চার্চকে দরিদ্রবান্ধব করবেন পোপ ফ্রান্সিস

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২০:২২
চরিত্রে সাধারণ। কিন্তু কাজে অসাধারণ। তার চরিত্রের এই দিকটিই এখন ফুটে উঠেছে বর্তমান বিশ্বের মানুষের কাছে। ধর্ম এবং দরিদ্রদের জন্য কাজ করতে নিজের জীবনকেই আগে তেমন অবস্থার মধ্যদিয়ে অতিবাহিত করতে হয় সেটি তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। আর তা হলেই সম্ভব ধর্মগুরু হিসাবে পরিচিতি পাওয়া। আর সেটিই তিনি পেয়েছেন। তিনি এখন সারাবিশ্বের ১২০ কোটি রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান ধর্মগুরু। তার ধর্ম প্রচারণা এখন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রোমান ক্যাথলিকদের পাথেয় হিসাবে বিবেচিত হবে। তিনি আর কেউ নন— তিনি পোপ ফ্রান্সিস। পুরো আসল নাম হোর্হে মারিও বেরগোগলিও। তিনি এখন ইতিহাসের সারথী। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার হাত ধরেই ধর্মযাজকরা হয়তো চার্চকে সকল বিতর্ক থেকে মুক্ত করবেন। চার্চ হবে দরিদ্রবান্ধব। গত বুধবার নির্বাচিত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার প্রথম উন্মুক্ত প্রার্থনায় নবনির্বাচিত পোপ ফ্রান্সিস ক্যাথলিক গীর্জাকে আধুনিকতা বর্জন করে কঠোরভাবে যিশুর জীবন অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। না হলে ক্যাথলিক গীর্জা দাতব্য সংস্থা বা এনজিওর মতোই হয়ে পড়বে বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন তিনি। ভ্যাটিকান সিটির তরফ থেকে জানানো হয়েছে, আগামীকাল ১৯ মার্চ মঙ্গলবার নতুন পোপের আনুষ্ঠানিক অভিষেক হবে। কার্ডিনাল বেরগোগলিওকে একজন রক্ষণশীল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যৌনতা প্রশ্নে তিনি একেবারেই প্রাচীনপন্থী। কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার প্রশ্নে তিনি কঠোর। তিনি তার ভদ্র আচরণের জন্য সুপরিচিত। তার পোপ হওয়াটা অনেকটা বিস্ময়কর। কারণ নির্বাচনের আগে কোনো আলোচনায় ছিলেন না তিনি। বিশেষ করে ইউরোপের বাইরে থেকে আবার পোপ আসবে সেটা ছিল আরো বিস্ময়ের। ইতিহাসের সারথি: বেরগোগলিও (৭৬) রোমান ক্যাথলিকদের ২৬৬তম পোপ। চার্চের দুই হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ল্যাটিন আমেরিকা থেকে তিনি ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের চার্চের প্রধান হলেন। এক হাজার তিনশ’ বছর পর ইউরোপের বাইরে থেকেও তিনি পোপ হলেন। সোসাইটি অব জেসসের সদস্য বেরগোগলিও বিশ্ববাসীর কাছে এখন পোপ ফ্রান্সিস। দারিদ্র্য, বিনয়, সহজ-সরল জীবন ও ক্যাথলিক চার্চের সংস্কারের প্রতীক হয়ে থাকা সেন্ট ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসির স্মরণে ‘ফ্রান্সিস’ নামটি নিয়েছেন নতুন পোপ। ত্রয়োদশ শতকের ইতালীয় ধর্মপ্রচারক ফ্রান্সিস বিপুল সম্পদ ত্যাগ করে বেছে নিয়েছিলেন দরিদ্রের জীবন। নির্বাচিত হওয়ার পর আরেকটি পুরনো প্রথা ভাঙ্গেন পোপ। নতুন পোপ হিসাবে আত্মপ্রকাশের সময় যাজকদের চেয়ে একটু উচুস্থানে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানান। যে কারণে ধর্মযাজক হওয়া: ল্যাটিন আমেরিকায় বিশ্বের মোট ক্যাথলিকদের ৪২ শতাংশের বসবাস। ঐশ্বর্যের বদলে ধর্মবিশ্বাসই যেখানে প্রধান। পশ্চিমের তুলনায় সেখানে ধর্মপ্রচারকারী চার্চের সংখ্যা অনেক বেশি। ওই পশ্চিমাদের মতো এরা ভোগবিলাসী নয়। যৌন নিপীড়নের ঘটনাও কম। সেই অঞ্চলেই তার জন্ম। ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে এক গরিব ঘরে জন্ম নেন বেরগোগলিও। ইতালীয় বাবা বুয়েনস আইরেসে রেলশ্রমিকের কাজ করতেন। মা ছিলেন গৃহবধূ। তারা ছিলেন সাত ভাই-বোন। রসায়নের ছাত্র বেরগোগলিও আর্জেন্টিনা ছাড়াও জার্মানিতে পড়ালেখা করেন। একটি ফুসফুস অকেজো হওয়ার এক দশক পর ৩২ বছর বয়সে ধর্মপ্রচারে মনোনিবেশ করেন। চার বছরের মধ্যেই স্থানীয় জেসাস সংঘের নেতা হন। ১৯৯২ সালে বিশপ এবং ১৯৯৮ সালে বুয়েনস আইরেসের আর্চ বিশপের দায়িত্ব নেন বেরগোগলিও। প্রভাবশালীদের ছাড় না দেয়ার অতীত ইতিহাস রয়েছে তাঁর। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ ক্রিশ্চনার এবং তার প্রয়াত স্বামী নেস্টর ক্রিশ্চনারের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছিলেন তিনি। ‘ঈশ্বরের পরিকল্পনা ধ্বংস করার চক্রান্ত’ অভিহিত করে সমকামী বিয়ের জোরালো বিরোধিতা করেছিলেন। ২০০১ সালে আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় বিক্ষোভে পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদও জানিয়েছিলেন। ছেলেবেলায় সমবয়সী এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। প্রেমিকাকে বলেছিলেন, তাকে বিয়ে না করলে এ জীবন ঈশ্বরের সাধনায় উত্সর্গ করবেন। কৈশোরে সেই প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ব্যথা বুকে নিয়ে তিনি দীর্ঘপথ একলা পাড়ি দেন। সাধনা করেছেন ধর্মের। তার স্বপ্নের সেই প্রেমিকার নাম এমিলিয়া দামন্তে। দু’জনেরই বয়স এখন ৭৬ বছর। তখন তাদের বয়স ছিল ১২ বছর। পোপ ফ্রান্সিস আর্জেন্টিনার শীর্ষ চার্চের দায়িত্ব পান ২০০১ সালে। কিন্তু তিনি চার্চ মিশনের অভিজাত অট্টালিকায় বাস করেননি। বাস ছিল উপশহর এলাকার একটি সাদামাটা বাড়িতে। তীব্র শীতের দিনে ঘর গরম করতে তার ছিল একটি মাত্র ছোট স্টোভ। শহরে যাতায়াতে তিনি ব্যবহার করেছেন গণপরিবহন। নিজেই রান্না করেছেন। চার্চের সহকর্মী নেতাদের ভণ্ড হিসাবে অভিযুক্ত করে বলেছেন তারা যিশুখ্রিষ্টের শিক্ষা ভুলে গেছেন। তিনি কুষ্ঠরোগীদের ধর্মে দীক্ষিত করেছেন। খেয়েছেন পতিতাদের সঙ্গে। ভ্যাটিকান প্রশাসনের অভ্যন্তরের কোনো বড় পদে ছিলেন না এই ধর্মগুরু। এ কারণে সংস্কারের ক্ষেত্রে ভ্যাটিকান থেকে তিনি বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন। সমালোচনা: নতুন পোপ ফ্রান্সিস সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। নিজ দেশ আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসনের সময় মানবাধিকারের অপব্যাবহারের বিরুদ্ধে তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। এমনই অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভ্যাটিকান। আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬ এবং ১৯৮৩ সালের মধ্যে ৩০ হাজার বামপন্থি অপহরণ ও হত্যাকারী সামরিক শাসকদের সঙ্গে উচ্চপদস্থ রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরুদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি দেশটির চার্চের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। সমালোচকরা বলছেন, সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানানো ধর্মগুরুদের রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। ওই সময় নেতৃস্থানীয় ধর্মগুরু হয়েও তিনি বিরোধী দুই জেসুইটকে গ্রেফতারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভ্যাটিকান। উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে নির্বাচিত পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট শারীরিক অক্ষমতার কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার বয়স এখন ৮৫ বছর। তিনি এখন পোপ এমিরেটাস হিসাবে অভিহিত হবেন। গত ছয়শ’ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম পদত্যাগ করলেন।