শিল্পী নবপ্রীত কাউর ১৯৪৫ সালের ৫ মার্চ জন্মেছিলেন ভারতের অমৃতসরের একটি গ্রামে। প্রকৃতি ও মানুষের সাথে সখ্য শৈশব থেকে। জীবনঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন নারী জীবনের অন্তরমহল, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গের কাব্য, স্রোতের বিপরীতে বসবাস করে লড়াই... অতঃপর জীবনের জয়যাত্রা। ছোটবেলা থেকেই দেখেছিলেন তাঁর মাকে, যিনি অপূর্ব সুচিকর্ম করতেন, অপূর্ব সব পোশাক বানাতেন, সংসারের চার দেয়ালে থেকেও পৃথিবীর আলোকে দেখার চেষ্টা করতেন। সংসারের সব দায়িত্ব, ভালোবাসাবোধ থাকার পরও নারীর জীবনে একটি নিজস্ব সত্তা আছে নিজস্ব ভুবন, মানুষ হিসেবে রয়েছে বিশেষ সম্মানবোধ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। হতে চেয়েছিলেন চিত্রকলার ছাত্রী। কিন্তু পরিবার চেয়েছিল তিনি হবেন একজন আদর্শ শিক্ষক। পরিবারের কথা মেনে তিনি আদর্শ শিক্ষকই হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই সময়ের বিয়ের প্রথায় ছেলে-মেয়ে পরস্পরকে দেখার সুযোগ ছিল না। এমনকি ছবি পর্যন্ত দেখার সুযোগ মেলেনি।
বিয়ের কয়েকদিন পর তিনি জানলেন তার স্বামী গভঃ আর্ট কলেজের শিক্ষক। অত্যন্ত বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছিলেন। সংসারের যাত্রার সাথে শিল্পের যাত্রাও শুরু হলো সমান ছন্দে। নিপাট নৈপুণ্যে সামলেছেন সংসার, সন্তান, স্বজনদের। দিনশেষে সামান্য অবসরের সময়টুকু ঢেলে দিতেন শিল্পের আত্মমগ্নতায়। দীর্ঘদিন কাজ করলেন। মৃিশল্প নিয়ে। খুবই সাফল্যের সাথে পটারী করছিলেন। অজস্র প্রদর্শনী ও পুরস্কারে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। দেশ ছাপিয়ে দেশের বাইরেও বেশ কয়েকটি প্রদর্শনীতে অংশ নিলেন। তার শিল্পকর্ম অত্যন্ত দৃঢ় ভঙ্গীমায় নিজস্ব সত্তায় পূর্ণ।
অন্যদিকে নিভৃতে চলতে থাকে পেইন্টিং- এর নিরন্তর কাজ। বিষয় হিসেবে চলে আসে নারী...নারীর অভিব্যক্তি, স্বপ্ন, প্রত্যাশা, অতঃপর যন্ত্রণার নিনাদ। শিল্পযাত্রা সমাজে একজন নারীর পক্ষে খুব সহজ বিষয় নয়। বৃহত্তর পাঞ্জাব, চণ্ডিগড়, নয়াদিল্লীর মতন সমৃদ্ধ শৈল্পিক পরিমণ্ডলে থেকেও তিনি উপলব্ধি করেছেন সমাজ ও স্বজনেরা খুব সহজেই একজন নারী শিল্পীকে নিষ্কণ্টক স্থান করে দেয় না। নিরন্তর লড়াই করে ছুটেই নারীকে আবিষ্কার করে নিতে হয় প্রার্থিত পথের দিশা। তাঁর জীবনে বাধা না হয়ে প্রেরণাস্বরূপ হয়ে এসেছেন স্বামী প্রফেসর ড. প্রেম সিং, যিনি দিল্লীর একজন স্বনামধন্য চিত্রকর ও চিত্রসমালোচক।
বর্তমানে নবপ্রীত কাউর একজন সুপ্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য দিল্লী-চণ্ডিগড় বেসড শিল্পী। তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য ফিগারেটিভ, সেখানে যুক্ত হয়েছে সু-রিয়েলিস্টিক ধারা। নারী, প্রকৃতি, গ্রামীণ নারী, তাদের অন্তর্কথা, বঞ্চনা ও প্রাপ্তির নানা জীবনালেখ্য উঠে আসে তাঁর কাজে। রঙের চড়া বিন্যাসে আছে মাত্রাবোধ। পাখি, ব্যাঙ, বিড়াল, কুকুর, গাছ, কায়া, এমন অনেক ফর্ম তাঁর কাজে চলে আসে। আবার বোরকা পরা রমণী ও মুখোশ, খাঁচাবন্দী নারীমন, টিয়ার সাথে কথকতা... এমন অজস্র ছবি তাঁর দেখা যায়। সমস্ত সৃষ্টির প্রেরণা আসে নারী জীবনের বাস্তব ও পরাবাস্তব অনুভবের অতলতা থেকে।
যেমন টিয়া যেন তাঁর কাজে নারীবান্ধব হিসেবে আসে। কখনো শূন্যতায় সে শ্বেতশুভ্র হয়ে ওঠে অথবা পূর্ণতায় বর্ণিল! কিন্তু....পরিশেষে তাঁর ছবি স্বপ্ন ও আশার কথা বলে। তিনি মনে করেন, সীমান্তের পাসপোর্ট অতিক্রম করলেও শিল্পীকে তাঁর স্বাধীনতা, শিল্পের জন্য শিল্পবান্ধব স্থান কেউ দেয় না। তাই একজন নারী শিল্পীর লড়াই বহুমুখী। বিশ্ব নারী দিবসসহ বিভিন্ন নারী প্রগতি সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত একক ও গ্রুপ এক্সিবিশনে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার, সম্মাননা, স্বীকৃতি।
শিল্পী নবপ্রীত কাউর নিরন্তর কাজের মধ্যে খুঁজছেন নারী জীবনের সার্থকতা ও জয়গানের শিল্পালেখ্য, যেখানে নারী শৃঙ্খলমুক্ত, স্বপ্নচারী, লড়াকু ও সুকোমল নারীসত্তার বিস্ময়কর বিজয়ের অনন্য প্রতীক।
