জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রেখেছিল সরকার। সরকারের অন্যান্য প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পেও ছিল অর্থ লুটপাটের প্রতিযোগিতা। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহের জন্য দরপত্র গ্রহণ থেকে শুরু করে, প্রতিষ্ঠান মনোনয়ন এবং সর্বশেষ ক্যাপসুল সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় ছিল লুটপাট, অনিয়ম আর দুর্নীতি। সরকারের একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ওষুধগারের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী এ প্রকল্পে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।
প্রভাবশালী একটি মহলের ইশারায় ক্যাপুসল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় একটি ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারতীয় অলিভ কোম্পানির নামে দেশীয় নিম্নমানের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল চলতি ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন কার্যক্রমে সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ কাজ করে তারা হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কমিটির এক শ্রেণীর কর্মকর্তা ঐ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।
ভিটামিন এ ক্যাপসুল কেলেংকারির ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম লস্করের নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত টিমকে এ বিষয়টি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জানা গেছে , দুই-একদিনের মধ্যে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দাখিল করবে।
ভিটামিন এ ক্যাপসুল কেলেংকারি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা: আ ফ ম রুহুল হক বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান, দুই-একদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন তার হাতে আসবে। একই সঙ্গে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেয়ার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী গতকাল শনিবার ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০১১ সালে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে (সিএমএসডি) তারা সরবরাহ করে। তবে গত মঙ্গলবার দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন দিবসে তারা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করেনি। দরপত্রের মাধ্যমে ২০১১ সালের মে মাসে কয়েক লাখ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করা হয়। যদি আগের কোনো ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল থেকে থাকে তাহলে হয়তো কেন্দ্রীয় ওষুধাগার থেকে তা সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানায় গ্লোব কর্তৃপক্ষ। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর থেকে জানানো হয় গত মঙ্গলবারের জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন দিবসে শুধু ভারতীয় অলিভ কোম্পানির তৈরি ক্যাপসুল সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু ওইদিন গ্লোব কোম্পানির তৈরি ক্যাপসুল খাওয়ানো হলে এ নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগে শুরু হয় তোলপাড়।
ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন দিবসে এই অঅনুমোদিত ভিটামিন ‘‘এ’’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক ওষুধ খেয়ে দেশব্যাপী হাজার হাজার শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গিয়েছে। গতকাল পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চিকিত্সক ও শিশুদের অভিভাবকরা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।
অভিভাবকরা দাবি করেছেন, নিম্নমানের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ি খেয়ে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে চিকিত্সকরা বলেন, ফেসবুকে ও মাইকিং করে ভিটামিন এ ক্যাপসুলের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণার কারণে অভিভাবকরা আতংকিত হয়ে পড়েন। আর এই আতংকের কারণে অনেক জায়গায় শিশুরাও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাব দেয়া হয় জানুয়ারি মাসে অর্থাত্ শীত মৌসুমে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস খাওয়ানোর উপযুক্ত সময়। এর ভিত্তিতে গত ৫ জানুয়ারি ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর দিন নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে সরবরাহকারী ভারতীয় অলিভ কোম্পানির ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। এই ক্যাম্পেইনে অর্থ যোগানদাতা বিশ্বব্যাংক সরাসরি এতে আপত্তি জানায়। বিশ্বব্যাংক সাফ জানিয়ে দেয়, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ল্যাবরেটরি থেকে গুণগতমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল ক্যাপসুল বিতরণ করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এই আপত্তিতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত ল্যাবরেটরি থেকে ক্যাপসুল পরীক্ষা করা হয়। এ ক্যাপসুলের মান ভাল এবং শিশুদের খাওয়ানো নিরাপদ বলে পরীক্ষার পর রিপোর্ট দেয়া হয়। রিপোর্ট পাওয়ার পর বিশ্বব্যাংক তাদের আপত্তি তুলে দেয়।
বিশ্বব্যাংকের অনুমতির পরই অলিভ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে সরবরাহ করে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান। এ কারণে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন তিন মাস দেরিতে গত মঙ্গলবার দেশব্যাপী খাওয়ানো হয়। ১৯৭৪ সাল ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুদের খাওয়ানো শুরু হয় বলে পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান। কখনো ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে হাজার হাজার শিশু অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. একলাসুর রহমান বলেন, ২০০৯ সালে শুধু ফরিদপুরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে ৫ জন শিশু মারা যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তদন্ত করে দেখা যায় যে, শিশুরা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে মারা যায়নি। কেউ নিউমোনিয়া ম্যানেনজাইটিসসহ বিভিন্ন রোগে মারা যায় বলে তিনি জানান।
