মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সমপ্রদায় ‘রাখাইন’ ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ‘রোহিঙ্গা’ নামে পরিচিত। প্রায় চার শ বছর ধরে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের এই রাখাইন রাজ্যে বসবাস করছে। পুরোনো দলিলপত্র থেকে জানা যায়, ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে রোসাঙ্গ নামের একটি স্বাধীন রাজ্যও ছিল। সে রাজ্য শাসনের অধিকার ছিল একমাত্র রোহিঙ্গাদেরই। মিয়ানমারের রাজা বোদাওয়াফা এ অঞ্চল দখল করার পরই সেখানে বৌদ্ধ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে বার্মা বহুদলীয় গণতন্ত্রে যাত্রা করে। এমনকি সেসময় পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্বও ছিল।
জেনারেল নে উইনের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ১৯৬২ সালে এই সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির চিত্র পুরোটাই পালটে যায়। মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় ভোটাধিকার। জন্ম নিবন্ধন বাতিল হয়। এমনকি নিঃসংকোচে জাতিগত পরিচয় প্রকাশের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়।
এভাবে বিরাট একটা সমপ্রদায়ের মানবাধিকার ছিনিয়ে ১৯৭৭ সালে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার দেশে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করলে রোহিঙ্গারা নিজ দেশেই হয়ে যায় রিফিউজি! আর এ ঘোষণার পর থেকে রাখাইন বৌদ্ধ এবং মিয়ানমার সরকার-সেনাবাহিনী একত্রে রোহিঙ্গাদের ওপর অন্যায়ভাবে নির্যাতন নিপীড়ন শুরু করে।
মিডিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠস্বর
গত জুলাইয়ে একজন রাখাইন নারী কয়েকজন মুসলিম যুবকের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে নিহত হয়েছেন বলে মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই সংবাদ ছাপার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দিনের আলো থাকতে থাকতেই রাখাইন বৌদ্ধরা রোহিঙ্গাদের একটি বাসে আগুন দিয়ে ১০জন রোহিঙ্গা মুসলিমকে পুড়িয়ে মেরে ফেলে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো, হত্যা করা রাখাইন নারীটি একজন রোহিঙ্গাকে বিয়ে করেছিল বা কোনো রোহিঙ্গাকে পছন্দ করতো। আর এই কারণে রাখাইন বৌদ্ধরা সেই নারীটিকে হত্যা করে লাশ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ফেলে রেখে গিয়েছিল বলে সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী নিশ্চিত করে। যা হোক, রাখাইন বৌদ্ধদের দ্বারা সামপ্রতিক এই দাঙ্গার সূত্রপাতটা এভাবেই।
মিয়ানমারের সরকারি মিডিয়া ১০ জন রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যার এই ঘটনাকে ‘কালা’ (kala) হিসেবে অভিহিত করে। এটা রাখাইন সমাজের একটা তাচ্ছিল্যসূচক শব্দ। রোহিঙ্গা হত্যার এই খবর ইরানি কিছু ওয়েব সাইটে দেখা যায়, যেগুলোর কিছু লেখা এশিয়ার পত্রিকায় ছাপা হয়। এবং প্রেস টিভিতেও এই ঘটনার কাভারেজ দেখা যায়। কিন্তু রয়টার, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট কিংবা ফক্স নিউজে মুসলমানদের হত্যার এই খবর পাওয়া যায় না! মিয়ানমারের মিডিয়ার সেন্সরশিপের এই স্পষ্টত প্রতীয়মান অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমা মিডিয়াও রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর এই নৃশংস অত্যাচারের চিত্র থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখে। এতে আরেকবার তাদের শক্তিশালী মুসলিমবিরোধী নীতি ও মানবাধিকার সম্পর্কে তাদের বিকল্প আচরণটাও দেখা যায়। একইসঙ্গে এই ঘটনার ঠাঁই হয় না ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার কোনো মিডিয়াতেও।
রাখাইন-রোহিঙ্গার দাঙ্গার মিডিয়া কাভারেজ মানেই শুধু রাখাইনদের গ্রাম, ঘর পোড়ানোর ইমেজ। ক্যাপশনে, সংবাদের স্টোরিতে অনায়াসে এগুলোর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয় রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর। মিডিয়ার সনাতন চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শোনা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠস্বর! মিডিয়ায় সংখ্যালঘুর এই বৈষম্যমূলক চিত্রই সমাজে রোহিঙ্গা মুসলিমকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার প্রক্রিয়াকে আরও প্রকট করে তোলে। ধর্মীয় সমপ্রদায়ের মধ্যে সহজেই বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটা বলিষ্ঠ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে।
পশ্চিমের লেজে সুচির গণতন্ত্র-দর্শন,
নোবেল পদকের কূটনৈতিকতা!
