লবণ এবং স্বাস্থ্য

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৩, ১৮:৫৯
•অধ্যাপক আর কে খন্দকার • প্রফেসর অব কার্ডিওলজি এবং চেয়ারম্যান, হাইপারটেনশন কমিটি অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ অতিরিক্ত লবণ গ্রহণে নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা হয়। লবণের আরেক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। লবণের সোডিয়াম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। উচ্চ লবণযুক্ত খাবার গ্রহণ করার ফলে রক্তচাপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং উচ্চ রক্তচাপ হয়ে থাকে। উচ্চ রক্তচাপ হূদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের একটি প্রধান কারণ। হূদরোগ এবং স্ট্রোক সমগ্র বিশ্বে সবচেয়ে বড় ঘাতক ব্যাধি। বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটি ৭১ লাখ লোক এই রোগে মারা যায়। বিশ্বায়নের এই যুগে অনেক প্রকার খাদ্যের মধ্যে লবণ অধিক মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। জনসাধারণের মাঝে অধিক লবণ গ্রহণের ক্ষতিকারক দিক এবং ঝুঁকির ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে World Action on Salt and Health (WASH) এর উদ্যোগে সমগ্র বিশ্বে ২০১৩ সালের মার্চ মাসের ১১ হতে ১৭ মার্চ তারিখ পর্যন্ত World Salt Awareness Week বা বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে হাইপারটেনশন কমিটি অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ নানাবিধ আয়োজনের মাধ্যমে এই সপ্তাহটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছে। বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় এর বাংলা করা হয়েছে ‘খাবারে লবণের পরিমাণ কমান’। অধিক লবণ গ্রহণের কুফল উচ্চ রক্তচাপ উচ্চ রক্তচাপ একটি নিরব ঘাতক ব্যাধি। বাংলাদেশে এক চতুর্থাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। হূদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, পক্ষাঘাত, অন্ধত্ব সহ নানাবিধ জটিল অসুখের জন্য উচ্চ রক্তচাপ একটা মারাত্মক রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান। উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ অধিক লবণ গ্রহণ। বিশ্বের যে সব জনগোষ্ঠী লবণ কম খায় তাদের শতকরা ৮০ ভাগের উচ্চ রক্তচাপ থাকে না। উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ অধিক লবণ গ্রহণের ফলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়ে থাকে। লবণ কম গ্রহণ করলে রক্তচাপ কম হয় এবং হূদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। দীর্ঘদিন যাবত লবণ কম গ্রহণ করলে তা বৃদ্ধ বয়সে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা প্রতিরোধে সহায়তা করে। চিকিত্সক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা প্রয়োজন। হূদরোগ এবং স্ট্রোক প্রাপ্তবয়স্কদের শারীরিক অক্ষমতা এবং পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ স্ট্রোক এবং হূদরোগ। উচ্চ রক্তচাপের কারণে শতকরা ৪৯ ভাগের করোনারী হূদরোগ এবং ৬৪ ভাগের স্ট্রোক হয়ে থাকে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের ফলে হার্ট ফেইলিয়র হতে পারে যা হার্টের কার্যক্ষমতা হ্রাস করে। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের ফলে আমাদের রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইলিয়র এবং হার্ট ফেইলিয়রের ঝুঁকি বেড়ে যায়। লবণ কম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ সাহায্য করে, ফলশ্রুতিতে হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলিয়রের ঝুঁকি কমে। অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা উচ্চ লবণযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে পাকস্থলীর ক্যান্সার অথবা কিডনি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অধিক লবণ গ্রহণের ফলে পাকস্থলীর ত্বক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলশ্রুতিতে Helicobacter Pzlori নামে এক ব্যাকটেরিয়া দ্ব্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে; যার দরুণ পাকস্থলীর আলসার এবং পাকস্থলীর ক্যান্সার হয়। মূত্রের এবং হাড়ের ক্যালসিয়ামের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে লবণ গ্রহণের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। হাড়ের কর্মক্ষমতার জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য উপাদান। