প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি বৃহত্তর সিলেট। বৃহত্তর সিলেটের ৪টি জেলায় বসবাসকারী মনিপুরী সম্প্রদায় আমাদের দেশ, জাতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মনিপুরীরা স্বাধীন ও সৌন্দর্য্যপ্রিয় জাতি। প্রকাশ, এদেশের মনিপুরীদের আগমন প্রায় ২৫০ বছর পূর্বে। কথিত আছে যে, ১৭৫৮-৫৯ খৃষ্টাব্দে ব্রহ্মদেশের রাজা মনিপুর রাজ্য আক্রমণ করলে মনিপুরীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আসাম, ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে এসে বসতি স্থাপন করে। তারা হবিগঞ্জ, সিলেট সদর, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে থাকে। হবিগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ও আহমদাবাদ ইউনিয়নের আবাদগাঁও, গোবরখলা, শিবনগর, দুধপাতিল, বনগাঁও, ফাটাবিল, যাত্রাগাঁও, ঠাকুরপাড়া, ডুলনা, কাটানিরবার, ইকরতলী, মানিকভাণ্ডার, গণকী, ছয়শ্রী, ঘনশ্যামপুর এলাকায় মনিপুরীদের বসবাস থাকলেও বর্তমানে উল্লেখিত গ্রামসমূহের মধ্যে কেবল ৪/৫টিতে মনিপুরী সমপ্রদায়ের লোকেরা আছে। অন্যান্য গ্রামের মনিপুরী অধিবাসীগণ নানা কারণে দেশত্যাগ করে পুনরায় তাদের আদি নিবাস ভারতের মনিপুর রাজ্যে ফিরে গেছে।
মনিপুরী সমপ্রদায়ের লোকেরা শান্তিপ্রিয় এবং মিষ্টভাষী। তারা সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাদের অনেকেই হিন্দু ও বৈষ্ণবধর্মে বিশ্বাসী। মনিপুরী সমপ্রদায়ের মধ্যে মীতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া নামক দুটি গোত্রের অস্তিত্ব দেখা যায়। তবে তাদের মধ্যে শারীরিক ও ভাষাগত ব্যবধান লক্ষণীয়। তারা পূজা অর্চনা করলেও অনেকে মূর্তিপূজা করে না। রথযাত্রা তাদের একটি বড় উত্সব। দোলপূর্ণিমায় রঙ খেলে যাকে হোলি খেলা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলা নববর্ষকে তারা ঘটাকরে বরণ করে। অপর একটি উত্সব হয় কার্তিক মাসে। শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা হিসাবে পূর্ণিমা রাতে মনিপুরীর লাইচাবী বা কুমারী মেয়েদের রাস নৃত্যের আয়োজন করে যা দেখার জন্য জনসাধারণ মনিপুরী গ্রামসমূহে ভীড় জমায়। যৌবনপ্রাপ্ত হলে মনিপুরীদের বিবাহবন্ধন বাধ্যতামূলক। অল্প কিংবা অধিক বয়সে বিবাহ তাদের অপছন্দ। দ্বিতীয় বিবাহ কিংবা স্বগোত্রে বিবাহ হয় না। ছেলে-মেয়ের সম্মতিক্রমে সাঁতপাকে প্রজাপতি বিবাহ জাঁকজমকের সাথে অনুষ্ঠিত হয়। মৃত্যুর পর মৃতদেহ দাহ করা হয়। মনিপুরী শিশু জন্মের ষষ্ঠ দিনে ষষ্ঠিপূজার মাধ্যমে নামকরণ করা হয়। তারা ভাত-মাছ-নিরামিষভোজী। মনিপুরী তাঁত শিল্পের কথা সর্বজনবিদিত। মেয়েরা নিজস্ব তাঁতে নিজ হাতে ওড়না, বিছানার চাদর এবং পরিধানের কাপড় বুনে থাকে।
মনিপুরীদের মধ্যে অশিক্ষিত নেই বললেই চলে। শিক্ষিতরা বিভিন্ন অফিস আদালতে পেশাজীবী হিসাবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছে। কবিগুরু রবীন্দ নাথ ঠাকুর মনিপুরী নৃত্যের সাথে পরিচিত হয়ে পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনে মনিপুরী নৃত্যচর্চার ব্যবস্থা করেন।
