উন্নয়নের অর্থ দিয়ে ঋণ ব্যবসা

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২১:৪৭
উন্নয়নের অর্থ নিয়ে ঋণ ব্যবসা করছে সরকার। গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বাড়তি অর্থ দিয়ে গ্যাস খাতের উন্নয়ন করার কথা ছিল। কিন্তু সে অর্থ এখন ঋণ হিসাবে দেয়া হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস কোম্পানিসমূহকে। এতে করে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি তেল খাতের মতো গ্যাস উন্নয়ন খাতেও সরাসরি বরাদ্দ তুলে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো। বিদ্যুত্ ও জ্বালানি তেল খাতে সরকার আগে ভর্তুকি দিত। এখন ভর্তুকি না দিয়ে ঋণ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। একই দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গ্যাস খাতও। তবে এবার আর অর্থ মন্ত্রণালয় বা কোন ব্যাংক নয় জ্বালানি বিভাগই ঋণ দেয়া শুরু করেছে। সম্পূর্ণ অনুদানের নামে অর্থ নিয়ে দুই শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া হচ্ছে। ২০০৯ সালে গ্যাসের দাম ১১ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়ানোর সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে ‘গ্যাস উন্নয়ন তহবিল’ গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়। বলা হয়, গ্যাসে যে দাম বাড়ানো হচ্ছে সেই বাড়তি টাকার পুরো অংশ গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন কাজে খরচ করতে হবে। পরে এই তহবিল খরচসহ পরিচালনার জন্য জ্বালানি বিভাগ থেকে একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১১ সালে বিইআরসি সুপারিশ করে বলে যে, গ্যাস উন্নয়ন তহবিল থেকে বাস্তবায়িত প্রকল্পের বিপরীতে ব্যবহার বা বিনিয়োগ করা অর্থ প্রাথমিকভাবে অনুদান হিসাবে বিবেচিত হবে। একইসাথে দেশীয় তিনটি কোম্পানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স), বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস্ কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস্ লিমিটেডকে (এসজিএফএল) মোট ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। যখন চূড়ান্ত নীতিমালা করা হলো তখন অনুদানের এই টাকা আর অনুদান থাকেনি। অনুদানের টাকা বাণিজ্যিক করা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, গ্যাস উন্নয়ন তহবিল থেকে বিনিয়োগ করা অর্থ যে প্রকল্পে খরচ করা হবে তা লাভজনক/বাণিজ্যিকভাবে সফল বিবেচিত হলে তা দুই শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ ফেরত দিতে হবে। প্রথম তিন বছর গ্রেস পিরিয়ড ধরে প্রকল্প শুরুর পর দশ বছরের মধ্যে ১৪ কিস্তিতে (৪র্থ থেকে ১০ম বছরের মধ্যে) শোধ করতে হবে। তবে গ্যাস অনুসন্ধান কাজে খরচ করার পর উত্তোলনযোগ্য গ্যাস না পাওয়া গেলে এই অর্থ আর ফেরত দেয়া লাগবে না। তহবিলের অর্থ গ্যাসের মজুদ বাড়াতে অনুসন্ধান কাজ এবং উত্পাদন বাড়াতে খরচ করতে হবে। গ্যাস উন্নয়ন তহবিল থেকে রাষ্ট্রীয় তিন কোম্পানিকে তিন হাজার ৭৫১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যদিও এখানে ঝুঁকি বেশি। তবুও ঋণ হিসাবেই দেয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগসূত্র জানায়, তহবিলের অর্থ ১৩টি প্রকল্পে ঋণ হিসাবে দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত বাপেক্সকে মোট আটটি প্রকল্পের বিপরীতে মোট এক হাজার ৮০৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ১৫০০ এইচপি রিগ কিনতে ২০০ কোটি টাকা, সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা (সুনেত্র) তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননে ৮০ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ৫টি কূপ খননে ১ হাজার ১৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের জন্য গ্যাস প্রসেস প্ল্যান্ট সংগ্রহে ৯১ কোটি ১২ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডবাই গ্যাস প্রসেস প্ল¬্যান্ট সংগ্রহে ৫০ কোটি টাকা, ত্রিমাত্রিক জরিপ কাজে ২০০ কোটি, দ্বিমাত্রিক জরিপ কাজে ৭২ কোটি এবং রূপগঞ্জে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্পে ৯৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বিজিএফসিএলকে ২৫১ কোটি ২০ লাখ, এসজিএফএলকে ১১০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এছাড়া জিটিসিএফকে পাইপ লাইন করতে বাকি টাকা দেয়া হয়েছে। বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা ফারুক আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে তহবিলের অর্থ বাপেক্সকে অনুদান হিসাবে দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীকালে নীতিমালায় নতুন শর্ত জুড়ে ঋণ হিসাবে দেয়া হয়েছে। এমনিতেই বাপেক্স কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়। এই অবস্থায় ১০ বছর ধরে যদি এসব প্রকল্পের অর্থ পরিশোধ করতে হয় তাহলে বাপেক্স আগামী দশ বছরের আগেই দেউলিয়া হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো এই ঋণকে বাড়তি বোঝা মনে করছে। ঋণ হওয়ায় কোম্পানিগুলোর দায় বেড়ে গেল। বিশেষ করে বাপেক্সের জন্য। গ্যাস উত্পাদন খরচের চেয়ে কম দামে তারা বিক্রি করে। এই ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাপেক্স। শুধু ঋণ নয় ১০ বছর মেয়াদী এই ঋণের সঙ্গে দুই শতাংশ হারে সুদও দিতে হবে।