জাতিসংঘের বিশ্ব মানব উন্নয়ন সূচকে (এইচডিআই) বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে ১৮৭টি দেশের মধ্যে ১৪৬তম অবস্থানে উঠে এসেছে। দ্রুততম সময়ে উন্নতি করা বিশ্বের ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চীন, ভারত, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের মত দেশের নামও রয়েছে। তবে সূচকে একধাপ এগুলেও বাংলাদেশ এখনো নিম্ন মানব উন্নয়নভুক্ত দেশের তালিকাতেই অবস্থান করছে।
গতকাল সারা বিশ্বে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিপি) একযোগে যে বিশ্ব মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৩ প্রকাশ করেছে তাতে এ তথ্য দেয়া হয়েছে। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশেও প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন ইউএনডিপি’র কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন ট্যামোসিস। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান ও ইউএনডিপির সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর কেএএম মোরশেদ। এবারের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘দক্ষিণের উত্থান ঃ বৈচিত্র্যময় বিশ্বে মানব অগ্রগতি’।
ইউএনডিপি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ধারায় বড় রকমের পরিবর্তন ঘটিয়ে দ্রুত উন্নয়নে ইতিহাস তৈরি করেছে বাংলাদেশ, ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাখ লাখ মানুষ অভাবের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে আর কোটি কোটি লোক ঠাঁই করে নিয়েছে দক্ষিণের দ্রুতবর্ধিষ্ণু নব্যমধ্যবিত্তের সারিতে।
আয়ুষ্কাল, শিক্ষা ও মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন সূচক নির্ণয় করে। বিশ্ব মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৩ অনুযায়ী ২০১২ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ৬৯ দশমিক ২ বছর, শিক্ষা গ্রহণের স্থায়িত্বকাল ৮ দশমিক ১ বছর এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৭৮৫ ডলার। ফলে বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন মূল্যমান হয়েছে শূন্য দশমিক ৫১৫। এই মূল্যমানের ভিত্তিতে মানব উন্নয়ন সূচকে ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৪৬তম। শূন্য দশমিক ৫১১ মূল্যমান নিয়ে ২০১১ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৭তম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সূচকে নিম্ন মানব উন্নয়নের দেশ হলেও ২০১২ সালে যে ১৮টি দেশ দ্রুত উন্নতি লাভ করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ তার ধীর গতির অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর ভারতের তুলনায় অর্ধেক আয় নিয়েও প্রায় ভারতের সমান উন্নতি করেছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতির মাপকাঠিতে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে।’ “বস্ত্রশিল্পে অসামান্য সাফল্য লাভ করে এবং ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশ তার অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখতে পেরেছে। ১৯৯০ সালের শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ থেকে শুরু করে ২০১০ সালে বিশ্বের প্রায় ৪ দশমকি ৮ শতাংশ পোশাক রফতানি করছে বাংলাদেশ।
উন্নততর জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা সেবা, দারিদ্র্য বিমোচনে উদ্ভাবনী কর্মসূচি এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ এই উন্নতি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইউএনডিপি কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন ট্যামোসিস বলেন, যে ধরনের ব্যতিক্রমধর্মী সংকট বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয় তার তুলনায় বাংলাদেশের উন্নতি সত্যিই অসামান্য। বাংলাদেশের মানুষের উন্নতি এবং অগ্রগতি তার অর্থনৈতিক অর্জনের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১২ সালে পার্শ্ববর্তী ভারতের অবস্থান হয়েছে ১৩৬তম, ভুটান ১৪০তম, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে ১৪৬তম এবং নেপাল ১৫৭তম। দক্ষিণ এশিয়ার অপর দেশ শ্রীলংকার অবস্থান ৯২তম। এর মধ্যে শ্রীলংকা উন্নত মানব উন্নয়নভুক্ত দেশগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। অপরদিকে ভারত ও ভুটানের অবস্থান মধ্যম মানের মানব উন্নয়নভুক্ত দেশের তালিকায় এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপাল নিম্ন মানব উন্নয়নভুক্ত দেশের তালিকায় অবস্থান করছে।
অন্যদিকে মানব উন্নয়ন সূচকে সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম স্থানে আছে নরওয়ে, দ্বিতীয় অবস্থানে অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় অবস্থানে আছে। প্রতিবেদনের মুখবন্ধে ইউএনডিপি কর্মাধ্যক্ষ হেলেন ক্লার্ক উল্লেখ করেছেন, এই প্রথম সমন্বিতভাবে সমগ্র দক্ষিণ সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সামাজিক পরিবর্তনের চালিকা শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
তবে গতকাল প্রতিবেদন প্রকাশকালে বক্তারা বাংলাদেশ এবং অগ্রসরমান অন্যান্য অর্থনৈতিক শক্তিসমূহের অর্জনের সাথে সাথে তাদের দুর্বলতাগুলোর দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহের সাথে সাথে দারিদ্র্য আর লিঙ্গ বৈষম্যও এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুসারে, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে পতিত মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অনুপাতে অনেক বেশি। এর মধ্যে বংলাদেশের হার সবচেয়ে বেশি (৫৮%)। ভারতে এই হার ৫৪%, পাকিস্তানে ৪৯% আর নেপালে ৪৪%। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশগুলোর এসব সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকতেই হবে, এমনকি আসছে দশকে তার গতিকে বাড়িয়ে দিতে হবে বহুগুণ।
