অভিবাসী গৃহকর্মীর নিরাপত্তাদান আইনে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৯
উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গতকাল অভিবাসী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিবাসন আইনে তাদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছেন। ঢাকার বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) আয়োজিত ‘ইমপ্রুভিং ওয়ার্ক সিচুয়েশন ফর উইমেন মাইগ্রেন্ট এর ডেসটিনেশন কান্ট্রিস’ শীর্ষক এক জাতীয় আলোচনা সভায় বক্তারা গতকাল এ সুপারিশ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর আহমেদ খান। বিএমইটি’র মহাপরিচালক বেগম শামসুন নাহার-এর সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব কাজী আবুল কালাম, বিএমইটি’র পরিচালক ড. মো. নুরুল ইসলাম, ইউএন উইমেন-এর প্রতিনিধি মাহতাবুল হাকিম, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরিদা ইয়াসমিন। সভায় বক্তারা বলেন, বিদেশে গৃহকর্মী নিয়োগের আগে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে সেই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানাতে হবে। যাতে তারা সেখানে সঠিক যোগাযোগ করতে পারে। ‘আমি সে দেশের ভাষা জানি না। তাদের কথাও কিছু বুঝতে পারতাম না। এজন্যে আমি তাদের কাজও ঠিকমত করতে পারতাম না। কাজেই কি ভুলের জন্য তারা আমাকে বকা দিচ্ছে বা মারধর করছে সেটাও বুঝতাম না। তাই একদিন ঐ বাড়ি ছেড়ে চলে আসি’—লেবানন থেকে ফিরে আসা পারভিন এভাবেই তার অভিজ্ঞতার কথা বলেন। গৃহকর্তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে যাওয়া ১৬ বছর বয়সী এই কিশোরী রাস্তায় বেরিয়ে দুষ্কৃতকারীদের পাল্লায় পড়েন। পরিণতিতে তাকে জ্ঞানহীন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দেয় দুষ্কৃতকারীরা। রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে লেবাননে কারিতাসের শেল্টার হোমে পাঠালে সেখানেই তার চিকিত্সা হয়। দুই মাস চিকিত্সা প্রদানের পর ওকাপের মাধ্যমে তাকে দেশে পাঠানো হয়। পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত পারভিন তার নিজের বাড়ির ঠিকানাও ভুলে গিয়েছিলো। কারণ তার পাসপোর্টে যেসব তথ্য দেয়া ছিলো সবই মিথ্যে। পরে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার একটি নদীর ঘাটের নাম বলতে পারলে সেটা থেকেই ওকাপ প্রতিনিধিরা তার পরিবারকে খুঁজে বের করে। পারভিন ২০১১ সালে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে লেবানন যান। সেখানে এক বাসায় চার মাস অবস্থান করেন। তার পাসপোর্টে ব্যবহূত ঠিকানা পটুয়াখালীর এবং বয়স দেখানো হয়েছে ২৫ বছরের ওপরে। বয়স প্রমাণের জন্য তাকে বোরখা পরিয়ে ছবি তুলে পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। এখানে উল্লে¬খ্য যে, বিএমইটিতে নিবন্ধনের জন্য তখনও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে হতো না। ‘আমার কাছে মনে হয়, সচিব হওয়ার চেয়ে গৃহকর্মী হওয়াটা অনেক বেশি কঠিন। তারা যে দায়িত্ব পালন করেন, সেটি অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তারা সমাজে সবচেয়ে কম মর্যাদা পান। তাই আগে আমাদের দেশে গৃহকর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করে তুলতে হবে’—প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সচিব ড. জাফর আহমেদ খান তার বক্তৃতায় একথা বলেন। গৃহকর্মীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সচিব বলেন, আমাদের দেশেই এখনও পর্যন্ত গৃহকর্মী নিয়োগে কোন নীতিমালা নেই। কোন গৃহকর্মী গৃহকর্তা বা তার পরিবারের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে নিজের দেশেই আমরা তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারি না। বিদেশেও একইভাবে তাদের প্রতি আচরণ করা হয়। অভিবাসী নারী শ্রমিক বিশেষত গৃহকর্মীদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও প্রবাসে নিরাপত্তাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে উল্লে¬খ করে প্রবাসী কল্যাণ সচিব সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। বেগম শামসুন নাহার বিদেশগামী নারী শ্রমিকদের জন্য বিএমইটি’র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণকে অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লে¬খ করেন। তিনি বলেন, বিএমইটির মাধ্যমে যারা বিদেশ গমন করেন তারা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায়ই থাকেন। তবে যারা দালাল ধরে যান তাদের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দেয়। তিনি জানান, অভিবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কান্ট্রি স্পেসিফিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। ২ মাসের এ প্রশিক্ষণ কোর্স সমাপ্ত করার পর তারা ঐসব দেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পাবেন। ওকাপ-এর শাকিরুল ইসলাম বলেন, অভিবাসী নারী শ্রমিকদের প্রধান সমস্যা, তারা যে দেশে যাবে সে দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তারা জানেন না। তাদেরকে পারিবারিক ব্যবহারের যন্ত্রপাতি সম্পর্কেও ব্যবহারিক ধারণা দেয়া হয় না। ফলে তারা বিদেশ গিয়ে প্রথমেই ভাষা সমস্যায় পড়েন। সে দেশের মানুষের কথা বুঝতে না পারায় তারা সঠিক যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন। তিনি বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সীর প্রতিশ্রুত কাজ না দেয়া, প্রবাসে গৃহকর্মীদের আইনী আশ্রয়ের সুযোগ না থাকা ইত্যাদি কারণে তারা বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন। তিনি লেবাননে অভিবাসী শ্রমিকদের আইনি সহায়তা বৃদ্ধির জন্য জাতিসংঘ কনভেনশনের ভিত্তিতে সে দেশের সাথে আলোচনার সুপারিশ করেন।