গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, ‘গণজাগরণ মঞ্চ সম্পর্কে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া যে বক্তব্য দিয়েছেন তা জনগণের প্রত্যাশার বিপরীত। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জনআকাঙ্ক্ষাকে অপমান করেছেন।’ বিরোধী দলীয় নেত্রীর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই নাস্তিক আর নষ্ট ছেলেরাই দেশকে স্বাধীন করার জন্য অস্ত্র ধরেছিল, এখন তারাই মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত অর্জন পুনরুদ্ধারের জন্য মাঠে নেমেছে। আপনি নাস্তিকদের পাশে, না খুনি-ধর্ষক জামায়াত-শিবিরের পাশে দাঁড়াবেন, সেই সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে।’ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলা-সহিংসতার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠিত সম্প্রীতি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ এই সমাবেশের আয়োজন করে। এ সময় ইমরান সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি এবং অসাম্প্র-দায়িক বাংলাদেশ গড়তে মঞ্চের সংগ্রাম-আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে আবারো ঘোষণা দেন।
প্রসঙ্গত গত শুক্রবার মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে ‘আওয়ামী লীগ ঘরানার এবং নাস্তিক চত্বর’ বলে অভিহিত করেন বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া। আন্দোলনরত তরুণদের ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, ‘শাহবাগের তরুণরা আইন-আদালত-বিচার মানে না। এই নষ্ট ও নাস্তিক তরুণদের নিয়ে সরকার নিজের ব্যর্থতা ঢাকতেই নানা অপকর্ম করছে।’
খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সমাবেশের সভাপতি ইমরান এইচ সরকার আরো বলেন, ‘আমরা সব সময় বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি সম্মান জানিয়ে বক্তব্য রেখেছি। তিনি যখন মুন্সীগঞ্জে মন্দির পরিদর্শনে যান তখন আমরা ভেবেছিলাম তিনি জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে তার যে রাজনৈতিক বন্ধন আছে তা ছিন্ন করার ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো জনআন্দোলনের বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। এটি জনগণের প্রত্যাশিত ছিল না।’
ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ডা. ইমরান বলেন, ‘আমরা কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নই। ছয়টি স্পষ্ট দাবির বাইরে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। যদি খুনি-ধর্ষকদের বিচার চাওয়া নাস্তিকতা ও নষ্ট তারুণ্য হয়—তাহলে আমরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও সেই বিচারের দাবি করে যাব।’ তিনি বলেন, গত ৩৯ দিনের আন্দোলনে আমাদের যেমন সফলতা রয়েছে, তেমনি অনেক অপপ্রচারও সহ্য করতে হয়েছে। খুনি যুদ্ধাপরাধীদের মদদপুষ্ট গণমাধ্যম ও তাদের অর্থপুষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব অপপ্রচার করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
‘হেফাজতে ইসলাম’কে আলোচনার প্রস্তাব দেয়া প্রসঙ্গে ইমরান বলেন, আমরা তাদের আহ্বান জানিয়েছি, আন্দোলন সম্পর্কে যেসব বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বা আন্দোলন নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসুন। কিন্তু কেউ আলোচনায় আসেননি, কারণ তারা জানেন যে তারা যা বলছেন সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।
সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির যে দাবি তা সমাজে ন্যায়বিচারের যে কাঙ্ক্ষিত আকাঙ্ক্ষা তা বাস্তবায়নের জন্য। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীরা যেভাবে গণহত্যা-ধর্ষণের মতো অপরাধ সংঘটিত করেছিল সেভাবে এখনো জামায়াত-শিবির একই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য গণহত্যায় জড়িত সবার বিচার করতে হবে।’
‘তিনি নব্য ফতোয়াবাজ’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধীদের কার্যকলাপে কোনো পরিবর্তন আসেনি। একাত্তর সালে এরা মরণ ছোবল হেনেছিল, এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করতেই ওরা সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে।’ খালেদা জিয়াকে ‘নব্য ফতোয়াবাজ’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘আপনি শাহবাগের আন্দোলনকারীদের নাস্তিক বলেছেন। আপনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন—আপনি, না শাহবাগের তরুণ প্রজন্ম, কে নাস্তিক।’
সমাবেশে সব ধর্মের মানুষের সম্প্রীতি রক্ষা করার দাবি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা সৈয়দ ইমদাদ উদ্দীন, মহাপ্রকাশ মঠের অধ্যক্ষ কান্তিবন্ধু ব্রহ্মাচারী, মুক্তিযোদ্ধা বিশপ মাইকেল এ শাহ? এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক বিমান চন্দ্র বড়ুয়া।
গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক মারুফ রসুলের সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আমজাদ আলী, অধ্যাপক সোনিয়া নিশাত আমিন, ড. শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান, ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি পিনাক রায় পিন্টু, ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি রাশেদ শাহরিয়ার, জাসদ ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এহসানুল হাবিব প্রমুখ।
প্রতি শুক্রবার শাহবাগে সমাবেশ
এদিকে গণজাগরণ মঞ্চের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী প্রতি শুক্রবার শাহবাগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে গতকাল আবারো ঘোষণা দেয়া হয়। ঢাবি ছাড়াও গতকাল রাজধানীর ঢাকা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, ইডেন কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলনরত ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ গতকাল ৪০ দিন পার করলো।
