লেনদেন খরার আবর্তে শেয়ারবাজার

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৩, ১৯:৪৫
গত কয়েক মাস ধরে শেয়ারবাজারের লেনদেন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ৫ মাসের মধ্যে মাত্র তিনদিন লেনদেন হয়েছে পাঁচশ’ কোটি টাকার উপরে। এই সময়ে দৈনিক (গড়) লেনদেন নেমে এসেছে ২৭০ কোটি টাকায়। অথচ ২০১০-এর শেষের দিকে শেয়ারবাজারে দৈনিক লেনদেন ছিল দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা। কোনো কোনো দিন তিন হাজার কোটি টাকাও লেনদেন হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে নিট বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় লেনদেনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এতে বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কটও তীব্র হয়ে উঠছে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা অন্যদিকে আস্থা সঙ্কটের তীব্রতায় লেনদেন খরা থেকে বের হতে পারছে না শেয়ারবাজার। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ারবাজারে সূচকের ওঠানামা থাকতেই পারে, তবে লেনদেন কমে যাওয়াই বর্তমানে বাজারের প্রধান সমস্যা। কারণ লেনদেন কমে যাওয়ায় বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ে বড় ধরনের চাপ পড়েছে। ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খেয়ে অনেকেই কর্মচারি ছাঁটাই করতে শুরু করেছে। তাছাড়া আয় না থাকায় এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগও কমে গেছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো ভালো মুনাফা করতে না পারায় দীর্ঘমেয়াদের বিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারছেন না। ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে গেছে। বাজারের সার্বিক বিনিয়োগ কমে যাওয়ার দুটি বড় কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা কারণে আস্থা সঙ্কটের তীব্রতা এবং মার্জিন ঋণের কারণে ১৫ হাজার কোটি টাকা আটকে যাওয়ায় তারল্য সঙ্কট। বাজার ইতিবাচক হতে পারে এমনটাই মনে করতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফলে তারা বিনিয়োগ করে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে রাজি নন। তবে আস্থার সঙ্কটের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে পর্যাপ্ত টাকার সঙ্কটকেও লেনদেন ধসের অন্যতম কারণ বলে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সমপ্রতি বাজারে লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের সাথে বৈঠক করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে লেনদেনে ধসের পেছনে তারা ৪টি সমস্যা চিহ্নিত করেছে। প্রথমত; স্টক ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার মার্জিন ঋণ আটকে আছে। বর্তমানে যে ইক্যুইটি রয়েছে তাতে শেয়ার বিক্রি করলে ২৫ শতাংশ মার্জিন লোনই ফিরে পাওয়া যাবে না। তাই এই মার্জিন ঋণের টাকা লেনদেন করা যাচ্ছে না। অথচ মার্জিন ঋণ সুবিধাভোগীরাই বাজারে লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বিতীয়ত; প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে ডিএসই সদস্যরা (ব্রোকারেজ হাউস) বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু ডিএসই সদস্যদের ব্যাংক লোন পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া লেনদেন কমে যাওয়ায় ব্রোকারেজ হাউসগুলোর আয় কমে যাওয়ায় তাদেরও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তৃতীয়ত; অব্যাহত দরপতনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক হয়ে পড়ায় তারা প্রভিশনিং রাখতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে বিনিয়োগ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। চতুর্থত: বাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কমিয়ে আনার প্রবণতা। এসব সমস্যা সমাধানে একটি প্রস্তাবনা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দিয়েছে সংস্থাটি। এদিকে শেয়ারবাজারে লেনদেন খরা কাটাতে ডিএসই’র পক্ষ থেকে স্টক ডিলারদের ঋণ সীমা ১ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্টক ডিলারদের ঋণ সীমা বৃদ্ধি করে তিন কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের পরও গত বৃহস্পতিবার বাজারে লেনদেনে প্রভাব পড়েনি। গত কয়েক মাস ধরে বাজারে লেনদেন কমে যাওয়া প্রসঙ্গে বিএসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, শেয়ারবাজারে বর্তমানে আস্থা সঙ্কটের সাথে সাথে তারল্য সঙ্কটও রয়েছে। গত দুই বছরে পুঁজিবাজারে তহবিল প্রবাহ বাড়ানোর জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তহবিল প্রবাহের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক রয়েছে। তাই আস্থা ফেরানোর জন্য সরকারের গঠনমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বুঝাতে হবে যে, তারা পুঁজিবাজারের প্রতি আন্তরিক। এজন্য সবাইকে একই সুরে কথা বলা দরকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।