রাজধানীর পল্টন থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করায় দুইটি মামলায় বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক ও যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমানসহ ১৫৪ নেতা-কর্মীর জামিন নাকচ করেছে ঢাকার মহানগর হাকিমের আদালত। তবে এই তিন নেতার রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি। জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধানসহ বাকি ১৫১ নেতা-কর্মীকে ২ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। একইসঙ্গে রিজভী, ফারুক ও আমানকে জেলহাজতে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার দুইটি মামলায় আসামিদের জামিন আবেদন ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনের পৃথক পৃথক শুনানি শেষে দুইটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এসব আদেশ দেন।
প্রসঙ্গত গত ১১ মার্চ বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর পুলিশ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হানা দিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ১৫৭ জনকে আটক করে নিয়ে যায়। আটকের ১৯ ঘণ্টা পর ১২ মার্চ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের সহ-সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা ও আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। বাকি ১৫৪ জনের বিরুদ্ধে ওই দিন পুলিশ বাদী হয়ে পল্টন থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য ও দ্রুত বিচার আইনে দুইটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলা দুইটির মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় পল্টন থানার এসআই আবু জাফর আসামিদের ১০ দিন এবং এসআই মাহবুবুল হাসান দ্রুত বিচার আইনের মামলায় ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। ওইদিন আদালত রিমান্ড ও জামিন না মঞ্জুর করে মামলার প্রয়োজনীয় নথিসহ রিমান্ড ও জামিন আবেদনের শুনানির জন্য ২০ মার্চ দিন ধার্য করে। গতকাল এসব আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল দুপুরে প্রথমে বিস্ফোরক আইনের মামলায় অতিরিক্ত সিএমএম মোহাম্মদ আলী হোসেইনের আদালতে আসামিদের রিমান্ড চেয়ে শুনানি করেন অতিরিক্ত মহানগর পিপি শাহ আলম তালুকদার। শুনানিতে তিনি বলেন, গত ১১ মার্চ বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে উল্লেখিত আসামিরাসহ আরো ৫০-৬০ জন হঠাত্ করেই ইট-পাটকেল, লোহার রড, শাবল, লাঠি, হকিস্টিক ইত্যাদি হাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তার ওপর, টপ কালেকশনের গলি ও নয়াপল্টন মসজিদ গলির সামনের রাস্তায় যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন, যানবাহন ভাঙচুর করেন, পরপর ১৮/২০টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান এবং রাস্তার ওপর ৭টি স্থানে টায়ার, চট, কাগজ দিয়ে আগুন ধরিয়ে ত্রাসের সৃষ্টি করেন। পুলিশ এতে বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপ, অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ বিএনপি কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালিয়ে মোট ১০টি তাজা হাতবোমা উদ্ধার করে। এ অবস্থায় বোমার উত্স এবং বিস্ফোরণের রহস্য জানতে ও পলাতক অপরাপর আসামিকে গ্রেফতার করতে আটককৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
রিমান্ডের বিরোধিতা করে ও আসামিদের জামিন চেয়ে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, অ্যাডভোকেট খোরশেদ মিয়া আলম প্রমুখ আইনজীবী। এ সময় আসামি পক্ষে শতাধিক আইনজীবী আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। শুনানিতে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, এ মামলা মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছে। প্রথমে মহাসচিবসহ ৩ জনকে হুকুমদাতা হিসেবে গ্রেফতার করা হলেও মামলার এজাহারে এ সম্পর্কে কোনো বক্তব্যই লেখা হয়নি। তিনি বলেন, পুলিশের প্রত্যেকটি কার্যক্রম মিডিয়ায় দেখানো হলেও যখন বিএনপি অফিসে তারা ঢুকে তখন কোনো মিডিয়া প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি এবং বোমা উদ্ধারের কোনো ফুটেজ নিতে দেয়া হয়নি। পরে তারা বোমা উদ্ধারের নাটক সাজিয়েছে। পুলিশই এসব বোমা এনে বিএনপি অফিস থেকে উদ্ধার দেখিয়েছে। তিনি দলের নেতা-কর্মীদের জামিন মঞ্জুরের আবেদন জানান।
এ মামলার শুনানিকালে আসামিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে কোন আইনে আদালতে হাজির করা হয়েছে তার ব্যাখ্যা চান আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়, যাদের বিরুদ্ধে একের অধিক মামলা আছে, তাদের ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর ব্যাপারে আইনগত বাধা নেই।
শুনানি শেষে আদালত রুহুল কবির রিজভী, জয়নাল আবদিন ফারুক ও আমান উল্লাহ আমানের রিমান্ড ও জামিনের আবেদন নাকচ করে তাদের প্রয়োজনে কারা ফটকে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। বাকি ১৫১ নেতা-কর্মীর প্রত্যেকের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
বিস্ফোরক মামলার শুনানি ও আদেশ শেষে দ্রুত বিচার আইনের মামলায় আসামিদের জামিন ও রিমান্ড আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয় মহানগর হাকিম কেশব রায় চৌধুরীর আদালতে। শুনানি শেষে ১৫১ নেতাকর্মীর প্রত্যেকের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। এছাড়া রুহুল কবির রিজভী, জয়নাল আবদিন ফারুক ও আমান উল্লাহ আমানের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান। একইসঙ্গে তাদেরকে প্রয়োজনে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন। রিমান্ডে নেয়া আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব মো. শাহজাহান, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. জেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, সোহেল রানা, মঞ্জুর হোসেন, এহসানুল হক, আজিজুল ইসলাম মুনির, আলাউদ্দিন মানিক, ইকবাল মোর্শেদ খান, কামাল আহমেদ প্রমুখ। পরে নিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
