পহেলা বৈশাখের কথা মনে পড়লেই আপনার সামনে জ্বলজ্বল করে উঠবে নানান বর্ণের মুখোশ। মুখোশের সাথে পহেলা বৈশাখের এই সম্পর্ক নাগরিক নয় কোনোভাবেই। অন্তত উত্পত্তির দিক থেকে। অর্থাত্ গ্রামীণ কিংবা লোকজ। এই লোকজ সংস্কৃত নান্দনিক প্রকাশভঙ্গিমার একটা দিক মুখোশ। মুখোশের ইতিহাসও তাই প্রাচীন। আফ্রিকান মুখোশ পিকাসোর কাজকে আরও উন্নততর করতে সাহায্য করেছিল। আবার এ-ও বলা যায় প্যারিফেরি অঞ্চলের মুখোশ নিজেদের বিকশিত করে তুলেছিল তার উত্পত্তিজাত স্থানের বাইরে নতুন কোনো পরিবেশে। এছাড়াও নৃত্যে, নাট্যে বা চারুকলার নানান প্রকাশভঙ্গিমায় মুখোশশিল্পের উপস্থাপনের ইতিহাস রয়েছে।
বাংলাদেশে মুখোশ শব্দটা মানুষের ভেতর কোনো প্রকার ইতিবাচক সাড়া সৃষ্টি করে বলে মনে হয় না। কারণ তারা মনে করে ‘মুখোশ’ মানেই মুখ নয়। প্রকৃত মুখ নয়, মুখের খোলশ বা মুখের বিপরীতে যেকোনো খোলশ। তার এই ‘বোধ’ প্রাণীবিশেষের অভিজ্ঞতা জাত। কারণ, শিকারের লোভে সেটা প্রাথমিকভাবে জীবন ধারণের প্রয়োজনেই প্রাণীবিশেষের মুখোশ পড়ে প্রাণীবিশেষকে বধ করা হতো, শিকার করা হতো। এই যে শিকারের প্রক্রিয়া সেখানে মুখ্য অস্ত্র হিসেবে ছিল মুখোশ। কিন্তু এই প্রক্রিয়া থেকে আরও কতিপয় বিষয় বের হয়ে এসেছে। যেমন মানুষ হরিণের মুখোশ নিয়ে হরিণের মতো করে হেঁটে বা দৌড়িয়ে হরিণকে বিভ্রান্ত করত এবং বধ বা শিকার করত। এই যে হরিণের মতো করে হাঁটা বা ময়ূরের মতো করে ভঙ্গিমা এটা থেকেই তো নৃত্যের জন্ম। নাটকও আছে। যা-ই হোক বাংলাদেশে মুখোশের ব্যবহার উত্সব কেন্দ্রিক। চারুকলার মূলধারার শিল্পমাধ্যম হিসেবে মুখোশের প্রভাব সামান্য। প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা অঙ্গনের বাইরে শৈল্পিক নিদর্শন বা নিতান্ত ঘর সাঁজানোর উপকরণ হিসেবেও মুখোশের ব্যবহার অপ্রতুল। এই ঘাটতি লাঘব করার উদ্দ্যেশ্য নিয়ে কতিপয় তরুণ মুখোশ নির্মাণ যজ্ঞে নেমেছেন। যাদের মধ্যে— ফারুক আহমেদ, মোবাশ্বির আলম মজুমদার, আবুল মোমেন মিল্টন, নাসির আহমেদ, সুমনা হক মিঠু, পিন্টু দেব, আব্দর রহিম, নূরুল ইসলাম প্রিতম, তানভির আহমেদ, মাহমুদুল হাসান, রিপন সিংহ, নাজমা বেগম, অনন্যা দে, শ্যামল সূত্রধর, সজিব পাল, ঋতুপর্ণা ধর, সাদিয়া, পলাশ চৌধুরী, শিমুল দত্ত, অমিত কুচ, তুষার দে, শক্তি নোমান, আমানউল্লাহ খান অন্যতম। সমন্বয়ক হিসেবে রয়েছেন সন্দীপ কুমার দেব নাথ এবং কিউরেটর হিসেবে আছেন শাওন আকন্দ। অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে মোটা দাগে দুইটি ধারা আছে। প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা শিক্ষার শিল্পীরা যেমন আছেন তেমনি লোকজ এবং স্বভাব শিল্পীরাও রয়েছেন যারা কখনো কখনো সৌখিন বিক্রেতা হিসেবে এই মুখোশ শিল্পের দিকটিকে চর্চায় রেখেছে। এই কর্মশালার উদ্দ্যেশ্য সম্পর্কে জানা গেছে। তাঁরা প্রত্যেকেই চাচ্ছেন উত্সবকেন্দ্রিক যে মুখোশ চর্চা বাংলাদেশে আছে ঠিক সেই ধারার মোটিফ থেকে মুখোশ শিল্পকে বাইরের বৃহত্ এবং শিল্পের সৃষ্টিশীল পাটাতনে এনে দাড় করানো। যাতে করে মুখোশ সংগ্রহের বিষয়টিকে বার মাস জারি রাখা যায়। এবং বিবিধ সজ্জার উপকরণ হিসেবে নাগরিকদেরকে আকৃষ্ট করাও সম্ভবপর হয়। এই কর্মশালার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে স্বভাব শিল্পীদের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক চারুশিল্পীদের একটা সম্মিলন। এতে করে এই দুই ধারার শিল্পীদের মধ্যে ভাব বিনিময় হবে। উভয়ের কর্মপদ্ধতি, ফর্ম নির্বাচন, রেখা এবং রং-সহ বিবিধ উপকরণ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হবে। এই দুই অভিজ্ঞতার একটা মিথস্ক্রিয়া হবে। দর্শক দুই ধারার কাজকেই এক সাথে উপভোগ করতে পারবেন।
পূর্বেই বলেছি মুখোশ মূলত ‘মুখ’কে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। তবুও মাঝে মাঝে আমরা দেখি মুখোশ সৃষ্টিতে মুখশ্রী কিংবা নানাবিধ চারিত্রিক লক্ষণ বা বিশেষ অবয়বকে ফুটিয়ে তুলতে এই মাধ্যমের জুড়ি নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামে ব্যানার ফ্যাস্টুনের পাশাপাশি মুখোশ অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। এবং নিঃসন্দেহে এই অবদানের পিছনে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা চর্চার ভূমিকাই অনন্য। মানুষের মুখোশের পাশাপাশি অপরাপর পশু-প্রাণীর মুখের আদলেও মুখোশ হয়ে থাকে। এ প্রদর্শনীতে এ রকম কিছু থাকবে কিনা, সমন্বয়কারীতে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, কাজ চলছে অবিরামভাবে। কিন্তু অদ্যাবধি যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে করে মানুষের মুখোশই তো বেশি দেখা যাচ্ছে।
