‘নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে মিথিলা। বাড়ি সদর উপজেলার ফতুল্লা চাঁদমারী এলাকাতে। নিয়মিত যাতায়াত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড দিয়ে। আগে যাতায়াতে ছিল না কোন ভাবলেশ। বুধবার দুপুর ১২টায় স্কুল শেষে বাসায় ফেরার পথে লিংক রোডের উত্তর চাষাঢ়া এলাকায় এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনে আসা মাত্র যেন রিকশা চালককে ক্ষণিক সময়ের জন্য থামিয়ে দেন। সঙ্গে থাকা মাকে বলেন, ‘মা এটা সেই স্কুল না যেখানে ত্বকী ভাইয়া পড়তো। আম্মু ভাইয়াকে খুনীরা কেন খুন করলো, ভালো ছাত্র ছিল বলে। আম্মু আমি আর ভালো ছাত্রী হবো না। যদি আমাকেও ত্বকী ভাইয়ার মত খুন করে ফেলে।’ বলেই মিথিলার চেহারায় ভেসে উঠে ভীতির ছাপ। মেয়ের এমন কথা শুনে রীতিমত আতকে উঠে মিথিলার মা শায়লা বেগম। একই আতংক বিরাজ করছে নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি অভিভাবকদের মধ্যে।
নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীর প্রায় সবগুলো স্কুলের শিক্ষার্থীরাই জানে ত্বকী হত্যার কথা। কিন্তু তারা কেউ বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। ত্বকীর মর্মান্তিক মৃত্যুটি নাড়া দিয়েছে পুরো দেশবাসীকেও। ত্বকীর হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবিতে আহূত হরতালে নারায়ণগঞ্জ শহরবাসী শুধু নয় জেলা বিভিন্ন থানায় এমনকি পাড়া-মহল্লায় প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা এখনও ত্বকীর হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে শহরে আন্দোলন করছে। ত্বকীর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ শহরে পালিত হরতালে যানবাহন তো দূরের কথা একটা সাইকেল পর্যন্ত চলেনি। ত্বকীর সহপাঠী কিংবা বন্ধুরাই নয় ত্বকীর জন্য সমগ্র নারায়ণগঞ্জবাসী কেঁদেছে। সাধারণ মানুষ ত্বকীর প্রকৃত হত্যাকারী কারা তা জানতে চান।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে ফতুল্লার চাঁদমারী এলাকাতে অবস্থিত এসিবি স্কুল। গত ৬ মার্চ ত্বকী নিখোঁজ হয় এবং এ স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর লাশ ৮ মার্চ উদ্ধারের পর থেকেই যেন স্কুলটির নাম উঠে আসছে বার বার। কারণ এ স্কুল থেকেই ৭ মার্চ ঘোষিত এ লেভেল প্রথম পর্বের ফলাফলে পদার্থ বিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ পেয়েছে যা বিশ্ব রেকর্ড। স্কুল সূত্রে জানা গেছে, ত্বকী চাষাঢ়ার এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুুলে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি হয় ২০১০ সালে। ওর জীবনে প্রথম স্থান ছাড়া দ্বিতীয় নেই এমন তথ্য জানিয়ে স্কুলের অধ্যক্ষ মো: আব্দুল হাই জানান, ত্বকী ছিল আমাদের স্কুলের গৌরব। ও লেভেলে দেশ সেরা ফলাফল করেছে। ত্বকীর ক্রীড়া শিক্ষক রানু খন্দকার জানান, আগামী ৩০ মার্চ স্কুলের সাংস্কৃতিক সপ্তাহতে ক্লাসিক্যাল গান গাওয়ার কথা ছিল ওর। কিন্তু সে গান গাওয়ার আগেই না ফেরার দেশে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল ত্বকী। সে আর আসবে না, গাইবে না গান। রানু আরো জানান, ত্বকী লেখাপড়ার পাশাপাশি ইনডোর-আউটডোর খেলাধুলাতেও দক্ষ ছিল। কৃতিত্বের জন্য অনেক পুরস্কার এই বয়সেই অর্জন করেছে সে। ত্বকীর সহপাঠী আরমান জানায়, ত্বকী যদিও কম কথা বলত তথাপি সে ছিল বন্ধুসুলভ। ওর বাসায় পৃথীবীর অনেক মণীষীর বই আছে তা জানিয়ে নুর বলেন, এই বয়সেই সে ওগুলো পড়ে ফেলেছিল। স্কুলের শিক্ষকরা জানান, মায়াবী, সুদর্শন চোহারার কিশোর ত্বকীকে দেখে সকলেই