বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ফজিলাতুন্নেছাকে (২৪) দশ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছিল তার পরিবার। অল্পবয়সী একটি মেয়ে স্বামীর ঘরে থিতু হওয়ার কিছুদিন পরই কোলজুড়ে আসে পুত্রসন্তান শফিকুল ইসলাম (১২)। স্বামী সবুজ হাওলাদার (৪৫) পরে আরেকটি বিয়ে করেন। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে না পারায় ফজিলাতুন্নেছার দেখা দেয় মানসিক সমস্যা। এ পর্যায়ে তার আশ্রয় হয় বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপাশা ইউনিয়নের কাটাখালি গ্রামে তার পিতা ইসহাক আলী হাওলাদারের বাড়িতে। এদিকে নদী ভাঙ্গনে ইউনিয়নটি বিলুপ্ত হলে বসতবাড়ি হারায় ফজিলাতুন্নেছার পরিবার। একদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন মানসিক ভারসাম্যহীন ফজিলাতুন্নেছা। পাঁচ বছরের শিশু শফিকুল থেকে যায় পরিবারের সাথে। তারপর কেটে যায় সাতটি বছর। সবাই ভেবেছিল তার সন্ধান আর পাওয়া যাবে না। এদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে ফজিলাতুন্নেছা চলে আসেন ময়মনসিংহের নান্দাইল পৌরশহরে। নতুন এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে পেয়ে একশ্রেণীর মানুষ তাকে নিয়ে ক্ষেপাটে আচরণ শুরু করে। ওই নারী একসময় আশ্রয় নেয় পৌর এলাকার চারিআনি পাড়া গ্রামের মোজাম্মেল হক রিপনের বাড়িতে। সে বাড়িটি সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবউদ্দীন আহম্মদের ভাগ্নে মো.আব্দুল খালেকের (বর্তমানে তিনি মৃত)। সেই বাড়ির মানুষ একসময় ফজিলাতুন্নেছাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের মত আপন করে নেয়। প্রায় সাড়ে তিনবছর ওই বাড়িতে কাটান তিনি। ওই পরিবারের সদস্যদের অপার স্নেহ ও ভালবাসার টানে একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্যহীনতা কাটিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন ফজিলাতুন্নেছা। ওই বাড়ির সদস্য নান্দাইল শহীদ স্মৃতি আদর্শ কলেজের ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি মোজাম্মেল হক রিপন ইত্তেফাককে বলেন, পারিবারিক আবহে দীর্ঘদিন কাটানোর পর ফজিলাতুন্নেছা তাদের কাছে তার পরিবারের কথা খুলে বলে। আমরা ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষ। ভাষাগত কারণে আমরা শুধু ‘বাকেরগঞ্জ’ কথাটি বুঝতে পারি। পরে নান্দাইল মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার জাকির হোসেনের মাধ্যমে বাকেরগঞ্জ থানার ওসির সাথে যোগাযোগ করে তার পরিবারের সাথে কথা বলে ফজিলাতুন্নেছার অবস্থানের কথা জানিয়ে দেই। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল ইসলাম এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ইত্তেফাককে বলেন, নান্দাইল থানার ওসির ফোন পেয়ে আমি মেয়েটির আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ করি। গত বুধবার সন্ধ্যায় ফজিলাতুন্নেছার ভাই মো. খলিলুর রহমান ঢাকা থেকে ছুটে আসেন নান্দাইলে। পরদিন বৃহস্পতিবার তিনি তার বোনকে সাথে করে নিয়ে যান।
বিদায় মুহূর্তে মোজাম্মেল হক রিপনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত এক পরিবেশ। সাত বছর পর বোনকে কাছে পেয়ে নিজের উচ্ছ্বাস গোপন করতে পারেননি খলিলুর রহমান। তাকে বারবার আশ্রয়প্রদানকারী পরিবারটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে দেখা যায়। অপরদিকে চোখের কোণে অশ্রু নিয়ে মোজাম্মেল হক রিপনের পরিবার বিদায় জানায় ফজিলাতুন্নেছাকে।
