পানি সংকটে ভারত

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২০:২১
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে বিশ্বের যেকোন স্থানের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। বর্ষাকাল যেন এক মহাকাব্যিক বিষয় এখানে। কোনো কোনো দিনে এক ফুটের বেশি বৃষ্টিপাত হয় এই ছোট পাহাড়ি শহরটিতে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে অর্থাত্ নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এ অঞ্চলের অনেক জায়গায় একটু পানি পাওয়ার জন্য রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়। ঝর্ণা থেকে এক জগ পানি আনতে এখানকার মানুষদের দূর-দূরান্ত পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়। মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে ট্যাপের পানি দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা থাকে। আর যখন এ পানি আসে তা বেশির ভাগ সময়ই খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না। মেঘালয়ের ২৬ লাখ মানুষের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে বিশ্বের যেকোন জায়গার থেকে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এখানকার পানি সংকট সার্বিকভাবে পরিবেশগত নয়। মেঘালয়ের গ্রাম সোহরারিমে বসবাস করেন অর্ফিশা। শুষ্ক মৌসুমে পানি সংগ্রহের জন্য তাকে কমপক্ষে এক মাইল হাঁটতে হয়। দিনে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচবার তাকে এ কাজ করতে হয়। মাঝে মাঝে তার স্বামী সকালে পানি আনতে গেলেও বেশির ভাগ সময় তাকে এ কাজ করতে হয়। বস্ততপক্ষে ভারতে পানি আনার কাজটি বেশির সময় নারীদের উপরই বর্তায়। বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিপাতের এলাকাটির জনগণ যখন পানির কষ্টে ভোগে তখন, ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠী যে পানি সংকটে রয়েছে তা বুঝতে বাকি থাকে না। ইউনিসেফের মতে, প্রতি বছর ভারতে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার কারণে ৬ লাখ শিশুর মৃত্যু হয়। এর পেছনে রয়েছে বিষাক্ত পানি পান ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। খরাকবলিত মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী ভাস্কর যাদব বিপুল অর্থ ব্যয় করে সন্তানের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন। তার দলের প্রধান ও কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ার একে মারাত্মক অপচয় বলে বর্ণনা করেন। রাজ্যের খরা মেকাবেলায় রাজ্যের জন্য ১২শ’ কোটি টাকা দেয়া হবে জানান কৃষিমন্ত্রী। ভারতের গ্রামীণ এলাকায় দেশটির ৭০ শতাংশ মানুষ বাস করে। গ্রামীণ এলাকায় যে পানি সরবরাহ করা হয় তার অর্ধেকই বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত। ভারতের কারখানাগুলোতে কর্মসংস্থান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমে এসেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে এসব কোম্পাানিতে পানির সংকট। ভারতের এ পানি সংকট দিনে দিনে তীব্র হচ্ছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশটিকে পানি উত্পাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করতে হবে। অন্য একটি বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ পানির সরবরাহ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এসব শহরের মধ্যে দিল্লি, মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ ও চেন্নাই রয়েছে। এসব শহরের পানির স্তর এতো দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে যে, কয়েক বছরের মধ্যে এসব এলাকা শুষ্ক হয়ে যাবে। দিল্লির দক্ষিণে নতুন মেগাসিটি গুরগাঁওয়ের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গত বছর ভেঙে পড়ে। ঐ পরিস্থিতিতে দিল্লির এক বিচারক আদেশ দেন, মেগাসিটিতে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার না করে রিসাইকেল করা পানি ব্যবহার করতে হবে। এ ব্যবস্থার প্রমাণ না দেয়া পর্যন্ত সেখানে নতুন করে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে না। ভারতের এই বড় বড় শহরে পানি ব্যবস্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণেরও অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ইউরোপের যে কোন শহরের চেয়ে দিল্লির পানির প্ল্যান্টগুলো গ্রাহকদের জন্য বেশি পানি উত্পাদন ও সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু ট্যাপগুলোর মাধ্যমে দিনে মাত্র ৩ ঘণ্টার মতো পানি সরবরাহ করা হয়। এর কারণ হলো ফুটো নল ও চুরি। এই দুটি কারণে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পানি নষ্ট ও চুরি হয়। এ কারণে পাম্প বসিয়ে পানি উত্তোলন করার চেষ্টা থাকে বেশির ভাগ পরিবারের। বিশ্ব ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ স্মিতা মিশ্র বলেন, সাধারণ মানুষের পানির জন্য পাম্প বসাতে ও অন্যান্য যে সব খরচ করতে হয়, এর পরিমাণ যথাযথ পানি ব্যবস্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের খরচের চেয়ে কমপক্ষে তিন গুণ বেশি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেছেন, দেশের সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য আগামী অর্থ বছরে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে। যা গত বছরের থেকে ১৭ শতাংশ বেশি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ অর্থ পর্যাপ্ত নয়। কারণ এখনো ১০ কোটি লোক অনুন্নত উত্স থেকে পানি সংগ্রহ করে। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পানির সমস্যা হয়। দেশটির বিপুল পরিমাণ অঞ্চল অনুর্বর ও শুষ্ক। বিশ্বের ১৬ শতাংশ লোক বাস করে ভারতে। কিন্তু বিশ্বের মোট সুপেয় পানির মাত্র চার ভাগ রয়েছে এ বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য। সম্প্রতি দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হামিদ আনসারি পানি সংরক্ষণের উপর জোর দিয়ে বলেছেন, খারাপ পানি উত্পাদনের পরিমাণ কমাতে পানি সংরক্ষণের জন্য আমাদের কাজ করা উচিত। আমাদের জনগণকে বোঝাতে হবে পানি ও নষ্ট পানি কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ভারত শহরগুলো প্রতিদিন ৪০ হাজার মিলিয়ন লিটার পানির বর্জ্য উত্পাদন করে। যা দিয়ে ৯০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি চারটি দেশের মধ্যে তিনটি দেশ পানির তীব্র সংকটের মুখে রয়েছে বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশিয়া-প্রশান্ত পানি ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, কিরিবাতি, নাউরু ও টুভালু অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এছাড়া পানি ব্যবস্থাপনায় যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে দেশগুলো আরো সংকটে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ অঞ্চলের ৪৯টি দেশের মধ্যে ৩৭টিতে পর্যাপ্ত পানি নেই। বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন বন্যা ও খরা, নদী ও হ্রদের দূষণ, অতি পরিমাণে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়েছে। এছাড়া ভারতের মতো যেসব দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দিনে দিনে বাড়ছে সেখানে নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুত্ নির্মাণের ঝোঁক বাড়ছে। এতে পানির উত্স নষ্ট হচ্ছে। তাই সবদিক বিবেচনা করে সমন্বিতভাবে পানি ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হতে হবে।