ক্যাম্পাসে উত্সবের রঙ

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৯
বাঙালি উত্সবপ্রিয় জাতি। উত্সবে উত্সবে পার হয় বছরের পুরোটা সময়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও লাগে সে উত্সবের ছোঁয়া। শিক্ষার্থীদের বিনোদনের মাধ্যম এই উত্সব। তাদের মানস গঠনেও অবদান রয়েছে এসব উত্সবের। ক্যাম্পাসের নানা উত্সব নিয়েই এবারের আয়োজন। বছর ঘুরে প্রকৃতির নানা পরিবর্তন পেরিয়ে আসে বসন্ত। মানুষের মন আর প্রকৃতিতে লাগে পরিবর্তনের ছোঁয়া। মানুষের মনে আনন্দ-জোয়ার। শীতের জরাগ্রস্ততা কাটিয়ে গাছে গাছে সবুজ নতুন কচি কচি পাতা। ঋদ্ধ হয়ে উঠেছে রিক্ত বৃক্ষরাজি। ফুলে ফুলে সজ্জিত প্রকৃতি জানান দিয়ে যায় বসন্তের আগমনী বার্তা। শীতের খোলসে ঢেকে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম প্রকৃতির আদরমাখা স্পর্শে জেগে উঠে। আর ক্যাম্পাস থাকে বসন্তকে বরণের অপেক্ষায়। বসন্ত উত্সবের মধ্য সেটা পূর্ণতা পায়। পলাশ, শিমুলের হাসিতে ক্যাম্পাসে লাগে আগুন রঙের খেলা। কোকিলের কুহুতানে মাতাল করতে আসে বসন্ত প্রাণের ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাল, নীল, বেগুনী, হলুদ গোলাপী, সাদা, খয়েরী হরেক রঙের ফুলের সমাহার ও মিষ্টি সুবাস। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যেন হয়ে উঠে আনন্দ সৌন্দর্যের এক স্বপ্নপুরী। পহেলা বৈশাখ। ক্যাম্পাস সেজেছে বর্ণিল সাজে। রং-বেরঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরা তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাসে মুখরিত থাকে ক্যাম্পাস। প্রশান্তির সাদা আর উত্সবের লাল— দু’য়ে মিলে লাল সাদা বৈশাখী রং। মেয়েদের পরনে নানা রঙের শাড়ি, হাতে মেহেদী আর খোঁপায় তাজা ফুলের মালা। আর ছেলেদের পরনে বৈশাখী নকশার পাঞ্জাবি কিংবা ফতুয়া। সবমিলিয়ে তারুণ্যের উচ্ছলতা আর প্রাণের আবেগে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ উত্সবে জেগে উঠে পুরো ক্যাম্পাস। উত্সবের দিন ক্যাম্পাসের পথগুলো ছেয়ে যায় নানা রঙের আল্পনায়। সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শোভাযাত্রার শোভা বাড়াতে থাকে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়া-হাতির প্রতিকৃতি আর হরেক রকমের মুখোশ। গান, চিত্কার, হর্ষধ্বনি আর বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শোভাযাত্রা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। শোভাযাত্রা শেষে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশের। দলে দলে ভাগ হয়ে গল্পে আর আড্ডায় চলতে থাকে পান্তা-ইলিশ খাওয়া। রঙের মেলা চারদিকে। হলুদ, কমলা, লাল, নীল আর সবুজের ছড়াছড়ি। শিক্ষার্থীদের পোশাকে রং, রং কপালে, মনে-প্রাণে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচে। সবমিলিয়ে চারপাশে রঙের ফোয়ারা আর রঙিন মানুষজন। ক্যাম্পাসে বিদায় উত্সব (র্যাগ ডে) ঘিরে এভাবেই রঙে রঙে বর্ণিল হয়ে উঠে। শিক্ষার্থীদের বিদায় উত্সবে পাল্টে যায় ক্যাম্পাসের চেহারা। আড্ডা, গান আর আনন্দ-উল্লাসে কেটে যায় একটি দিন। বিদায় উত্সবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে। এরপর বিদায়ী শিক্ষার্থীরা শুরু করেন রঙের উত্সব। বিদায়ের রং হাতে-গালে, পোশাকে মেখে একাকার হয়ে যান বিদায়ী শিক্ষার্থীরা। ‘দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর কোনদিকে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। আজ বিদায়বেলায় মনে পড়ছে অনেক স্মৃৃতি’ খানিকটা উদাস কণ্ঠে কথাগুলো বললেন বিদায়ী ছাত্র সমির রায়। তবু নতুন জীবনের হাতছানির সামনে সেই উদাসী সুর সবার মনে দীর্ঘস্থায়ী হলো না। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বিদায় নিলেন সবাই। ক্যাম্পাসে চৈত্র সংক্রান্তি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে চৈত্র সংক্রান্তি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে নানান ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আছেন যারা নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়ে সচেতন ভাবতে ভালোবাসেন। আরেকটি অংশ আছেন যারা দেশীয় সংস্কৃতিকে ভালোবাসলেও হিন্দি আর ইংরেজির প্রভাব তাদের মধ্যে পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। কমবেশি তারাও চেষ্টা করে থাকেন আনুষ্ঠানিকতা পালনের। অন্তত বিশেষ দিনগুলোতে তত্পর থাকেন তারা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী রহমান মাসুদ দেশীয় আমেজে নিজেকে সতেজ রাখতে চান সবসময়। ‘হিন্দি ও পশ্চিমা সংস্কৃতির দাপটে ঘরে-বাইরে টেকাই মুশকিল, একটা নির্ভেজাল সংস্কৃতির প্রত্যাশা তো থাকেই। এক্ষেত্রে চৈত্র সংক্রান্তির চেতনা কাজে লাগালে মন্দ হয় না।’ বলছিলেন মাসুদ। আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী হোসেন পিয়াল জানেন না চৈত্র সংক্রান্তি কি। তবে শতভাগ বাঙালি হওয়ার ইচ্ছা তারও রয়েছে। না জানার দায়ভার তিনি নিতেও নারাজ। সোজাসাপটা করেই তিনি বলে ওঠেন, আমরা যে সমাজ কাঠামোর মাঝে বেড়ে উঠেছি সেখানে নিজস্ব সংস্কৃতি পাঠ আমরা কমই পেয়েছি। এ দেশের সংস্কারায়িত বর্ষপঞ্জির বিশেষত্ব হচ্ছে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ দিবসের সাথে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের প্রাসঙ্গিকতা বজায় থাকে না। ফলে পঞ্জিকার হিসাবের তারতম্য হতে পারে।