অদূর ভবিষ্যতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল হবে স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্র— অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই এমনটা মনে করেন। এটা যদি সত্যি হয়, তবে এই স্নায়ুযুদ্ধের নেতৃত্বে পরস্পরবিরোধী ভূমিকায় থাকবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। এই সমীকরণে মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীনের একটি সীমান্তবর্তী দেশ হলো এই মিয়ানমার। এবং মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের দীর্ঘকাল ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই চীনকে ভবিষ্যতে প্রতিহত করতে হলে মিয়ানমারকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রয়োজন। ২১ বছর আগেই তাই দূরদর্শী যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রচেষ্টায় গৃহবন্দী অং সান সুচিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে এই দেশকে তার মিত্র হিসেবে তৈরি করার ভিত রচনা করে রেখেছে।
১৯৮৮ সালে মিয়ানমারের জনগণের আহবানে সাড়া দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা জেনারেল আউং সানের কন্যা অং সান সুচি। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন। কিন্তু জান্তা সরকার ১৯৮৮ সালের ৮ আগস্ট এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে এ আন্দোলন দমন করেন। কিন্তু এরপরও জনগণের ক্রমাগত চাপে ১৯৯০ সালে জান্তা সরকার বহুদলীয় নির্বাচন দেয়। নির্বাচনে সুচি জয়ী হন। কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার বদলে তাকে হতে হয় গৃহবন্দী।
সামরিক শাসনের অধীনস্ত এই দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও। ২০১০ সালে বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে সেখানে ক্ষমতায় আসে বেসামরিক সরকার। এই সরকারের প্রতি সামরিক বাহিনীর সমর্থন ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই গণতন্ত্রপন্থি নেতা সুচিকে গৃহবন্দী থেকে মুক্তি দিলে এবং পরবর্তী সময়ে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে বিশ্ব নেতাদের কাছে সহজেই মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন থেইন সেইন ও তার সরকার। আর এর পুরস্কার হিসেবে আবারও যুক্তরাষ্ট্র হাজির হয়েছে তার রাজনীতির কূটনৈতিক কৌশলের হাতিয়ার সেই নোবেল শান্তি পদক নিয়ে! বর্তমানে থেইন সেইন নোবেল শান্তি পুরস্কারের অন্যতম দাবিদার!
এমন একটি সাজানো পরিপাটি মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র চায় সুচিই হোক দেশটির ভবিষ্যত্ কর্ণধার। তাঁকেই মার্কিনরা পাশ্চাত্যবান্ধব এবং মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় সুবিধাজনক মনে করছে। আর সুচিও এখন চান ক্ষমতা! আসছে ২০১৫ সালে মিয়ানমারে নির্বাচন। সেই নির্বাচনের প্রার্থী গণতন্ত্রের জন্য ব্যক্তিগত জীবন ত্যাগ করা অং সান সুচি। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সমর্থন তিনি হারাতে চান না। আর একারণেই সংখ্যায় কম রোহিঙ্গাদের এসব ঘটনাকে তিনি বিচ্ছিন্ন ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ফল হিসেবে দেখতেই পছন্দ করছেন।
গণতন্ত্র, ক্ষমতা ও দখলদারিত্ব
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলিম সমপ্রদায়কে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এবং ৮ লাখ রোহিঙ্গাকে প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে প্রবেশ করা অধিবাসী বলে অভিহিত করেছে। বাংলাদেশও রোহিঙ্গাদের বাসস্থান দিতে আন্তরিক নয়। ফলে রোহিঙ্গা মুসলিম সমপ্রদায় বিশ্বের একমাত্র সমপ্রদায় হিসেবে ভাসমান জীবনযাপন করছে। যাদের নিজেদের থাকার স্থায়ী কোনো আবাস নেই!
দীর্ঘসময় পর্যন্ত নীরব থাকার পর সুচির কণ্ঠেও এমন সুর পাওয়া যায়। অকপটে তিনিও বলেন, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ হতে হবে। তা না হলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব না। রোহিঙ্গা মুসলিমরা সীমান্তের দুই পাশে অবস্থান করছে জানিয়ে তিনি বলেন, জাতিগত দাঙ্গার পর সমঝোতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তার পক্ষে রোহিঙ্গাদের সমর্থন করা সম্ভব নয়। বাস্তবিক অর্থেই সামপ্রদায়িক নিরপেক্ষতা দেখানো গণতন্ত্রের জন্য আত্মত্যাগী সুচির পক্ষে অসম্ভব। কারণ মানবাধিকারের জন্য কাজ করা এই নেতা ধর্মের সীমানা থেকে কখনো বের হয়ে আসতে পারেননি:
যদি ধারণা এবং বিশ্বাস ভৌগোলিক সীমা আর সাংস্কৃতিক পরিসরের দ্বারাই সীমিত হয়ে আসে, তাহলে বৌদ্ধ মতবাদ শুধুমাত্র উত্তর ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো, একইভাবে খ্রিস্টীয় মতবাদের অবস্থান হতো শুধুই মধ্যপ্রাচ্যে এবং ইসলাম থাকতো আরবের গণ্ডিতে (ফ্রিডম ফ্রম পাওয়ার, ১৯৯০)।
যা হোক, মানবাধিকার লঙ্ঘন হওয়া এমন একটি ইস্যু নিয়ে আমি কোনো দেশকেই কোনো রাজনৈতিক পরামর্শ, কূটনৈতিক সমাধান দেওয়ার জন্য লিখতে বসিনি। আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি, গণতন্ত্র অনেক সময় অনেক জায়গায় ক্ষমতা দখলের একটা প্রক্রিয়া মাত্র। জনগণকে পকেটে ভরে তার দোহাই দিয়ে ক্ষমতা দখলকে বৈধ করার একটা মসৃণ মেকানিজম! এমনকি যে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তিবিশেষ নোবেল পদকও অর্জন করেছেন, সেই দেশের মুক্তিকামী জনগণও এই তালিকা থেকে বাদ যায়নি! সুচির একটা বিখ্যাত মন্তব্যই এর যথার্থতা বোঝাতে সক্ষম:
এটা কোনো ক্ষমতা নয় যেটা কোনো ধরনের দুর্নীতি সংঘটিত করে; এটা আসলে একটা ভয়। এই ভয়টা আসলে ক্ষমতা হারানোর ভয়। এটা আসলে যারা ক্ষমতার ব্যবহারকারী তাদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয় (ফ্রিডম ফ্রম পাওয়ার, ১৯৯০)।
ঢাকা
