শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস:আঙ্গিক বিচার
কুদরত-ই-হুদা
প্রচ্ছদ:মামুন হোসাইন, প্রকাশক:আদর্শ
প্রকাশকাল:অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৩
মূল্য :৩৮০ টাকা
সাহিত্যের শিক্ষার্থীমাত্রই সাহিত্য গবেষণার প্রতি একধরনের ভালোলাগা তৈরি হয়ে যায়। এই প্রাথমিক ভালোলাগাকে আগ্রহে রূপ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকের ভেতরে কাজ করে। কিন্তু কর্মজীবনের ব্যস্ততা ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা অতিক্রম করে খুব কম গবেষকই নিজের কাজটি শিল্পসম্মতভাবে গুছিয়ে তুলতে পারেন। শওকত ওসমান ও সত্যেন সেন বাংলা উপন্যাসের দুটি সার্বভৌম অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত। নিরীক্ষাপ্রিয় দুই লেখকের রাজনীতি-সচেতনতা ও শিল্পমানসের মধ্যে একটি যোগসূত্র বিদ্যমান। বিশেষত, দেশভাগ-পূর্ব বাংলার জনজীবন ও পরবর্তীকালের বাংলার জনজীবনে আমূল পরিবর্তন চোখে পড়ে। নকশাধর্মী কথার আদল পেরিয়ে বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরত্-মীর মশাররফ ও ত্রিশের মানিক-তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণের শিল্পবলয় অতিক্রম করে চল্লিশ ও পঞ্চাশের কথাকারগণ বাংলা কথাসাহিত্যে, বিশেষত উপন্যাসে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। উপন্যাসের চরিত্র-ভাষা-কাহিনি-প্লট ও বর্ণনাভঙ্গির মধ্যে ঔপন্যাসিকগণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ীরা তাঁদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে এই অবদানের ছাপ স্পষ্ট করেছেন; শওকত ওসমান ও সত্যেন সেন উপন্যাস-নিরীক্ষায় উপরোক্ত লেখকগণের অনুগামী। ‘শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস :আঙ্গিক বিচার’ কুদরত-ই-হুদার গবেষণাগ্রন্থ। সাহিত্যের শিক্ষার্থীর আবেগ পার করে, শিক্ষকতায় নিবেদিতপ্রাণ এই গবেষক তাঁর প্রথম গবেষণাতেই নিজের জাত চিনিয়েছেন।
‘শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস :আঙ্গিক বিচার’ শিরোনামে গবেষণা করতে গিয়ে গবেষক গবেষণার বিষয়কে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন। গবেষণার নিয়মানুযায়ী ‘অবতরণিকা’ অংশের পর তিনি ‘পরিপ্রেক্ষিত’ শিরোনামে উপন্যাসের আঙ্গিক প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরপরই তিনি গবেষণার মূল রূপরেখা অর্থাত্ অধ্যায়-বিভাজন চিহ্নিত করেছেন এবং প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছদে বাংলা উপন্যাসের আঙ্গিক নিয়ে কথা বলেছেন। দ্বিতীয় পরিচ্ছদে ‘বাংলাদেশের উপন্যাসের আঙ্গিক-বিবেচনার সূত্রাবলি’—সাতচল্লিশ ও দেশ বিভাগ-পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের দুটি ধারা স্পষ্ট হয়ে যায়। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেও পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশের সাহিত্য আলাদা রূপ নেয়। ফলে দুই বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিগত মিলের বিষয়গুলো ক্রমশ পৃথক হয়ে ওঠে। এই পৃথক হয়ে ওঠা অনেকটা একটি নদীর দুটি ধারার মতো সাহিত্যের দুটি স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু জীবনের মূল সুরটি কিন্তু অক্ষত রয়েছে। বিশেষত, শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস পাঠে পাঠকের সেই ধারাকেই উপলব্ধি করতে পারবেন; কুদরত-ই-খুদা এই বিষয়টি খুব জোরালোভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায় দুটি অংশে বিভক্ত ‘প্রথম পরিচ্ছেদ:শওকত ওসমানের জীবন ও শিল্পচেতনা’ এবং ‘দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ:শওকত ওসমানের উপন্যাসের আঙ্গিক’। তৃতীয় অধ্যায়ও দুটি অংশে বিভক্ত ‘প্রথম পরিচ্ছেদ:সত্যেন সেনের জীবন ও শিল্পচেতনা’ এবং ‘দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ:সত্যেন সেনের উপন্যাসের আঙ্গিক’।
হালের অধিকাংশ কথাসাহিত্য গবেষণায় একটি বিষয় খুব চোখে পড়ে—গবেষক কাহিনিকে প্রধান অবলম্বন করেন এবং কাহিনির সঙ্গে সঙ্গে গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং গবেষণার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করে থাকেন। আমার কাছে মনে হয়, কথাসাহিত্য গবেষণায় এটি একটি দুর্বল প্রয়াস। গবেষক কুদরত-ই-হুদা এই বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। ফলে তথাকথিত পাঠকদের এই গবেষণাগ্রন্থটি সুখপাঠ্য বলে মনে হবে না। কিন্তু শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের দীক্ষিত পাঠকসহ প্রকৃত গবেষণায় আগ্রহী পাঠক এই গ্রন্থ থেকে তার রস আস্বাদন করে নিতে পারবেন বলে আমার ধারণা। দুই লেখকের জীবনের সঙ্গে শিল্পভাবনার পারম্পর্য অন্বেষণে গবেষক শুধু তথ্য উল্লেখ করেননি; চেষ্টা করেছেন জীবনীধর্মী ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে। বলা ভালো, তিনি এখানে বেশ স্বাধীনতা নিয়েছেন। আঙ্গিক বিচার অর্থাত্ উপন্যাসের শিল্পবিচারে গবেষক গবেষণার রীতি-পদ্ধতি মেনেই করেছেন, পাঠকমাত্রই তা উপলব্ধি করতে পারবেন।
গ্রন্থটির প্রকাশনার মান নিয়ে কথা বলা বাতুলতা হবে। নির্ভুল বই পাওয়া প্রায় অলীক কল্পনা, দু-চারটি মুদ্রণপ্রমাদ দ্রুতগামী পাঠকের চোখ এড়িয়ে যাবে সহসাই। গবেষণাগ্রন্থ হওয়ায় নির্ঘণ্ট অংশটি থাকলে ষোলোকলা পূর্ণ হতো। মামুন হোসাইনের নান্দনিক প্রচ্ছদ এবং ছকছকে ছাপা-বাঁধাই বইটির পাঠকপ্রিয়তা পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। গল্প ও সাহিত্য সমালোচনা লিখছেন এক দশকের ওপর হতে চলল; কিন্তু কুদরত-ই-হুদার এটি প্রথম গ্রন্থ। বইটি দীক্ষিত পাঠকমহলে সমাদৃত হলে গবেষকের শ্রম সার্থক হবে।
