আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

কিংবদন্তির কথক

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৩, ১৮:৩৬
ভাষা আন্দোলনের আবেগ ও অনুভূতির একটি নিরাভরণ কাব্য-আলেখ্য আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোন এক মাকে’। গ্রাম থেকে আগত এক তরুণের মৃত্যুবেদনাই এই কবিতার মূল বিষয়। সাদামাটা উপমা। রূপকল্পে স্বরবৃত্তের বাঁধন। বর্ণনায় নেই অতিকথন, নেই এলিয়ে পড়া ভাব। টানটান ভঙ্গিতে বর্ণনা করে গেছেন মায়ের অনুভূতিকে। ছেলের ভালো লাগার আর ভালোবাসার বিষয়গুলোকে কবি বর্ণনা করেছেন সহজিয়া সুরে। শব্দের অর্থদ্বৈততা নেই, নেই সাঙ্কেতিকতা বা রূপকের জটিলতা। সহজ সরল বর্ণনা। বর্ণনার মাঝামাঝি এসে বোঝার উপায় নেই বেদনাটুকু কার। পুত্রের না মাতার। শেষ দিকে বোঝা যায় বেদনাটুকু মায়ের হলেও, আড়াল থেকে পুত্র যেন ভাগ করতে চাইছে মায়ের বেদনাটুকু। কবির সাদামাটা বলার ভঙ্গিতে পাঠকের বুক-চোখ ভারী হয়ে আসে। অর্ধশতক পূর্বে পূর্ব-বাংলার কাব্যযশ প্রার্থীদের মধ্যে তিরিশের প্রভাব প্রবল। কেউ কেউ এদের এড়াতে সমর-সুভাষকে গ্রহণ করলেন। পাশাপাশি ছিল ইসলাম ভাবধারার একটি স্বতন্ত্র ধারা। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র এই সময়ের চিন্তা-চেতনার কাছাকাছি ছিলেন সমর-সুভাষরা। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তিরিশ বা চল্লিশের কোনো ঘরানায় গাণ্ডা না বেঁধে নিজের ভাবনাকে নিজের মতো করেই ব্যক্ত করেছেন। নিজের মতো করে নিজের কথা বলতে চেয়েছেন। স্বল্পপ্রজ কবি বলে হয়তো পূর্ববর্তীদের এড়াতে পেরেছেন। ‘কুমড়ো ফুল’, ‘সজনে ডাঁটা’ বা ‘ডালের বড়ির’ চিত্রকল্পের সঙ্গে যেকোনো কাব্য পাঠক জসীমউদ্দীনের একজন সফল উত্তরসূরিকে খুঁজতে চাইলে, পাঠক বিমুখ হবেন। এমনকি পরিণত ওবায়দুল্লাহ কবিতার ভুবনে যে বাংলাদেশ, সে বাংলাদেশের সঙ্গে সাযুজ্য নেই—‘ছিন্নপত্র’ বা ‘গল্পগুচ্ছের’ চিত্রময়তার বা বিভূতিভূষণের অপু-দুর্গার বেদনার্ত হূদয়ের কথকতার, এমনকি ‘রূপসী বাংলার’ প্রকৃতির রহস্যময়তা বা আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিনে’র ‘সম্পদের সুষম বণ্টনের’ বঙ্গীয় অনুভূতির ব্যাকুলতায় তিনি আচ্ছন্ন হননি। তবে গ্রামীণ চিত্রকল্প বা উপমাকে ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক পটভূমিতে। তথাকথিত নাগরিক মনস্কতা বা বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন তাকে আকৃষ্ট করেনি। তাঁর সময়কে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে। প্রথম দিকের রচনায় বেছে নিলেন ছড়ার শৈলীকে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৈশোরের মাতৃ হারানোর স্মৃতি-বেদনাকে। মাতৃ-মৃত্যু তাকে কেবল শোকাহত করেনি মাতৃ-মৃত্যুর বেদনাকে আজীবন বহন করে গেছেন। এই বেদনাকে কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন কখনো ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্তির মাধ্যমে, কখনো-বা সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞা দিয়ে প্রাসঙ্গিকতায় নিয়ে এসেছেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে। ‘সাতনরীর হারের’ কোনো কবিতাই রাজনৈতিক নয়, যে অর্থে গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো’, বা হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’ অথবা আলউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ অথবা শামসুর রাহমানের ‘দুঃখিনী বর্ণমালা আমার’, অথবা সৈয়দ শামসুল হকের ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’, অথবা নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’। ‘সাতনরীর হারের’ পর আবু জাফর আর উল্লেখযোগ্য কাজ করেননি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ বা সৈয়দ শামসুল হকের ক্ষেত্রে আমরা যেমন বিবর্তন বা ধারাবাহিকতা জাত কবিতা পেয়েছি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে তার মতো পেশাগত কৃতিত্ব বা সাফল্য আর কোনো বাঙালি কবির ভাগ্য ঘটেনি। আক্ষরিক অর্থেই ঈশ্বরের বরপুত্র তিনি। মেধাবী, সুদর্শন ও সজ্জন। পারিবারিক পটভূমি কোনো অংশেই ন্যূন নয়। বাবা ছিলেন বিচার বিভাগে। তারও সাফল্য কম নয়। বিচার বিভাগের সর্বনিম্ন ধাপ থেকে কাজ শুরু করেছিলেন, অবসর নিয়েছেন উচ্চ আদালত থেকে, আইয়ুবী আমলে কেন্দ্রীয় আইনসভার স্পিকার। মায়ের দিক দিয়ে সংশ্লিষ্টতা ছিল ফজলুল হকের পরিবারের সঙ্গে। ’৪০ এবং ’৫০ দশকের কিছুটা সময় কেটেছে পিতার চাকরির সূত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহকুমা আর জেলা শহরে। জীবনযাপন অনেকখানি যেন অসীম রায়ের ‘আবহমানকালে’ আদলে কেটেছে। এই সময়ে মায়ের মৃত্যু এবং পিতার পুনঃবিবাহ। পারিবারিক বন্ধনটা ক্রমশ শিথিল হয়ে এল। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র মতোই আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ যেন ব্যক্তিগত সঙ্কটকে কাটিয়ে তুলতে চাইলেন মাতৃরূপ অন্বেষায় বাংলাদেশকে ভিন্নমাত্রায় অভিব্যক্ত করতে। এই পর্যায়ে মহকুমা প্রশাসক বা জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন কবি ওবায়দুল্লাহ। সঙ্গত কারণেই সরে এসেছেন কাব্যলক্ষ্মীর কাছ থেকে। জনপ্রিয় কর্মকর্তা হিসাবে খ্যাত ছিলেন কর্মস্থলে। এই সময় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র জন্য ফলপ্রসূ ছিল আখতার হামিদের নিবিড় সান্নিধ্য। উক্ত সান্নিধ্যের ফলশ্রুতি তাঁকে নথিক্রান্ত করেনি। বরং বাংলাদেশের কৃষকের একটা তাত্ত্বিক অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছেন। আখতার হামিদের কৃষক ভাবকল্পে ছিল না কোনো রাজনৈতিক মায়াজাল বা স্বল্পবিলাসের অভিধা। নিজে অবাঙালি ছিলেন বলেই বাংলার গ্রামসমাজ বা মৃত্তিকার শ্রমিকদের একটা বাস্তবসম্মত প্রতিকৃতি দাঁড় করিয়েছেন। আবু জাফর কাব্যলক্ষ্মীকে বিরহে রেখে কৃষিলক্ষ্মীকে বরণ করলেন। তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার সঞ্চয় নিয়ে এলেন মহাচীনে। ভিন্ন সভ্যতায়, ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায়— সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরবর্তী মহাচীনে। ‘সাতনরীর হার’-এর কবি ঘুরে দেখলেন কৃষিব্যবস্থা ও কমিউন পদ্ধতি। এই অভিজ্ঞতার আলোকে লিখলেন বই। এ যেন নিজেকে রূপান্তর করলেন আমলা থেকে কৃষি বিশেষজ্ঞে। এই রূপান্তর পরবর্তী সময়ে তাঁর কবিতায় সুস্পষ্ট ছাপ ফেলেছে। বলা যেতে পারে চীন থেকে তিনি অর্জন করেছেন সমষ্টিগত শক্তির বাস্তবতাকে। এই প্রসঙ্গে পাঠক স্মরণে আনুন সমর সেনকে, রুশ দেশে যাবার আগে তাঁর কবিতায় গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে এসেছে স্টালিনের যৌথ খামার আর ট্রাক্টরের চিত্রকল্প। রুশ দেশে এসে নিজ মেধাকে সীমাবদ্ধ রাখলেন অনুবাদকর্মে। আদি অকৃত্রিম রুশীয় বা টলস্টয়ের কৃষকের কথা তাঁর ‘বাবু বৃত্তান্তে’ নেই। পক্ষান্তরে