বিশেষ সম্পাদকীয়

আমরা শোকাহত

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৫
রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ইন্তেকাল করিয়াছেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গত বুধবার বিকালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁহার মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের ছায়া নামিয়া আসিয়াছে। উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। শ্বাসকষ্টজনিত কারণে গত ৯ই মার্চ তাঁহাকে ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হইয়াছিল। চিকিত্সকদের পরামর্শে উন্নত চিকিত্সার জন্য পরদিন সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। জিল্লুর রহমানের সর্বাপেক্ষা বড়ো পরিচয় হইল, তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, নির্বিরোধ ও নীতিনিষ্ঠ এক রাজনীতিক। রাজনীতির সাথে জড়াইয়া পড়িয়াছিলেন ছাত্রাবস্থায়। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করিয়াছেন। দীর্ঘ ছয় দশকের কর্মময় রাজনৈতিক জীবনে বহু চড়াই-উত্রাইয়ের মুখোমুখি হইয়াছেন তিনি, কিন্তু কখনই নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দেন নাই। নতি স্বীকার করেন নাই কোনো প্রকার ভয়ভীতি কিংবা লোভ-লালসার কাছে। ইহার অকাট্য উদাহরণ হইল, বঙ্গবন্ধু যেমন আমৃত্যু তাঁহার উপর আস্থা রাখিয়াছিলেন, তেমনি আস্থা রাখিয়াছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। বলা বাহুল্য, তিনি তাঁহার যথোচিত প্রতিদানও দিয়াছেন। সকল বিচারেই তিনি ছিলেন অনন্য ও অনুসরণযোগ্য এক মানুষ। দেশ, দেশের মানুষ ও নেতৃত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসার যে-দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন, আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে তাহা ক্রমেই বিরল হইয়া পড়িতেছে। অতএব, তাঁহার মৃত্যুতে যে-শূন্যতার সৃষ্টি হইয়াছে তাহা যে পূরণ হইবার নহে—এই কথা না বলিলেও চলে। জিল্লুর রহমান ১৯২৯ সালের ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ইতিহাসে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় হইতে তাঁহাকে বহিষ্কারই শুধু করা হয় নাই, একই সাথে কাড়িয়া নেওয়া হইয়াছিল তাঁহার ডিগ্রিও। আন্দোলনের মুখে পরে অবশ্য তাহা ফিরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল। চুয়ান্নোর ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছিলেন। ছিলেন কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ঢাকা জেলা বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হইয়াছিলেন ষাটের দশকেই। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে বাষট্টি, ছেষট্টি ও ঊনসত্তরসহ প্রতিটি আন্দোলনেই অংশ নিয়াছেন সক্রিয়ভাবে। সংগঠক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছেন মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হইয়াছিলেন ১৯৭০ সালে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলির সদস্য হিসাবে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখিয়াছেন। মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইয়াছেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং সংসদের উপনেতা হিসাবেও দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। ১৯৭২, ১৯৭৪, ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালে চারদফায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়াছেন দীর্ঘসময়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠিত হইলে সেই সংগঠনেরও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। সব মিলাইয়া, এতো দীর্ঘ, সফল ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের উদাহরণ আমাদের দেশে খুব বেশি আছে বলিয়া মনে হয় না। বলা বাহুল্য যে, এই অর্জন এমনিতে হয় নাই। ইহার জন্য বিপুল ত্যাগ স্বীকার করিতে হইয়াছে তাঁহাকে। কারাভোগ করিয়াছেন। এমনকী জীবনের শেষ পর্যায়ে আসিয়া স্ত্রী আইভি রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর দুর্বহ শোকও সহ্য করিতে হইয়াছে। কিন্তু তাঁহার চরিত্রের অতুলনীয় একটি বৈশিষ্ট্য হইল, এতো বড়ো বিপর্যয়ও তাঁহাকে প্রতিহিংসাপরায়ণ করিয়া তোলে নাই। বরাবরই তিনি ছিলেন মৃদুভাষী, শান্তিপ্রিয় ও পরমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এক মানুষ। সেই জন্যই আজীবন আদর্শের রাজনীতিতে অবিচল থাকা সত্ত্বেও তাঁহার কোনো শত্রু ছিল না। সকল গণতান্ত্রিক সমাজই এমন নেতাকে লইয়া গর্ব করিতে পারে। অনন্য এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।