যমুনা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খাসবড়শিমুল গ্রামের এই মানুষগুলোর কাছে-বন্যা, নদী ভাঙ্গন, খরা ও শৈত্য প্রবাহসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার নামই হলো জীবন। এই গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ শ্রমজীবী এবং নারীরা গৃহিণী। নারীদের আয়মুখী কোনো কাজ না থাকায় একসময় তারা শুধু সংসারের কাজেই সময় কাটাতো। ফলে অভাব ছিল তাদের নিত্য সঙ্গী।
কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। এইসব নারীকে পথ দেখিয়েছে সংগ্রামী আরেক নারী, যার নাম রুমা খাতুন। ওই গ্রামের দিন মজুর মনিরুল ইসলামের স্ত্রী সে। বিয়ের আগে বাবার বাড়ীতে থাকাকালে টুপি তৈরির কাজ শিখেছিল রুমা। বিয়ের পর স্বামীর বাড়ীতে এসেও সে এই কাজকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে। টুপি তৈরিতে তার সাফল্য দেখে গ্রামের অন্য নারীরাও আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এই কাজের উপর। তারাও শিখতে চায় এই কাজ। এমন সময় সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসে মানব মুক্তি সংস্থা নামক একটি এনজিও। এনজিওটির রি-কল প্রকল্পের মাধ্যমে রুনার নেতৃত্বে ওই গ্রামের প্রায় ৫০ জন নারীকে টুপি তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাদের আরো দেয়া হয় প্রয়োজনীয় উপকরণ। শুধু তাই নয়, বাজারে টুপির প্রচুর চাহিদা থাকায় একই উপজেলার আদাচাকী গ্রামের “লিটন টুপি ঘর”-এর সাথে টুপি বাজারজাত সংক্রান্ত চুক্তিও সাধিত হয়। তারই মাধ্যমে এসব নারীর তৈরিকৃত টুপি দেশের চাহিদা মিটিয়েও রপ্তানি করা হয় ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
বর্তমানে খাসবড়শিমুল গ্রামে ৮০-৮৫ জন নারী ও কিশোরী টুপি তৈরির কাজ করছে। সংসারের কাজের পাশাপাশি এই কাজ করে তাদের অনেকেই এখন হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বী।
আগে নারী ও কিশোরীরা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে সংসারের পুরুষ সদস্যদের কাছে হাত পাততো; কিন্তু টুপি তৈরির কাজ করে তারা এখন নিজেরা স্বাবলম্বী। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়েও সংসারে অর্থ যোগান দিচ্ছে। অনেক স্কুল ছাত্রী এই কাজ করে বইখাতা কেনাসহ পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, একটি টুপি তৈরি করতে খরচ হয় মাত্র ৪ টাকা, আর বিক্রি হয় ২৫ থেকে ২৭ টাকা। বর্তমানে একেক জন নারী সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে কাজ করে মাসে আয় করছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। শহর থেকে অনেকেই এসে তাদের তৈরি টুপি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি কারও অতিরিক্ত টাকা প্রয়োজন হলে মহাজন তাদেরকে আগাম টাকা দিয়ে সহযোগিতা করছেন। ফলে এই গ্রামের নারীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। সংসারে তাদের গুরুত্ব বাড়ছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামত এখন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মানব মুক্তি সংস্থার উপ-পরিচালক এস এম আমির হোসাইন বলেন, তারা মূলত চাহিদার উপর ভিত্তি করে চরের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে থাকে। প্রয়োজনে তাদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। এ ক্ষেত্রে টুপি তৈরির কাজ খাসবড়শিমুল গ্রামের নারীদের জীবন-উন্নয়নে ব্যাপক সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এ কাজ করে অধিকাংশ নারী স্বাবলম্বী হয়েছে। ফলে সংসারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, বেড়েছে মতামত প্রকাশের অধিকার। আর এটাই ছিল আমাদের সংগ্রাম।
