অনেক বড় সেই গল্পটি। অল্প কথায় গল্প-তো শেষ হবে না। অনেক মানুষের অনেকদিনে অনেক কথা রয়ে গেছে সে গল্পটিতে। দিন, মাস, বছর—বলতে গেলে হাজার বছরের কথা নিয়ে সে গল্প। কিন্তু আমরা গল্প বলছি কাকে? একি শুধুই গল্প? না, মোটেই তা নয়। এ হচ্ছে আমাদের ইতিহাস। কি করে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ পেলাম তারই কাহিনী। এ হচ্ছে হাজার বছরের ইতিহাস। বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাস। এই ইতিহাসে পথ ধরেই বাঙালি খুঁজে নিয়েছে তার আত্মপরিচয়, তার ভাষা, তার সংস্কৃতি, তার জীবনচর্যা। সে খোঁজা এখনো শেষ হয়নি। এখনো চলছে। আরো বহুকাল চলবে। চিরকাল চলবে।
আমরা আজ আমাদের সে ইতিহাসের কিছু কথা বলবো। অনেক রাজা-মহারাজা-সম্রাট-সুলতান ও নবারের রাজত্বকাল শেষে ১৭৫৭ সালে বাংলায় শুরু হয়েছিল ইংরেজ রাজত্ব। এই ইংরেজরা এসেছিল সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সেই সুদূর ইউরোপ থেকে। তবে শুধু ইংরেজরা নয়, ইউরোপ থেকে এসেছিল পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার ও ফরাসিরাও। এরা সবাই প্রথমে এসেছিল বাণিজ্যের জন্যে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ দেশ অধিকার করে এখানে রাজত্ব করার আশা জেগেছিল তাদের মনে। অন্যেরা পারেনি, পেরেছিল ইংরেজরা। পলাশির যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদদৌলাকে হারিয়ে দিয়েছিল তারা। তবে সে যুদ্ধ ছিল ইংরেজদের ফন্দি-ফিকিরের যুদ্ধ। নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফরকে সিংহাসনের লোভ দেখিয়ে হাত করে সে যুদ্ধ জিতেছিল তারা। মীরজাফরের সে বেঈমানির কথা বাংলার মানুষ আজো ভোলেনি। তাইতো বেঈমানদের আজো মিরজাফর বলে ডাকে মানুষ।
ইংরেজদের ক্ষমতা দখল শুরু হয়েছিল বাংলায়। তারপর একইভাবে নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পুরো ভারতবর্ষই অধিকারে এসেছিল তাদের। উপনিবেশ কায়েম করেছিল তারা এখানে। শুরু হয়েছিল নির্যাতন, নিপীড়ন আর শোষণ। ১৮৫৭ সালে ইংরেজদের সেনাবাহিনির দেশিয় সিপাহিরা বিদ্রোহ করেছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। এদেশের ইতিহাসে সে বিদ্রোহ ‘সিপাহি বিপ্লব’ নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। সেদিন ‘সিপাহি বিপ্লব’ সফল হতে পারেনি সত্য, কিন্তু ইংরেজরা বুঝেছিল এদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কতো প্রবল। নানা আন্দোলন আর সশস্ত্র সংগ্রামের ধারা রইল অব্যাহত। অবশেষে স্বাধীন হলো ভারতবর্ষের মানুষ। গঠিত হলো দুটি নতুন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে দুটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত হলো পাকিস্তান। সে দুটি অঞ্চলের নাম রাখা হলো পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান।
পাকিস্তান গঠনের উদ্দেশ্য ছিল ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য পৃথক একটি রাষ্ট্র তৈরি করা। পূর্ব বাংলা হলো পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল সিন্ধু, পশ্চিম পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আর বেলুচিন্তান নিয়ে। দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ভাষার কোনো মিল ছিল না। খাবার-দাবার, পোশাক-আশাক ও জীবনযাত্রার ধরনেও ছিল অনেক পার্থক্য। মিল ছিল কেবল এক জায়গায়—দুই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই মুসলমান।
একেবারে শুরু থেকেই পাকিস্তানে শাসনের কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। পূর্ব বাংলার মানুষের কপালে জুটলো বঞ্চনা আর নির্যাতন। প্রথম সংঘাতটি সৃষ্টি হলো ভাষার প্রশ্নে। পূর্ব বাংলার গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানান। সে দাবি গৃহীত হলো না। মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নে পূর্ব বাংলায় শুরু হল ছাত্র-গণআন্দোলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে বাংলার ছাত্র ও যুবকেরা প্রাণ দিলেন ভাষার জন্যে। বাংলার মানুষের জেগে ওঠার শুরু সেখানেই। সেই প্রথম তারা বুঝতে পারল—পশ্চিম পাকিস্তানের নতুন এক উপনিবেশে পরিণত হয়েছে তারা। বঞ্চনা, শোষণ, নির্যাতন-নিপীড়ন ছাড়া অন্য কিছু নেই তাদের ভাগ্যে। আন্দোলন আর সংগ্রাম ছাড়া নিজেদের অধিকার আদায়ের অন্য কোনো পথ নেই তাদের কাছে। তারপর। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জিতল যুক্তফ্রন্ট। কিন্তু পর্দার আড়ালে শুরু হলো নতুন খেলা। ক্ষমতা এলো না বাঙালিদের হাতে। ১৯৫৮ সালে জারি করা হলো সামরিক আইন। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার আসনে বসে রইলেন সেনানায়ক আইয়ুব খান। এর মধ্যেই ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।
বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হতে লাগল তাকে। উদ্দেশ্য—শেখ মুজিবের কণ্ঠ স্তব্ধ করা। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের দাবি ভণ্ডুল করা।
এবার তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় ব্যাপক গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অবশেষে উনসত্তরের গণআন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতা ত্যাগ করেন। সামরিক শাসন জারি করে এবার ক্ষমতায় এলেন সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হলো সাধারণ নির্বাচন। জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু না, সরকার গঠনের সুযোগ পেলো না আওয়ামী লীগ।
তারপর এলো একাত্তরের মার্চ। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেও তা মূলতবি করে দিলেন ইয়াহিয়া। রচিত হলো বাংলার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করার নীলনকশা। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভাষণ দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
এদিকে আলোচনার আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা হলো সৈন্য, অস্ত্র, আর গোলাবারুদ। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো বাঙালি নিধনযজ্ঞের। অবশেষে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা শুরু করল হত্যাযজ্ঞ, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা প্রতিরোধ শুরু হলো, শুরু হলো বাংলার মানুষের মুক্তির লড়াই। ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতা আর বাঙালি সৈনিক ও ইপিআর জওয়ানরা অস্ত্র হাতে এগিয়ে এসে মুক্তির সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধে। নয় মাসের যুদ্ধের পর পরাজিত হলো পাকিস্তানিরা। স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। এ সময় শহীদ হয়েছিলেন তিরিশ লক্ষ বাঙালি। এক কোটিরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। পাকিস্তানিরা চেয়েছিল বাঙালিদের শেষ করে দিতে। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি।
এ হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার গল্প। অল্প কিছু কথায় তা বললাম বটে, কিন্তু এ কাহিনি মোটেই তা নয়। এর পেছনে আছে কত মানুষের দুঃখ, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর আত্মাহুতি তার সব কথা তো আমাদের কারো জানা নেই। লাখো মানুষের আত্মদানে পাওয়া এ স্বাধীনতা আমাদের জন্য এক পবিত্র অর্জন—এ যেন আমরা কখনো ভুলে না যাই।