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম নির্গমণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে আমাদের হাড়ের ক্যালসিয়াম ক্ষয়ে হাড় পাতলা হয়ে যায় যাকে অস্টিওপোরোসিস বলে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই পাতলা হাড়গুলোর ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি পায়, যা জোড়া লাগতে অনেক সময় লাগে। এছাড়া অধিক লবণ গ্রহণে শারীরিক স্থূলতা এবং স্মৃতিবিভ্রাট এর ঝুঁকি বাড়ে। কিভাবে আমরা অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করি আমাদের দেশে ভাত-তরকারীর সাথে একটু আলগা লবণ অধিকাংশ লোকেরই খুব পছন্দ। তরকারী রান্না করার সময় একটু যেন বেশিই লবণ আমরা ব্যবহার করে থাকি। এছাড়া খাবারকে সুস্বাদু করার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরণের উপাদান যেমন- কেচাপ, সয়াসস, টেস্টিং সল্ট, সালাদ বানানোর উপকরণ ব্যবহার করি; যেগুলোর মধ্যে অনেক লবণ থাকে। লবণের কাজ খাদ্যকে পচন থেকে রক্ষা করা; এজন্য প্রক্রিয়াজাত এবং সংরক্ষিত খাবারে অধিক লবণ থাকে। বর্তমানে ব্যস্ত জীবনযাত্রার জন্য অনেকে বাজার থেকে উচ্চ লবণযুক্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার কিনে আনেন। শুটকী মাছ ও নোনা ইলিশ মাছে প্রচুর লবণ থাকে। আমরা সিদ্ধ ডিম কিংবা বিভিন্ন কাঁচা ফলমূল খেতে গেলে লবণ দিয়ে খাই, যার কোন প্রয়োজন নেই। শুধু জিহবার স্বাদের জন্য আমরা আমাদের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনছি। এভাবে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করায় আমরা নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছি এবং অসুস্থ জীবন-যাপন করছি। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে অথবা ক্যান্টিনে খাবার খাওয়াটা এক ধরণের আনন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে! চাইনিজ, ফাস্টফুড, স্যূপ, তেলে ভাজা খাবার, কাবাব সহ বিভিন্ন মজাদার খাদ্যে এত বেশি লবণ থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এভাবে আমরা ঘরে-বাইরে বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে নিজের অজান্তে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করি এবং নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকি। কিভাবে লবণ কম গ্রহণ করা যায় একটু সদিচ্ছা থাকলেই অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা যায়। লবণ এবং সোডিয়াম কম গ্রহণের জন্য যা করণীয়- খাবারের সাথে আলগা (পাতে) লবণ খাবেন না। রান্না করার সময় খাবারে অল্প লবণ ব্যবহার করুন। ফাস্টফুড, রেস্টুরেন্ট ও ক্যান্টিনের খাবারে প্রচুর লবণ থাকে, এজন্য এসব খাবার কম খাবেন। টিনজাত স্যুপ, সবজি, মাংস এবং মাছ, প্রক্রিয়াজাত পনীর এবং মাংস, হিমায়িত খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। খাদ্যকে সংরক্ষণ করার জন্য লেবুর রস, ভিনেগার, কাচা রসুন, মসলা ব্যবহার করুন। খাদ্যকে সুস্বাদু করার জন্য ব্যবহূত বিভিন্ন দ্রব্য যেমন- কেচাপ, সয়াসস, সালাদ বানানোর উপকরণ কম ব্যবহার করুন। কাঁচা ফলমূল বা শাক সবজি খাওয়ার সময় লবণ দিয়ে খাবেন না। বাড়িতে একেবারে কম লবণ দিয়ে সস, কেচাপ, আচার, সালাদ বা অন্যান্য খাদ্য তৈরি করুন। শুটকী মাছ, আচারজাতীয় খাবার কম খান। লবণ বিহীন ক্র্যাকার্স, পপকর্ণ এবং বাদাম খান। খাদ্য নির্বাচনের পূর্বে কম লবণ এবং সেডিয়াম কম সমৃদ্ধ খাবারগুলো নির্বাচন করুন। ঘরে-বাইরে উচ্চ লবণযুক্ত খাবার পরিহার করুন। আপনার সন্তানকে শৈশব থেকেই কম লবণযুক্ত খাদ্য খাওয়ানোর অভ্যাস করুন।