলে রাব্বি সূকর্ণর নাট্যানুযায়ী আলোর কারিশমায় দুই কথক সুকন্যা আমীর ও মাধুরী ব্যাপারীর মঞ্চে প্রবেশ। এরিনা মঞ্চের চারপাশে ঘুরে ঘুরে কথকদ্বয় দর্শকদের দিকে মুখ করে তুলে ধরেন কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’র মূল চরিত্র চিত্রাঙ্গদার জন্ম, পরিচয়, বেড়ে উঠা, কর্ম ও পারঙ্গমতার নানান দিক। কথকদ্বয়ের প্রস্থানের সাথে সাথে বাদ্যের তালে-তালে চিত্রাঙ্গদা ও চার পুরুষ লাঠিয়ালের প্রবেশ। বাদ্যের তালে-তালে ও চিত্রাঙ্গদা এবং চার পুরুষ লাঠিয়ালের শারীরিক ভাষায় প্রকাশ করে যুদ্ধের আবহ। তুমুল লাঠি যুদ্ধে চিত্রাঙ্গদা বীরত্বের সাথে নিমিষেই চার লাঠিয়ালকে পরাজিত করে। যুদ্ধে পারঙ্গম চিত্রাঙ্গদার পরিচয় শেষে সব কুশীলবদের প্রবেশের পর শুরু হয় প্রার্থনা। প্রার্থনা শেষেই মূলত শুরু হয় কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’। অনঙ্গ-আশ্রম। চিত্রাঙ্গদা, মদন ও বসন্ত। চিত্রাঙ্গদা প্রথমে মদনকে প্রশ্ন করে¬ তুমি পঞ্চশর? মদন: আমি সেই মনসিজ,/টেনে আনি নিখিলের নরনারী-হিয়া/বেদনবন্ধনে। চিত্রাঙ্গদা: কী বেদনা, কী বন্ধন/জানে তাহা দাসী। প্রণমি তোমার পদে। অতঃপর বসন্তের দিকে চেয়ে চিত্রাঙ্গদা: প্রভু, তুমি কোন দেব? বসন্ত: আমি ঋতুরাজ। ... এভাবে প্রশ্ন-উত্তরে মদন ও বসন্ত জেনে নেয় চিত্রাঙ্গদা মণিপুর রাজকন্যা। একদা মণিপুর রাজার ভক্তিতে তুষ্ঠ হয়ে উমাপতি বর দিয়েছিলেন, তার বংশে পুত্র জন্মাবে। তা সত্বেও রাজকুঞ্জে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হয়। রাজা তাকে পুত্র রূপে লানন-পালন করেন। রাজকন্যাও স্বাচ্ছন্দে ধারণ করে পুরুষের বেশ, পুরুষের শিখে নেয় যুদ্ধ বিদ্যা, ধনুর্বিদ্যা, রাজদণ্ড নীতি। নাটকটিতে ঘটনার পরিক্রমায় মহাবীর অর্জুন সত্য পালনে ব্রত হয়ে একযুগ ব্রহ্মাচার্য গ্রহণ করে। চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের প্রেমে অনুরক্ত হলে রূপহীন চিত্রাঙ্গদাকে অর্জুন অগ্রাহ্য করে। অপমানিত চিত্রাঙ্গদা প্রেমের দেবতা মদন এবং যৌবনের দেবতা বসন্তের সাহায্য প্রার্থনা করলে তারা চিত্রাঙ্গদাকে এক বছরের জন্য অপূর্ব সুন্দরী করে দেয়। অর্জুনও চিত্রাঙ্গদার প্রেমে পড়ে। কিন্তু দিনে দিনে চিত্রাঙ্গদার মনে দ্বন্দ্ব দানা বাধে—অর্জুন কাকে ভালোবাসে, চিত্রাঙ্গদার এই এক বছরের জন্য পাওয়া রূপকে না তার প্রকৃত অস্তিত্বকে? এমন দ্বন্দ্বে চিত্রাঙ্গদার সাথে উপস্থিত হলভরা দর্শকও বিচলিত হয়ে ওঠে। ঘটনার পরম্পরায় চিত্রাঙ্গদার নতুন রূপের সময়সীমাও প্রায় শেষদিকে এসে হাজির হয়। নির্দিষ্ট সময়ের শেষ রাতে চিত্রাঙ্গদার এই নতুন রূপ বসন্ত দেবের অক্ষয় ভাণ্ডারে চলে যায়। অতঃপর অবগুণ্ঠনে ঢাকা চিত্রাঙ্গদার সাথে দেখা হয় অর্জুনের। চিত্রাঙ্গদা যখন তার অবগুণ্ঠন খুলে অর্জুনের সামনে দঁ াড়ায় এবং বলে- আমি চিত্রাঙ্গদা। /দেবী নহি, নহি আমি সামান্য রমণী।/... /শুধু নিবেদি চরণে, চিত্রাঙ্গদা,/রাজেন্দ্রনন্দিনী। এতে বিস্ময়াবিভূত অর্জুন চিত্রাঙ্গদাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে—প্রিয়ে, আজ ধন্য আমি। জয় হলো চিত্রাঙ্গদার। জয় হলো নারীর, জয় হলো প্রেমের-মানবতার। নাটকটির কাব্যময়তা, নির্দেশনা, দৃশ্যকল্প নির্মাণ, মঞ্চ সজ্জা ও আলোর ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করেছে। মুগ্ধ করেছে বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও প্রায় সকল কুশীলবদের অভিনয়। বিশেষ করে চিত্রাঙ্গদা চরিত্রে রূপদানকারী সোনালী রহমান জুলি ও ফারজানা রহমান মিতার অভিনয় ও তার সাথে শরীর ভাষার বহিঃপ্রকাশ যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। চিত্রাঙ্গদা কাব্যনাটটিতে কোনো গান না থাকলেও নির্দেশক নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ থেকে বেশকিছু গান ও সংলাপ ব্যবহার করে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। যা অনেক দর্শককে মুগ্ধ করেছে। তবে নাটকটিতে অধিকাংশ কুশীলবেরই সংলাপের দ্রুত ব্যবহার সকলকে অবাক করেছে।