কিডনি রোগ আর কিডনি বিকল হওয়া এক কথা নয়। কিছু পরীক্ষা আর সামান্য কিছু ওষুধ খেয়ে কিডনি রোগ ভাল হয়ে যেতে পারে। রোগী নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারেন। বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি কিডনি রোগী আছে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩ শতাংশ বা ৩৫ হাজার রোগীর কিডনি বিকল হয়ে থাকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ব কিডনি দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে ল্যাব এইড ও দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত এক গোল টেবিল অনুষ্ঠানে বক্তারা একথা বলেন। দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নুর-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে কিডনি বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, এনজিও ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ অনুষ্ঠানে বলেন, কিডনি রোগের কথা শুনলেই আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আমরা ভাবি কিডনি রোগ হলেই সব শেষ। আসলে তা নয়। মূলত সচেতনতার অভাবে তারা ভীত হন। আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে হবে। আমি বলতে চাই কিডনি একক কোন রোগ নয়। অনেক রোগের সমন্বয়ে সৃষ্ট একটি রোগ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং মেমব্রেন ফিল্টারিং এই রোগের সৃষ্টির কারণ। যে সকল রোগীর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আছে তারা ৫০/৬০ টাকা খরচ করে একটি টেস্ট করে শুরুতে রোগ চিহ্নিত করে ৫০/৬০ হাজার টাকার ডায়ালাইসিস থেকে বাঁচতে পারেন এবং জীবনও ্বাঁচাতে পারেন। রোগীদের সচেতনতা সৃষ্টি করতে চিকিত্সকদেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এন্টিবায়োটিক ও ব্যথার ওষুধ ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রয়োজনে টেস্ট করে এসব ওষুধ দিতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রফিকুল আলম বলেন, ২০০৬ সাল থেকে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমরা কিডনি দিবস পালন করছি। গত বছর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হু কিডনি রোগকে তাদের তালিকাভুক্ত করে এ রোগের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
ল্যাব এইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম বলেন, গত বিশ বছর ধরে হূদরোগের উপর প্রচারণার ফলে সমাজে অনেক সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। এখন একজন রিকশাওয়ালাও জানে বুকের বাম পাশে ব্যথা হলে হাসপাতালে গেলে সে বাঁচতে পারে। কিডনি রোগ সম্পর্কে আমাদের এমনভাবে জনমনে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এই রোগ সম্পর্কে মানুষ সচেতন হলে তাদের আর ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের পর্যায়ে যেতে হবে না।
সঙ্গীত শিল্পী সামিনা চৌধুরী বলেন, কিডনি রোগীদের সহযোগিতা করার জন্য আমরা অনেক চ্যারিটি শো করেছি। এ অনুষ্ঠানে এসে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আগে সেটা জানতাম না।
ল্যাব এইডের কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এম এ সামাদ বলেন, ৫০/৬০ টাকা খরচ করে কিডনি টেস্ট করে শুরুতে রোগ চিহ্নিত করা সম্ভব হলে মানুষ ডায়ালাইসিস-এর হাত থেকে বাঁচাতে পারে এবং জীবনও ্বাঁচাতে পারে। রোগীদের সচেতন করতে চিকিত্সকদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তিনি ভেজাল খাদ্য পরিহার করার পরামর্শ দেন।
অভিনেতা আফজাল হোসেন গণমাধ্যমগুলোতে সৃজনশীলতার মাধ্যমে অনুষ্ঠান নির্মাণ করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলার আহ্বান জানান।
ল্যাব এইডের ইউরোলজি বিভাগের চিফ কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার সময় মেডিক্যাল টেস্টকে গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যথাযথ পরীক্ষা না করে বিদেশে গিয়ে অনেক মানুষ কিডনি রোগ নিয়ে ফিরে আসেন। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অধ্যাপক মেজর জেনারেল (অব.) এম শাহজাহান রঙ মিশ্রিত ও বাইরের খাবার সম্পর্কে সচেতন হওয়ার কথা বলেন।
পরিবেশ আন্দোলন সংস্থা বেলার প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট রিজওয়ানা হাসান চিকিত্সকদের সংবেদনশীল ব্যবহার ও পাঠ্যপুস্তকে বিভিন্ন রোগ সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কিডনি দানকে উত্সাহিত করতে হবে।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নওজিয়া ইয়াসমিন সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পরিমিত পানি পানের পরামর্শ দেন। তিনি ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ গ্রহণকেও নিরুত্সাহিত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলো উল্লেখ করে সৃজনশীল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনমানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান।
দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূর চিকিত্সা সেবার প্রচলিত ধারণাকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালগুলো যেন ব্যবসাকে বেশি প্রাধান্য না দেয় সে বিষয়ে আহ্বান জানান। দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিষ সৈকত বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এই অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছি। দৈনিক ইত্তেফাকের নগর সম্পাদক আবুল খায়ের ভেজাল খাদ্য বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
