আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সংঘাতের পথ পরিহার করে সমস্যা সমাধানে সংলাপের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সরকার সংলাপের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, আপনি প্রস্তুত হন। সংলাপের দ্বার সব সময় খোলা রয়েছে। কারণ যেকোনো সমস্যা সমাধানে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। দেশের আপামর মানুষের একটাই দাবি, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন, সংঘাত পরিহার করুন। তবে আলোচনায় বসার আগে বিরোধী দলকে কোনো শর্ত না দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে আশরাফ বলেন, ‘তথাকথিত’ নিরপেক্ষ ও অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে অতীতের ন্যায় আর কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে তৃতীয় শক্তি আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল শনিবার বিকালে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী অবস্থানে বিভিন্ন মহল থেকে সংলাপের কথা বলা হচ্ছে। সংলাপের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ চেয়ে বিএনপির মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম গতকাল সকালে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। বিকালে সাংবাদিক সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, এত শর্ত দিয়ে আলোচনা হয় না। আলোচনার মধ্যে গিভ অ্যান্ড টেক আছে। সম্ভাব্য সংলাপের বিষয়ে আশরাফ বলেন, আমরা আলোচনার জন্য কোনো কন্ডিশন দেইনি। ফরমাল (অনুষ্ঠানিক) আলোচনার আগে ইনফরমাল (অনানুষ্ঠানিক) আলোচনা হয়। প্রথমে টিম আকারে আলোচনা হয়, তারপর দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়। মির্জা ফখরুলের প্রস্তাব শুনে মনে হয়, উনার বাড়িতে যেয়ে পায়ে হাত দিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে আসতে হবে।
এর আগে কয়েকবার সাংবাদিক সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, দুই দলের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে; যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এই ধরনের আলোচনার খবর নাকচ করা হয়। সেই আলোচনার অগ্রগতি কতদূর জানতে চাইলে গতকাল আশরাফ হেসে বলেন, আপনাদের কাছে সব প্রকাশ করলে তো আলোচনা ব্যাহত হতে পারে। শাহবাগের সবাইকে নাস্তিক বলে খালেদা জিয়ার দেয়া বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে সৈয়দ আশরাফ বলেন, এই অশোভন, অশ্লীল ও ন্যক্কারজনক বক্তব্য দেশের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। তিনি বলেন, যে কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে উনি বেপরোয়া হয়ে গেছেন। দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি আর ক্ষমতায় আসবে না এটা খালেদা জিয়া বুঝে গেছেন। বাংলাদেশে তার পায়ের তলায় মাটি নেই। নিজেকে রক্ষা করা, দুর্নীতিগ্রস্ত দুই পুত্রকে রক্ষা করার জন্য ক্ষমতায় যাওয়া তার (খালেদা জিয়া) খুবই জরুরি। শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিএনপি আরেকটি ওয়ান ইলেভেন তৈরির পাঁয়তারা করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আবার এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশের সবাই অসুবিধায় পড়বেন। তিনি বলেন, সারা বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী হচ্ছে, তা দেখছে। দেশের ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার সাফল্য অর্জন করেছে। তবে দেশকে স্বাভাবিক গতিতে চালানোর জন্য সবার সহযোগিতা দরকার। তিনি বলেন, মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক ঘণ্টা আগেও সরকার ক্ষমতা ছাড়বে না। জনগণের জানমাল রক্ষার উদ্দেশ্যে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মূলত মুন্সীগঞ্জে দেয়া বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাব দিতেই শনিবার বিকালে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আন্দোলনকারীরা ‘নাস্তিক’- খালেদা জিয়ার এমন মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে সৈয়দ আশরাফ পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, শাহবাগের আন্দোলনে বাবার কোলে, মায়ের কোলে যেসব ছোট ছোট শিশু সামিল হয়েছিল, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র-ছাত্রী অংশ নিয়েছেন তারা সবাই কী নাস্তিক? দেশের কে নাস্তিক বা আস্তিক এই সার্টিফিকেট দেয়ার অধিকার খালেদা জিয়াকে কে দিয়েছে?
সারাদেশে সহিংস ঘটনার দায় খালেদা জিয়াকেই অর্ধেকের বেশি নিতে হবে উল্লেখ করে সৈয়দ আশরাফ বলেন, খালেদা জিয়া সিঙ্গাপুর থেকে দেশে এসে গৃহযুদ্ধের ডাক দিলেন, শাহবাগকে কলুষিত করলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করলেন। আমাদের কাছে খবর রয়েছে, অর্ধেকের বেশি জায়গায় বিএনপি নেতকর্মীরা মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর করেছে, তাদের সঙ্গে ছিলো জামায়াতিরা। জামায়াত বাংলাদেশে বড় কোনো শক্তি না। এই কলঙ্কের দায় খালেদাকেই বেশিরভাগ নিতে হবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে বলেছেন, এখন আওয়ামী লীগ মসজিদে আগুন দিবে। নিশ্চয় তার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। তারই ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন তিনি।
খালেদা জিয়াকে অশালীন বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে লজ্জিত। তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আপনি যেধরনের মন্তব্য করেছেন তাতে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি কলঙ্কের অধ্যায় রচিত হয়েছে। আপনার প্রতি অনুরোধ, আপনার মান-সম্মান মানে আমাদেরও মান-সন্মান। কারণ আমরা রাজনীতি করি। এভাবে অশালীন মন্তব্য করে পুরো রাজনীতিকে কলুষিত করবেন না।
শাহবাগের আন্দোলন প্রসঙ্গে সৈয়দ আশরাফ বলেন, শাহবাগ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। আমরা ভেবেছিলাম এখনকার তরুণেরা ব্লগ, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, র্যাপ মিউজিক নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তারা এমন চেতনা ধারণ করেছে যে তারা স্ব স্ব উদ্যোগে শাহবাগে এসে উপস্থিত হয়েছে। শাহবাগের আন্দোলন কোনো সঠিক কাঠামোতে চলছে না। এটা নতুন প্রজন্মের মহাসমাবেশ। তারা পটকা ফোটায় নি। মসজিদ-মন্দির অবমাননা করেনি। কোনো কটূ কথাও বলেনি। তাদের একটাই দাবি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা এবং বিচারের রায় কার্যকর করা। তারা স্ব উদ্যোগে এখানে এসেছে।
খালেদা জিয়া বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন দাবি করে সৈয়দ আশরাফ বলেন, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে দেশের সেনা, নৌ, পুলিশ বাহিনী কাজ করছেন; কিন্তু খালেদা জিয়া হুমকি দিয়েছেন পুলিশ যেভাবে মানুষ হত্যা করছে তাতে জাতিসংঘ তাদের নিষিদ্ধ করতে পারে! খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, জুজুর ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। দেশে এখন সেই অবস্থা নেই। জাতিসংঘে সব বাহিনীর সদস্য যাচ্ছেন ও যাবেন। কোনো বাহিনী নিষিদ্ধেরও কোনো সুযোগ নেই। বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করবেন না, কোনো লাভ হবে না।
গণমাধ্যমের উদ্দেশে সৈয়দ আশরাফ বলেন, সত্যকে প্রাধান্য দেন, নিজের মতকে নিজের চিন্তা-চেতনাকে প্রাধান্য না দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করুন। গণতান্ত্রিক দেশের গণমাধ্যম হিসেবে জাতি আপনাদের কাছে এটাই প্রত্যাশা করে।
সাংবাদিক সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ।
