তাঁর সকল চেতনাই গড়ে উঠেছিল কবিতাকে কেন্দ্র করে। আশ্চর্য তীক্ষ চৈতন্যবোধ কাজ করেছে এই কবির মধ্যে। তাঁর কবিতায় অন্যায়ের প্রতিবাদ, স্বাধীনতা চেতনা, ভাষাপ্রেম, রোমান্টিক জীবন-পিপাসা, ব্যক্তিমন সমাজদীক্ষা বেদনা ও ক্লিষ্টতার ছবি মূর্ত হয়েছে। আর এই বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে তাঁর প্রতিটি কবিতা স্বকীয় ঔজ্জ্বল্যে ও মাধুর্যে ভাস্বর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীর ওপর যে নিষ্ঠুরতম ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ হয় তারই শিকার হয়ে যিনি প্রথম শহীদ মহিলা কবি হিসেবে অভিহিত হন—তিনি মেহেরুন্নেসা। তাঁর জন্ম ১৯৪০ সালে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। দেশভাগের পর আর দশটি দাঙ্গাবিধ্বস্ত পরিবারের মতোই তাঁর পিতা আব্দুল রাজ্জাক পত্নী ও চার ছেলে-মেয়েসহ প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় ১৯৫০ সালে ঢাকায় তাঁতীবাজার এলাকার একটি বাসায় ওঠেন।
মেহেরুন্নেসার বাবা ছিলেন জ্ঞানপিপাসু ও সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তি। তাই তাঁর ছেলে-মেয়েদের প্রত্যেকেরই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল। তাঁরা প্রত্যেকেই কবিতা, গান বা গল্প—কিছু না কিছু লিখতেন। এঁদের মধ্যে মেহেরুন্নেসা ছিলেন অন্যতম। শৈশব থেকেই মেহেরুন্নেসার এক আবেগময় কবি মন গড়ে উঠেছিল। তাঁর সকল চেতনাই গড়ে উঠেছিল কবিতাকে কেন্দ্র করে। আশ্চর্য তীক্ষ চৈতন্যবোধ কাজ করেছে এই কবির মধ্যে। তাঁর কবিতায় অন্যায়ের প্রতিবাদ, স্বাধীনতা চেতনা, ভাষাপ্রেম, রোমান্টিক জীবন-পিপাসা, ব্যক্তিমন সমাজদীক্ষা বেদনা ও ক্লিষ্টতার ছবি মূর্ত হয়েছে। আর এই বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে তাঁর প্রতিটি কবিতা স্বকীয় ঔজ্জ্বল্যে ও মাধুর্যে ভাস্বর।
ষাট দশক থেকেই তাঁর লেখা কবিতা বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বিশেষ করে সেই সময়ের বাংলাদেশে মহিলাদের সাপ্তাহিক ‘বেগম’-এ। তিনি লিখতেনও খুব। ষাট দশকের শেষভাগে তিনি রচনা করেন অনেক দেশাত্মবোধক কবিতা। স্বাধীনতার পর একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে বহু কবিতা লিখে ভাষাশহীদদের জানিয়েছেন হূদয়ের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ।
এই সংগ্রামী কবি একাত্তরের প্রথমদিকে তাঁর লেখা ‘জনতা জেগেছে’ নামক কবিতাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সাহিত্য সভায় পাঠ করেন। এতে ঢাকার অবাঙালিরা তার উপর ক্ষুব্ধ হয়। কবিতার কিছু পঙিক্ত ছিল এরকম—
“ মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার
সাতকোটি বীর জনতা জেগেছে এই জয় বাংলার।
বাঁচবার আর বাঁচাবার দাবি দীপ্ত শপথে
আমরা দিয়েছি সব ভীরুতাকে পূর্ণ জলাঞ্জলি
বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে
চির বিজয়ের পতাকাকে দেব সপ্ত আকাশে মেলে।”
কবি মেহেরুন্নেসা ১৯৭১ সালে দুই ভাই ও মা’সহ মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে বাস করতেন। মিরপুর এলাকা মূলত ছিল বিহারিদের আবাসিক এলাকা। সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন নিয়ে বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে বিরোধ বাঁধে। এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বিহারি ও স্থানীয় পাকিস্তানি দালালরা ক্ষিপ্ত হয়ে বাঙালিদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় ও বাঙালি নিধন শুরু করে। কবি মেহেরুন্নেসার ছিল এক আন্দোলনমুখী এবং আপোসহীন মানুষ। বাঙালির এই সংকট মুহূর্তে তিনি অসীম সাহস ও দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বাঙালিদের সংগঠিত করতে, সোচ্চার করতে প্রচেষ্টা চালান। এতে তাঁর জীবনের প্রতি হুমকি আসলেও তা অগ্রাহ্য করেন। অবশ্য বিহারি ও পাকিস্তানি দোসরদের কর্মকাণ্ড জানাবার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছেও এসেছিলেন। কোনো সমাধানের আগেই কবির পরিবারে নেমে আসে বিপর্যয়। নিহত হন তিনি সপরিবারে। এভাবে অকালে ঝরে যায় একটি প্রতিভা। বাংলা কাব্য-সাহিত্যকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে মেহেরুন্নেসার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কবি মেহেরুন্নেসা ছিলেন সংবেদশীল মনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি। নিজের পরিবারের প্রতি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ, মা-বাবা ও সহোদরদের প্রতি ছিল তাঁর অনাবিল ভালোবাসা। তাই নিজের সংসার করার কথা চিন্তা না করে রোগাক্রান্ত পিতার চিকিত্সা, দুই ভাইয়ের পড়াশোনার ভার বহন করতে এবং অর্থনৈতিক দৈন্যক্লিষ্ট পরিবেশ থেকে পরিবারকে বাঁচাতে বাংলা একাডেমীতে কপি রাইটিং এর কাজ নেন। কিন্তু কবিতা ও কপিরাইটিং এর পারিশ্রমিক দিয়ে সংসার খরচ সংকুলান না হলে তিনি ফিলিপস রেডিও কোম্পানিতে রেডিও এসেমব্লিং-এর কাজে যোগ দেন। এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সাথে এগিয়ে যান। ।
একজন সচেতন কবি, বুদ্ধিজীবী, দেশপ্রেমিক—এই তিনরূপেই তার বিকাশ। দেশ-জাতি তথা বাংলাভাষাকে ভালোবাসার জন্য এক ব্যতিক্রমী নিবেদিত প্রাণের মানুষ ছিলেন মেহেরুন্নেসা। তাই তিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অবদানের জন্য অমর হয়ে থাকবেন, তেমনি বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ড স্বাধীনতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
২৭ মার্চ মাত্র ৩১ বছর বয়সে এই সংগ্রামী কবি শহীদ হন। শহীদ কবি মেহেরুন্নেসার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ।
