ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণের মধ্যে শেষ হলো দু’দিনের হরতাল

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৩, ২২:২৫
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা টানা ৩৬ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার রাজধানীতে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। বিএনপির পাশাপাশি শিবিরকর্মীরা পৃথকভাবে গতকাল রাজধানীর ১০ এলাকায় ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। হরতাল সমর্থনে ঝটিকা মিছিল বের হলেও রাজধানীতে রিকশা ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলেছে অন্যান্য হরতালের দিনের তুলনায় বেশি। ঢিলেঢালা হরতালে রাজধানীতে চলেছে গণপরিবহন। অপর দিকে হরতাল আতঙ্কে দোকান-পাট, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, মার্কেট-বিপণী বিতান সকালের দিকে প্রায় বন্ধ ছিল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে খুলতে শুরু করে কিছু কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দিনের প্রথমভাগে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছাড়েনি। তবে কমলাপুর স্টেশন থেকে যথারীতি ট্রেন ছেড়ে গেছে। এরই মধ্য দিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় শেষ হলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল আহূত বিরামহীন ৩৬ ঘণ্টার হরতাল। গতকালের হরতালে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের সমাগম ঘটেনি। সেখানে হরতালের কোন উত্তাপ ছিল না। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও যুগ্মমহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদসহ ৩-৪ জন নেতা সকাল থেকে প্রবেশ গেটে তালা দিয়ে ভেতরে অবস্থান করেন। সকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হরতাল পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “সরকারের আচরণের ওপর আন্দোলনের তীব্রতা নির্ভর করবে।” নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে সারাদিনে কোন মিছিলের চেষ্টা করা হয়নি। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর এবং গ্রেফতারের ঘটনা না ঘটায় অলস সময় পার করেছে পুলিশ, সাংবাদিকরা। এদিকে নাশকতা এড়াতে ভোর থেকেই রাজধানীর মোড়ে মোড়ে বিপুলসংখ্যক র্যাব, পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বেলা ১১টার দিকে সবুজবাগের মাদারটেক মোড় এলাকায় হরতালের সমর্থনে পেট্রোল ঢেলে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের চেষ্টার সময় মনু মিয়াকে আটক করে পুলিশ। সবুজবাগ থানার ওসি বাবুল মিয়া জানান, বোতলভর্তি পেট্রোলসহ হাতেনাতে আটক করা হয় মনু মিয়াকে। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাকিম তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন। এর আগে সকালে আরামবাগে নটরডেম কলেজের সামনে হরতালের সমর্থনে মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর পর গ্রেফতার হন মোবারক। পুলিশের মতিঝিল জোনের পেট্রোল ইন্সপেক্টর শেখ আবুল বাশার জানান, হরতালকারীদের বাধা দিলে মিছিল থেকে পুলিশের ওপর চারটি হাতেবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে ফাঁকা গুলি ছুড়ে ও ধাওয়া দিয়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে মোবারককে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মুখোমুখী করলে হাকিম তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে খিলগাঁও টেম্পুস্ট্যান্ড থেকে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করে শিবির। এ সময় স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা একটি টেম্পু ভাঙচুর করে আগুন দেয়ার চেষ্টা করে শিবির কর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ এসে শিবির কর্মীদের ধাওয়া দিলে দ্রুত পালিয়ে যায় তারা। সকাল সোয়া ৭টার দিকে ২৫ থেকে ৩০ জন শিবিরকর্মী মিরপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম-উত্তর দিকে ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় তারা সেখানে তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই শিবির কর্মীরা পালিয়ে যায়। একই সময় মিরপুর পাইকপাড়া এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেছে জামায়াত-শিবির। অন্যদিকে রূপনগর এলাকায় সকাল ৮টার দিকে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং করার চেষ্টা করে স্বেচ্ছাসেবক দল। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে দ্রুত বিভিন্ন গলিতে পালিয়ে যায় তারা। এছাড়া সকাল সাড়ে ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার শনিরআখড়া এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেছে ছাত্রশিবির। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে নেতারা বলেন, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াত নেতাদের মুক্তি না দিলে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক অচল করে দেয়া হবে। সমাবেশ শেষে তারা সেখানে ২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। শ্যামপুরে সকালে শ্যামপুর থানা বিএনপি হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে। এ সময় মিছিলে ২টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। পরে পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা রাবার বুলেট ছোঁড়ে। বেলা ১২টায় শ্যামপুরের কদমতলীতে একটি ট্রাক ভাঙচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় পিকেটাররা। তবে স্থানীয়রা সঙ্গে সঙ্গে আগুন নেভাতে সক্ষম হওয়ায় ট্রাকটির তেমন কোনো ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি। তবে এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ সাদ্দাম মার্কেটের সামনে সকালে হরতাল সমর্থকরা একটি চলন্ত ট্রাকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুরের চেষ্টা চালায়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একই এলাকায় পরপর তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। তবে পুলিশ আসার আগেই পিকেটাররা পালিয়ে যায়। এদিকে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গাবতলী এলাকায় হরতাল সমর্থকদের মিছিল থেকে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পুলিশ পৌঁছালে মিছিলকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর এলাকায় দুটি, সোয়া ১২টার দিকে টিএসসি এলাকায় দুটি এবং অমর একুশে হলের দিকে একটি হাতবোমা বিস্ফোরিত হয়। ওই হলের সামনে থেকে অবিস্ফোরিত অবস্থায় আরেকটি হাতবোমা উদ্ধার করে পুলিশ। জামায়াত-শিবির সন্দেহে গণজাগরণ মঞ্চের কাছ থেকে একজনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওয়ারিতে হরতালের সমর্থনে মিছিল থেকে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপের অভিযোগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবিএম মহসীনসহ পাঁচ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ওয়ারি থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বলেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ওয়ারির বনগ্রাম এলাকায় একটি মিছিল থেকে ঢিল ছোড়া হলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ জনকে আটক করা হয়। বেলা পৌনে ১১টার দিকে রমনা থানার রেইনবো ক্রসিং এলাকায় হরতাল সমর্থকদের মিছিল থেকে গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টাকালে রিপন ও সোহেল খান নামে আরো দুজনকে আটক করে পুলিশ। এছাড়া সকালে বাবুবাজার সেতুর কাছে পুলিশের অবস্থানের কাছে দুটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কোতয়ালী থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক জানান, সেতুর ওপর থেকে বোমা দুটি ছোড়া হয় বলে ধারণা করছেন তারা। রাজধানীর বারিধারা বসুন্ধরা গেটে তিনটি বাস ও দুটি সিএনজি ভাঙচুর করেছে ছাত্রদল। ৮টার দিকে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদল একটি মিছিল বের করে। এসময় তারা ভাঙচুর চালায়। এছাড়া আগুন ধরিয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ এসে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তবে কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।