সত্তুর বছর বয়সেও মনিরা খানম নার্সিং পেসার সাথে জড়িত। সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে বর্তমানে মিরপুর-১ ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত আছেন। গোপালগঞ্জের কোটালী পাড়া, লাখিরপার গ্রামের মেয়ের ১৯৪৪ সালে জন্ম ‘চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালে। বাবার চাকরি সূত্রে চন্দ্রঘোনায় জন্ম, পড়ালেখা এবং বেড়ে উঠা। ছোটবেলা থেকে মানব সেবার প্রতি তার আগ্রহ। ব্যাপ্টিস্ট মিশন গার্লস হাই স্কুলে পড়ার সময় ১৯৬০ সালে ঢাকা থেকে একটি মেডিকেল টিম ঐ স্কুলে যায় এবং ঐ স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে সেমিনার করে এবং নার্সিং কি? এর কাজ কি? এর ভবিষ্যত্ কি? এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এবং সেদিনের পর থেকে নার্সিং এ নিজেকে উত্সর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬১ সালে মেট্রিক পাস করার পর পরীক্ষার মাধ্যমে নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে D. M. C. H এ ২২ আগস্ট যোগদান করেন এবং শুরু হয় মানব সেবার স্টেথিস্কোপ হাতে নিয়ে দৌড়ের পালা সিনিয়র নার্স হিসেবে প্রথম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করেন। ১৯৭১ সালে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ছিলেন তিনি। নিজের চোখে দেখা সে সময়ের ভয়াবহ দৃশ্যের কথা মনে হলে এখনও তিনি চমকে উঠেন। এবং পরিবার-পরিজন ছাড়া অচেনা পাবনা শহর, হাসপাতালে এক সময় তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য হঠ্যাত্ করেই বিয়ে করেন এবং স্বামী ও শ্বশুর বাড়ীর লোজজনের সাথে তাদের গ্রামে চলে যান সেই সময়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন সেদিন। যদিও পরবর্তীতে স্বামী সন্তান নিয়ে তার সুখী সংসার ছিল। তিন সন্তান তার প্রতিষ্ঠিত।
২০০০ সালে তার স্বামী মারা যান। ৩ সন্তান ৬ নাতি-নাতনীসহ বর্তমানে সংসার এবং পেশার দুই জায়গায়ই তিনি সুখী। পাবনা থেকে স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকায় P. G হাসপাতালে যোগ দেন এবং ১০ বছর P.G তে চাকরি করেন। ১০ জন রোগী এবং ৫ জন ডাক্তার নিয়ে P.G হাসপাতাল তখন চলছিল। এই ১০ বছর P.G হাসপাতালে তার চাকরি জীবনে অনেক স্মৃতি রয়েছে। P.G হাসপাতাল তখন দেশের একমাত্র নামকরা হাসপাতাল ছিল এবং V. I. P রোগীরা P. G তে চিকিত্সা করাতেন। সেবার জন্যই দেশে বহু বিখ্যাত মানুষের কাছে তিনি পৌঁছতে পেরেছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দীর্ঘদিন সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি ১১৭নং কেবিনে ভর্তি ছিলেন দীর্ঘদিন। এবং তখন ঐ বিভাগের দায়িত্বে তিনি নার্স হিসেবে ছিলেন। এবং যেদিন কবি মারা যান ৩১ আগস্ট ১৯৭৬ সালে তখন তিনি ডিউটিতে ছিলেন। তাঁর হাতেই কবির মৃত্যুর নার্সিং রিপোর্টটি লিখেছিলেন। এছাড়া মওলানা ভাসানী, পল্লীকবী জসীমউদ্দীনকে সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
মহাখালী নার্সিং কলেজ থেকে পরবর্তীতে B. SC করে টাঙ্গাইল নার্সিং ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতালের নার্সিং এবং মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নার্সিং এ পড়িয়েছেন তিনি। থাইল্যান্ড চিয়াংমাই এ ৬ মাসের ট্রেনিংয়ে ছিলেন তিনি।
আজিমপুর মাতৃসদন থেকেই তিনি ২০০০ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন এবং সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি বসে নেই আজ পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০২ সালে ‘বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল’ এর ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে মনোনীত হন এবং রেজিস্ট্রার হিসেবে তত্কালীন দেশের সরকারি ৩৮টি কেন্দ্রে পরীক্ষা নেয়ার জন্য যেতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫২ বত্সর নার্সিংয়ে আছেন। তিনি সুখী মা, শাশুড়ী ও সুখী সেবিকা হিসেবে নিজেকে এদেশের কাছে তুলে ধরতে গর্ববোধ করেন। সেবার পাশাপাশি তিনি নিজের সংসারকে একটি সুখের স্বর্গ হিসেবে তুলেছেন। ৫২ বছরের সেবার জীবনে যেসব বাধা বা কষ্ট তার ছিল তা তিনি ভুলে গেছেন বর্তমানের সুখের সময়ে। এই ৭০ বছর বয়সেও তিনি নিজে সুস্থ ও সুখী থেকে অসুস্থ ও দুঃখী মানুষের সেবা করছেন এটা এদেশের কয়জন মানুষের ভাগ্যে হয়। যে দেশের নারীদের কোন কাজের মনে করেন না। আর বয়স্ক নারীদের তো মানুষ হিসেবে মেনে নিতে পারেন না তার পরিবার পরিজনরাই। এসব দিক ভেবে ৭০ বছর বয়সে সংসার এবং ৫২ বছরের সেবার পেশায় মনিরা খানম পৃথিবীর সেরা সুখী মনে করেন নিজেকে।
