আমার ছড়া লেখার শুরু গ্রামের স্কুলে পড়বার সময় থেকেই। স্কুলে পড়বার সময় বাংলা বইয়ে কবিতা-ছড়া যেগুলো থাকতো সেগুলো খুব মন দিয়ে পড়তাম। ছড়া-কবিতার বিষয় নির্বাচন এবং ছন্দ ছেলেবেলাতেই আমি আত্মস্থ করেছিলাম। ছন্দোবদ্ধ পংক্তি বা বলা যায় অন্তমিল দেয়া বাক্য লিখতে লিখতেই প্রবেশ করি ছড়ার জগতে। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকুমার রায়, সুনির্মল বসু প্রমুখের ছড়া-কবিতা পাঠ্য ছিলো। ছন্দ শেখা সেখানেই। ছড়া লেখার চেষ্টাও তখন থেকে শুরু।
১৯৬৪ সালে দিনাজপুর জিলা স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন কবি কাজী কাদের নওয়াজ, তাঁর ‘ওস্তাদের কদর’ কবিতাটি তখন চতুর্থ শ্রেণীর পাঠ্য ছিলো। একজন কবিকে আমি প্রথম দেখি তখন, আমার শিক্ষকরূপে। এই কবিকে দেখে তখন আমি ভেবেছি একজন মানুষই কবিতা লিখেন এবং যে কোনো মানুষ চেষ্টা করলেই ছড়া-কবিতা লিখতে পারেন। ১৯৬৫ সালের শেষে আমরা দিনাজপুর থেকে গ্রামে চলে আসি। এসময়ে আমার একটা সুযোগ ঘটে লেখালেখি নিয়ে। আমার এক মামা আবদুল মান্নান তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স পড়তেন। তিনি একদিন এসে ঘোষণা দিলেন প্রতি রোববার বিকেলে গ্রামে সাহিত্যসভা হবে। শুরু হয়ে গেলো নিয়মিত সাহিত্যসভা। আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। আমার লিখে লিখে জমিয়ে রাখা লেখাগুলো পাঠ করার সুযোগ হলো এইসব সাহিত্যসভায়। আমার মনে আছে, আমার ছড়া-কবিতা শুনে গ্রামের মুরুব্বিরা প্রচুর প্রশংসা করতেন।
১৯৬৮ সালে ঢাকায় এসে স্কুলে ভর্তি হই। বাসায় দু’টো পত্রিকা রাখা হতো— দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক আজাদ। আমার জন্য অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছিলো ‘কচি কাঁচার আসর’ এবং ‘মুকুলের মাহফিল’। এসব পত্রিকায় আমি লেখা পাঠানো শুরু করি। ১৯৬৯-এর আন্দোলনের দিনগুলোতে লিখতে শুরু করি আরো নতুন নতুন ছড়া। ৩০ জুলাই, ১৯৬৯ আমার প্রথম কবিতা ‘আমি কবি’ ছাপা হয় দৈনিক আজাদের ‘মুকুলের মাহফিলে’। পরের বছর ছড়া ছাপা হয় দৈনিক ইত্তেফাকের ‘কচি কাঁচার আসরে’। প্রথম লেখা ছাপা হবার এবং পত্রিকায় নিজের নাম দেখার কী যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ছোটবেলায় আমি অনেক কিছু হতে চেয়েছিলাম। প্রথমত, ডাক্তার, পরে সাংবাদিক। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদ্যা বিভাগে পড়তে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার চিন্তা মাথায় ঢোকে। কিন্তু হলাম চাকুরিজীবী। নিজের প্রিয় লেখা বাছাই করা খুবই কষ্টকর। একটা সত্য কথা বলি, যখন কোনো ছড়া বা কবিতা লিখি তখন সেটাকে খুব ভালো এবং মানোত্তীর্ণ মনে হয়। কিন্তু যখনই সেটা ছাপা হয়ে যায় তখন আর সেটা ভালো লাগে না। মনে হয়, আরো ভালো করে ওটা লেখা উচিত ছিলো। ফলে প্রিয় লেখা এখনও লিখেছি বলে মনে হয় না। তবে যদি বলতেই হয়, তবে মনে হয় বাহান্ন, একাত্তর এবং সম-সাময়িক বিষয় নিয়ে যেসব ছড়া লিখেছি, সেগুলো হয়তো কিছুটা প্রিয়।
জীবনে স্মরণীয় অনেক ঘটনাই আছে। কিন্তু লেখালেখি নিয়ে এই একটি স্মৃতি উল্লেখ না করলেই নয়। আব্বা সবসময় চাইতেন আমি লেখালেখি করি। ১৯৭৩ সালের দিকের কথা। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের ছাত্র। রাতে বাইরে থেকে বাসায় ফিরে আমার টেবিলে দেখি একটি রাইটিং প্যাড। হাতে নিয়ে পাতা উল্টোতেই চোখে পড়ে আব্বার স্বহস্তে লেখা ক’টি লাইনঃ
‘কবিত্ব আমার গুমরে মরেছে/ অকাল সাঁঝে/ আমি চাই সে কবিত্বের বিকাশ ঘটুক/ আমার ছেলের মাঝে।’
লেখার নিচে তাঁর পূর্ণনামের স্বাক্ষর এবং তারিখ। সেদিন আমি আব্বার আশীর্বাদ পেয়ে কী যে খুশি হয়েছিলাম এবং এমন অনুপ্রেরণা আমাকে কী যে উদ্বেলিত করেছিলো তা এতদিন পরেও আমি হূদয় দিয়ে অনুভব করতে পারি। আজ কেন জানি মনে হয়, আমি লেখালেখি করায় আব্বা আমার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে আমার। প্রাথমিক শ্রেণীতে পড়ার সময় ‘গালিভারের সফরনামা’, ‘রিপভ্যান উইঙ্কেল’, এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ পড়ে ফেলেছিলাম। এইসব ক্লাসিক বই পড়ার ভেতর দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের একটা ধারণাও আমি অর্জন করি।
আমার উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো: নীল পাহাড়ের ছড়া (১৯৭৮), মৌলি তোমার ছড়া (১৯৮৬), ছেলেবেলার দিন (কিশোর কবিতা, ১৯৮৮), স্বাধীনতার ছড়া (১৯৯০), রাজপথের ছড়া (১৯৯১), আমার বন্ধু এবিসি (কিশোর গল্পগ্রন্থ, ২০০৬) ইত্যাদি। ‘বাংলাদেশের ছড়া’ (১৯৮৭) নামে আমার একটি যৌথ সম্পাদিত গ্রন্থ আছে, যেখানে আমি ১৯৪৭ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত বাংলাদেশের ছড়ার ৪০ বছরের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। অনেক সাহিত্য পুরস্কার পেলেও শিশু-সাহিত্যের জন্য আমি কোনো পুরস্কার পাইনি। এজন্য আমার কোনো দুঃখ নেই। শিশু-কিশোরদের ভালোবাসাই আমার বড়ো পুরস্কার।