কয়েকজন সিভিল সার্জন জানান যে, ৫ জানুয়ারি দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর তারিখ নির্ধারিত ছিল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে কেন্দ্রীয় ওষুধাগার থেকে তাদের কাছে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পাঠানো হয়। জেলা পর্যায়ে ওষুধ সংরক্ষণের আধুনিক কোন ব্যবস্থা নেই। সঠিক সংরক্ষণের অভাবে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও কৃমিনাশক বড়ির গুণগত মান খারাপ হতে পারে বলে তারা জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আবম ফারুক বলেন, ২০০৯ সালের শেষ দিকে স্বাস্থ্য বিষয়ক সংসদীয় উপ-কমিটির আহ্বায়ক নাজমুল হাসান এমপির অধীনে ১০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল তার নেতৃত্বে নোয়াখালী বিসিক এলাকায় গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস কারখানায় পরিদর্শনে যান। ঐ সময় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল তৈরি করার কোন ব্যবস্থা সেখানে দেখতে পাননি। তবে বর্তমানে এ কোম্পানির তৈরি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সম্পর্কে যে অভিযোগ উঠেছে তা নিরসনে তদন্ত করা দেখা যেতে পারে। গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানার কি ধরনের মেশিন, ব্যবস্থাপনা ও ভিটামিন ‘এ’ ওয়েল (তেল) পরীক্ষা করে দেখলে গুণগতমান নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে তিনি জানান।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর খোকন মল্লিক বলেন, গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল নিয়মিত বাজারজাত করা হয় কিনা তা যাচাই করবেন।
অপর এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসকে নিয়মিত বাজারজাত করার জন্য ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের অধিদফতর থেকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছে। তার জানা মতে এ কোম্পানি নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বাজারজাত করে না। তারা শুধু দরপত্র পেলে ঐ সময় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল উত্পাদন করে সরবরাহ করে থাকে। ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে দরপত্রের মাধ্যমে ২৫ লাখ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস। নিয়মিত উত্পাদন ও বাজারজাত না করলে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বলে উক্ত কর্মকর্তা জানান।
কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার বলেন, খুলনায় ১৯ হাজার ৫শ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল গ্লোব ফার্মাটিউটিক্যালসের। এ কোম্পানি ২০১১ সালে ক্যাপসুল কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে সরবরাহ করেছিল। এ ক্যাপসুলের গুণগতমান সঠিক বলে তিনি দাবি করেন। তবে গত মঙ্গলবার জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন দিবসে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ভিটামিন ‘এ’ অন্তর্ভুক্ত ছিল না বলে তিনি জানান।
এদিকে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে গতকাল ভোরে হোজাইফা নামের দেড় বছর বয়সী এক কন্যা শিশু মারা গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হোজাইফা উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচএ) জানান, ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল খেয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে কিনা সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের বক্তব্য
গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশীদ কিরন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের উত্পাদনের নিয়মনীতি অনুসরণ করে নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল তৈরি করে আসছেন।
এদিকে গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘‘সরকারি ওষধাগার থেকে নকল ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ’’ শীর্ষক সংবাদের প্রেক্ষিতে কোম্পানির পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. খায়রুল আনাম এক প্রতিবাদে বলেছেন যে, গত মঙ্গলবার দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ করা হয়নি। ইহা ভারতীয় অলিভ হেলথ কেয়ার নামক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরবরাহকৃত ২০০৮ সাল থেকে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস কেন্দ্রীয় ওষধাগারে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকৃত ভিটামিন ‘এ’ নিয়ে কোন ধরনের নেতিবাচক রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে দরপত্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ওষধাগারে এ কোম্পানির তৈরি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ হয়। এ ক্যাপসুলের ব্যবহারের ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত মেয়াদ উত্তীর্ণের সময় নির্ধারণ। নিজস্ব মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে গুণগতমান সম্পর্কে নিশ্চিত করা হয়। এ ক্যাপসুলের কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। ওষধ প্রশাসন অধিদফতর কর্তৃক অনুমোদিত এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা গাইড অনুযায়ি কঠোরভাবে মাণনিয়ন্ত্রিত। ১০০ অধিক ওষুধ এ কোম্পানি উত্পাদন করে দেশে ও সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। এ কোম্পানির ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে তা সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।