অনুধাবন করতে পারত এ ছেলে একদিন অনেক বড় হবে। কী পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন অথবা শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কিংবা সহপাঠী। কেউ কেউ তাকে স্নেহ করত তার মায়াবী চেহারার কারণে কেউবা মেধার গুণে আবার কেউ কেউ নম্র আচরণে মুগ্ধ হয়ে। সহপাঠীদের অনেকেই সমীহ করত ত্বকীর ঈর্ষণীয় সাফল্যে। পড়ালেখা থেকে শুরু করে সহপাঠক্রমিক কার্যাবলী কোনটিতেই ত্বকীকে ডিঙিয়ে যেতে পারত না কেউ। এ স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। তার বয়স হয়েছিল ১৭ বছর। অজ্ঞাত পরিচয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ৮ মার্চ সকালে শহরে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ৬ মার্চ বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল মেধাবী শিক্ষার্থী ত্বকী। ত্বকী হত্যার প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া ত্বকীর সহপাঠী নাদিয়া জানান, সবাই ভাবছে যে একজন ত্বকী হারিয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে দেশ একটি সম্পদ হারিয়েছে। মেধাবী ত্বকী সারা বিশ্বে পদার্থ বিজ্ঞানে সবোর্চ্চ নম্বর পেয়েছে। তার আরেক বান্ধবী ফারিয়া বলেন, আমার ত্বকীকে শুধু আমাদের সহপাঠীই ছিল না। সে ছিল আমাদের ভাল বন্ধু। সে ছিল শান্ত ও ভদ্র। তার কোন শক্র থাকতে পারে বা তাকে কেউ হত্যা করতে পারে তা আমরা কোন দিন কল্পনাও করতে পারিনি। যারা ওকে হত্যা করেছে তারা যেন শাস্তি পায়। ত্বকীর সহপাঠী রাফি, রাহুল, তন্ময়, ধ্রুব, আবদুল্লাহ, সৃজেন, আরমান, আদনান, পিথিলা, জাহারা, নীলা অর্পা, অনন্যা মারিয়া, জুবিকা, উর্মি, নীপু প্রিয়াংকা এদের সবার একটাই দাবি— ‘এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই’।
শিক্ষক দেখলেই মাথা নিচু করে থাকতো ত্বকী
এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের খেলাধুলার শিক্ষক রানু খন্দকার বলেন, ত্বকী দেশের ১০০ ছেলের চেয়ে ভিন্ন ছিল। সে ছিল স্বল্পভাষী, হ্যাঁ বা না ছাড়া তার কোন উত্তর ছিল না। কোন প্রশ্ন করলে মাথা নিচু করে জবাব দিত। ও কথা না বললেও ওর ভদ্রতা ছিল সকলের দৃষ্টিতে দৃষ্টান্ত। জুনিয়রা ওর স্নেহ-মমতায় খুবই আকৃষ্ট ছিল। আমাদের স্কুলে অনেক শিক্ষার্থী ভদ্রতা মার্জনায় ত্বকীকে ফলো করতো। কথা বলতে গিয়ে ত্বকীর শিক্ষক রানু খন্দকার কান্নায় ভেঙ্গে পরেন। ত্বকী নামের অর্থ হলো আলো। যে আলোয় উদ্ভাসিত ছিল শায়েস্তা খান সড়কের বাড়িটি। ঘরের মধ্যে তার উপস্থিতি আর পরিবারের কাছে আলোর মতই ছিল তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। আর আলোতেই পরস্ফুিটিত থাকতো পুরো পরিবার। কিন্তু সেই আলো পুরোদমে ছড়ানোর আগেই দুর্বৃত্তরা নিভিয়ে দিল ত্বকীর জীবনের আলো। পরিবারকে দিয়ে গেল অমানিশার ঘোর অন্ধকারে। ত্বকীর ঘরে গিয়ে দেখা গেছে ‘চাঁদর মোড়ানো বিছানাটি খুবই পরিপাটি। পাশের টেবিলে বইগুলো পড়ে রয়েছে কিছুটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। পড়ে রয়েছে হারমোনিয়ামটি, দাবার বোর্ড আর গুটিগুলো। রয়েছে কম্পিউটারের কী বোর্ড।’ সবই ঠিক রয়েছে, শুধু নেই একজন। আর সে হলো এ ঘরেই ছোট থেকে বড় হওয়া মেধাবী ত্বকী। এ ঘরে বসেই বিকাশ ঘটেছিল তার প্রতিভার। ত্বকীর ব্যবহারের জিনিসপত্র দেখে কিছুক্ষণ পর পর কেঁদে উঠছে তার বাবা আর মা। পুরানো স্মৃতি মনে করে আর ছবির অ্যালবাম দেখার সময়ে শব্দ ছাড়াই নীরবে পড়ছে বাবা রফিউর রাব্বির চোখের জল। মা রেহেনাও কাঁদছে ছেলের ব্যবহারের আসবাবপত্র, বই ঘেঁটে। ছোট ভাই সাকীও অনুভব করছে বড় ভাইয়ের তীব্র শূন্যতা।
