রাষ্ট্রপতি আর নেই

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৪
দৈনিক ইত্তেফাক গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছে যে, বর্ষীয়ান রাজনীতিক, ভাষা সৈনিক, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান আর নেই। জাতিকে গভীর শোকে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন। তিনি এখন অনন্তলোকের বাসিন্দা। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় নয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টা ৪৭ মিনিটে নির্লোভ, নিরহংকারী এ কীর্তিমান পুরুষ ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তার মৃত্যুর সংবাদে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংবাদ শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে তিন দিন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। আজ দুপুর ১২টায় একটি বিশেষ বিমানে সিঙ্গাপুর থেকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী হয়ে যে ক’জন কীর্তিমান পুরুষ স্বাধীকার, ভাষার সংগ্রাম আর সুমহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রভাগ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে জিল্লুর রহমান অন্যতম। একজন স্বেচ্ছাসেবক হয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করে দীর্ঘ ৬২ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন তিনি। রাজনৈতিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অভিভাবককে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক কালোরাত্রে বাবা-মা-ভাইসহ সবাইকে হারানোর পর প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানই ছিলেন তাঁর পারিবারিক অভিভাবক। জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব পালনের মধ্যে অসুস্থতার জন্য কয়েকবার দেশে-বিদেশের হাসপাতালে চিকিত্সাও নেন তিনি। গত ডিসেম্বর মাসেও যুক্তরাজ্যে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। সর্বশেষ গত ৯ মার্চ রাতে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে জিল্লুর রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক (সিএমএইচ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিত্সকদের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিত্সার জন্য তাঁকে ১০ মার্চ রাতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তার চিকিত্সা শুরু হয়। রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা স্পিকার আব্দুল হামিদ অ্যাডভোকেট, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। রাষ্ট্রপতির মৃত্যুসংবাদ শুনে গতকাল মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তার মরদেহ দেখতে যান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান ও তার পুত্র ফয়সাল মোরশেদ খান। জিল্লুর রহমানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ১৯২৯ সালের ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা মেহের আলী মিঞা ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং তত্কালীন ময়মনসিংহ লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও জেলা বোর্ডের সদস্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্সসহ এমএ এবং এলএলবি ডিগ্রিধারী জিল্লুর রহমান বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হন। ১৯৫৬ সালে কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছাড়াও ষাটের দশকে ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সম্পাদক, ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেন। একই বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বাকশালের প্রথম সম্পাদক ছিলেন তিনি। ওই বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর চার বছর কারাবন্দী ছিলেন। আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি আবারও দলের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালের কাউন্সিলেও পরপর দুই বার দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০২ সালের কাউন্সিলে প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। জিল্লুর রহমান ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ছিলেন তিনি। পাশাপাশি সংসদ উপনেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী বিশিষ্ট নারীনেত্রী ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে তিন দিন পর মৃত্যুবরণ করেন। পারিবারিক জীবনে জিল্লুর রহমান এক ছেলে এবং দুই মেয়ের পিতা। মহান ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের গৌরবময় অধ্যায় রয়েছে জিল্লুর রহমানের। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে ঢাকার বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব পাসের পেছনে তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমউদ্দিন পল্টন ময়দানের সভায় আবারও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরে ধর্মঘটসহ যেসব কর্মসূচি পালিত হয় তাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন জিল্লুর রহমান। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় যে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় তাতে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সে সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাস হয়। একুশে ফেব্রুয়ারির আগের দিন ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ফজলুল হক ও ঢাকা হলের পুকুর পাড়ে বসে যে ১১ ছাত্র নেতা একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জিল্লুর রহমান তাদের অন্যতম। একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ছাত্র সভা এবং ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে মিছিলেও ছিলেন জিল্লুর রহমান। ছিলেন পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতেও। ১৯৫৩-৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত ইসলামিক সম্মেলনে বক্তারা বাংলা ভাষার প্রতি কটাক্ষ করলে জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্ররা সে সম্মেলন কেন্দ্র ঘেরাও করে। ফলে সে সম্মেলন পণ্ড হয়ে যায়। ওই আন্দোলনের কারণে জিল্লুর রহমানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং কেড়ে নেয়া হয় তার এমএ ডিগ্রি। যদিও ছাত্র আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ পরে সে সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে ১৯৪৮ সালে জিল্লুর রহমান ছিলেন ঢাকা (ইন্টারমিডিয়েট) কলেজের ছাত্র। ১৯৫৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ফজলুল হক হলের দোতলায় জিল্লুর রহমানের কক্ষটি ছিল ভাষা আন্দোলনের পোস্টার লেখার কেন্দ্র। ১৯৫৬ সালে তিনি আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইন জারির পর ওই বছর ১৬ জুলাই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতার হলে জিল্লুর রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে বিচক্ষণতার সঙ্গে দল পরিচালনা ও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নবম জাতীয় সংসদে জিল্লুর রহমান সংসদ উপনেতা নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ গ্রহণ করবেন। বিমানবন্দরে এ সময় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের নামাজে জানাজার সময় নির্ধারণে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক চলছে।