চৈনিক কৃষকের একটা রূপরেখা বা সামর্থ্য বা সীমাবদ্ধতাকে আবু জাফর উপলব্ধি করেছেন তাত্ত্বিকভাবে। চীনে বসবাস কবিকে মানুষের অন্তর্গত এবং বহিঃস্থ শক্তি বুঝতে সহায়তা করেছে। দেশ স্বাধীন হবার পর ফিরে এসে পেশাগত জীবনে ওবায়দুল্লাহ খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি। ফলে পাড়ি জমালেন মার্কিন মুলুকে। পুনরায় প্রত্যাবর্তন বিদ্যায়তনিক জগতে। পেশাগত সাফল্য আর আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ যেন সমার্থক। মার্কিন মুলুকের বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর খ্যাতি জুটতে বিলম্ব হয়নি। পঁচাত্তর পরবর্তীকালে দেশে এসে যোগ দিলেন সচিবালয়ে। কৃষি দফতরে কাজ করেছেন বেশি সময় ধরে। এক ধরনের দায়বদ্ধতা থেকেই এই দফতরে কাজ করে গেছেন। সীমাবদ্ধ পরিসরে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার আলোকে। কৃষি দফতরে কাজ করতে করতেই রচনা করেছেন তার কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’। এরই মাঝে কবির বিবাহ বিচ্ছেদ। একদা এই প্রেয়সীকে পেয়েছিলেন প্রায় মরণপণ লড়াই করে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর বা পুনঃবিবাহের পর যেন তার সৃষ্টিশীলতা আরও গতিশীল হয়ে উঠল। বিচ্ছেদের পর যে নারী এল তিনিও গুণবতী, পরিশীলিত, আর প্রথমাতো রীতিমত বিদুষী। পুনঃবিবাহের পর ঢাকার আবাসে কবিদের নিয়ে গড়লেন দল—পদাবলী। তরুণ, অতি তরুণ, বৃদ্ধ, প্রৌঢ়, মধ্য বয়স্ক সব কবিদের সান্ধ্যঠিকানা আমলাপাড়ার সুশোভন বৈঠকখানা। মোশন মাস্টার বেলাল চৌধুরী। কৃত্তিবাসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগালেন তিনি। কবিরাও নিজেদের পুচ্ছ মেলে ধরলেন। দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা পাঠের ব্যবস্থা হলো। সুমুদ্রিত স্মরণিকা, ক্যাসেট সবই হলো। কিন্তু রফিক আজাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি,—অর্থাত্ ভবিষ্যত্ কাব্যআন্দোলনে কোনো স্বাক্ষর রাখতে পারেনি পদাবলী। বদলিজনিত কারণে ওবায়দুল্লাহ ঢাকা ত্যাগের পর পদাবলীর অস্তিত্ব বিপন্ন বিস্ময়ে বিলীন না হলেও আর্থিক কারণে বিপন্ন হয়েছে। পদাবলী গড়ে উঠেছিল ওবায়দুল্লাহ’র নিজ তাগিদে, আত্মপ্রকাশ করতে চাইছিলেন তিনি। এই তাগিদ তাকে অন্যান্য কবিদের কাছাকাছি এনেছিল। কবিরা পেল পানাহারের একটা স্থায়ী ঠিকানা। সব বয়সের কবিরা জমিয়ে রাখলেন কাকরাইলের শ্যামলী নিসর্গকে। বিশেষ করে লুম্পেন কবিদেরকে কবি ও কবিপত্নী অপত্য স্নেহে ঠাঁই দিয়েছেন নিজ বাসভবনে। বাংলা একাডেমীর একুশের ভোরে কবিতা পাঠের আসরে আপত্তি জানিয়েছিলেন মাত্র একজন। পক্ষান্তরে মঞ্চে উপবিষ্ট অধিকাংশ কবিরাই ছিলেন ওবায়দুল্লাহ কর্তৃক অনুগৃহীত অথবা প্রতিপালিত অথবা আপ্যায়িত। নৈতিক কারণে মঞ্চ থেকে নেমে এসে নীরবে প্রতিবাদ জানাবার অবকাশ ছিল তাদের। সেদিন কেউ প্রতিবাদ জানাননি। যেমন করেননি ২০০১-এর জাতীয় কবিতা উত্সবে। একুশের ভোরে হয়তো কারণ ছিল এরশাদের মন্ত্রী বলে। কিন্তু জাতীয় কবিতা উত্সবে অবমাননার কারণে? ‘কিংবদন্তীর কথকতায়’ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। একজন মেধাবী ও সফল আমলা কেন এরশাদের মন্ত্রী হবেন? মন্ত্রী হবার মধ্যে দোষ নেই। কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কি এরশাদের প্রদত্ত নিয়োগ এড়িয়ে থাকতে পারতেন না? পেশাগত দিক দিয়ে তাঁর বহুবিধ বিকল্প ছিল। আবারও কথার পিঠে কথা এসে যায়। একি সেই মুনীর চৌধুরীর উক্তি “জীবনের মোহের কাছে আমি পরাজিত”। আসলে ওবায়দুল্লাহ মন্ত্রীর ক্ষমতা আর রাষ্ট্রদূতের জৌলুসের মোহ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। লুম্পেন কবিদের প্রতিপালনের পরও অবমাননার করাল গ্রাসে তাকে নিয়ে একুশের ভোরে আর এক লুম্পেন কবি বিরূপ পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল। আনিসুজ্জামান ও বেলাল চৌধুরী সম্পাদিত সঙ্কলনে অনিবার্যভাবেই কোনো কোনো লেখায় এই প্রসঙ্গ এসেছে, তবে কার্যকারণ ব্যাখ্যা করেননি কেউ। সঙ্কলনে বাদ পড়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপঞ্জি। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মূলত রাজনৈতিক-সচেতন কবি। ‘সাতনরীর হার’ থেকে ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ পর্যন্ত সময়টুকু ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের উদ্ভবের কাল। অনেকটা সংস্কৃত শ্লোকের মতো পঙিক্তগুলোর গঠন। কবি বন্দনা করেননি কোনো অদৃশ্য শক্তিকে, তাঁর আরাধ্য গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের জনগোষ্ঠী। অনিবার্যভাবেই তারা কৃষক। কৃষকের কথা বলতে গিয়ে যে ইতিহাসকে ব্যবহার করেছেন, সেই ইতিহাস আমজনতার, সেই পিতৃপুরুষরা চর্যাপদের শ্রমণ, তিতুমীর অথবা বিদ্রোহী কৈবর্ত, অথবা মজনু শাহ, অথবা নূরুলদীন, অথবা তিতুমীর অথবা শরীয়তউল্লাহ অথবা স্থানীয় কোনো কৃষক নেতা হয়ে ফজলুল হক, ভাসানী হয়ে মুজিব এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চোখ হারানো কমল পর্যন্ত। এই কবিতার সঙ্গে রাঢ় অথবা ভাগিরথীর তীরবর্তী জনপদের মানুষদের জীবনচর্যা মিলবে না। যে পিতৃপুরুষের কথা বলা হয়েছে সে যেন গিল গামেশ অথবা সেমিটিক মহাপ্লাবনের পরবর্তী কোনো পুরুষ। যে পুরুষের অধিষ্ঠান নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে। সে অবশ্যই অভিজাত বা ব্রাহ্মণ নয়। সে অনার্য, ব্রাত্য এবং অস্তিত্বের সংগ্রামে সতত ব্যাপৃত। ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ যেন একান্তভাবেই বাঙালি মুসলমানের সংগ্রামশীলতার ইতিবৃত্ত। পিতৃপুরুসের ঋজু ভাবটি বা পলিমাটির সৌরভ বা রক্তজবার মতো ক্ষতের দাগ আমাদের জাতীয় সংগ্রামের এক একটি প্রতীক। পুরো কবিতায় আবহমান বাংলা আর বাঙালির কথা, তাদের জাতীয় রাষ্ট্র উদ্ভবের কথা কবি বলতে চেয়েছেন। সংগ্রামশীল মানুষের সমষ্টিগত চেতনাকে নানা বর্ণের ছবি দিয়ে সাজিয়ে তুলেছেন। সহজিয়া ভঙ্গীতে। তবে বাঁধনটা দৃঢ়। গদ্য ছন্দে। বাংলা গদ্যকবিতার অন্তর্নিহিত শক্তিকে কবি আবিষ্কার করেছেন নতুন মাত্রায়। সহজিয়া সুর শব্দ ব্যবহার বা উপমা নির্মাণে তত্সম শব্দকে দিয়েছেন সমাধিক গুরুত্ব। ক্রিয়া পদে চলতি ভাষার ধাতুরূপ দিয়ে নির্মাণ করেছেন তার কথকতাকে। এক পর্যায়ে ইতিহাস, নৃতত্ত্ব বা ভৌগোলিক উপাদান গৌণ হয়ে পাঠকের কাছ উদ্ভাসিত হয় কবিতার প্রাণপ্রতিমা। শেষ পর্যন্ত ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ আর কথকতা থাকেনি। বাঙালি জাতিসত্তার একটা মহাকাব্যিক ভ্রণরেখায় রূপান্তরিত হয়ে উঠে। মাতৃ বেদনার স্মৃতি নিয়ে শুরু করেছিলেন কাব্যযাত্রা, শেষ অধ্যায়ে এসে নিজেকে উত্তীর্ণ করেছেন জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার কাব্যকথক রূপে। রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াকে কবি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের আলোকে ব্যক্ত করেছেন।