রসূল (স.)-এর বিস্ময়কর মুজিজাসমূহ

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪২
পৃথিবীর অসংখ্য গ্রন্থের মধ্যে আল কুরআন এমন একটি অলৌকিক কেতাব যার মধ্যে ভুল তো নাই-ই, বরং কোনো সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ পর্যন্ত নাই। বলা হয়েছে—জা-লিকাল কিতাবু লা-রইবা ফি “এই কেতাবে কোনো সন্দেহ নাই।” এই গ্রন্থে রসূল (স.)-এর ওপর নবুয়াতের সত্যতা প্রমাণের জন্য যেসব মুজিজা প্রদর্শন করা হয়েছিল তার বিবরণ এসেছে। আর তাছাড়া হাদিসেও বহুবিধ মুজিজার ঘটনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে আজকে যারা ইসলামকে নিয়ে নতুনভাবে চর্চা করছেন তাদেরসহ সকল মুসলমানের অবহিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ মুজিজা সত্য। একশ্রেণির মানুষ নবী-রসূলদের মুজিজা অস্বীকার করে মূলত কুরআন অস্বীকার করে চলেছেন। কারণ মুসলমান সেই, যিনি মহাবিশ্বের বিস্ময় আল কুরআনের প্রত্যেকটি আয়াতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবেন। কুরআনে বলা হয়েছে—যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের একটি আয়াতও অস্বীকার করবে তারা মুসলমান নয়। সুতরাং আজকে যারা রসূলের জীবনে সংঘটিত বিস্ময়কর আশ্চর্যজনক অলৌকিক ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করে চলেছেন তারা কিভাবে মুসলমান থাকেন? আমাদের বুঝতে হবে মুজিজা জিনিসটি কি? এবং কি জন্য এর অবতারণা হয়েছিল? মুজিজা হলো ঐ আশ্চর্যজনক ঘটনা যা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা তার প্রেরিত পয়গম্বরদের ওপর বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রদর্শন করেছেন। রসূল (স.)-এর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে একটি মুজিজা প্রদর্শিত হয়েছিল। তদানীন্তন পৃথিবীর অন্যতম একচ্ছত্র অধীশ্বর ইয়েমেনের বাদশা আবরাহা কাবাঘর ধ্বংস করার জন্য মনস্থ করেছিল। কারণ সে হুবহু কাবার মডেলে ইয়েমেনের ‘সানআতে’ একটি কাবা নির্মাণ করেছিল এবং লোকদের নির্দেশ দিয়েছিল তার কাবায় হজ্ব সম্পাদন করার জন্য। তখন কেউ তো হজ্ব করতে যায়নি, বরং রাতের অন্ধকারে একজন লোক তার কাবায় যেয়ে পায়খানা করে আসে। তাতে সে অগ্নিশর্মা হয়ে পবিত্র কাবাঘর ধ্বংস করার জন্য বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এদিকে তখন কাবার রক্ষণাবেক্ষণকারী রসূলের (স.) দাদা আবদুল মুত্তালিব কাবার গেলাফ ধরে বলেছিলেন, “হে রব্বুল আলামীন! আবরাহার হস্তিবাহিনীর মোকাবিলা করার মতো কোনো শক্তি- সামর্থ্য আমাদের নাই। আপনার এই পবিত্র ঘর আপনিই রক্ষা করবেন।” এরপর নিরাপদ স্থানে সবাই সরে গিয়েছিলেন। আর যখন আবরাহার হস্তিবাহিনী “অদিয়ে মুহাচ্ছার” নামক স্থানে পৌঁছায় তখন আল্লাহতায়ালা— অআরসালা আলাইহিম তয়রান আবাবিল, তারমিহিম বিহিজারতিম মিন ছিজ্জিল, ফাজা অলাহুম কাআছফিম মা’কুল অর্থাত্ “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রেরণ করলেন ঝাঁক ঝাঁক পাখি। যারা নিক্ষেপ করেছিল ছিজ্জিনের বিষাক্ত পাথর। আর তাতে ঐ হস্তিবাহিনী খাওয়া ভুসিতে পরিণত হলো”। এ মুজিজাটি ছিল রসূল (স.)-এর আগমন বার্তাবাহী। আর তাছাড়া রসূল (স.) যখন তাঁর মায়ের গর্ভে তখন মা আমিনা স্বপ্নে দেখেন তাঁর পেট থেকে একটি আলোকরশ্মি বের হয়ে সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত করে ফেলেছে। এ ঘটনা সম্পর্কে মাদানী জীবনের একদিন রসূল (স.) বলছিলেন, “আমি হলাম আমার পিতা (মুসলিম মিল্লাতের পিতা) হযরত ইব্রাহিম (আ.)- এর দোয়া, হযরত ঈসা (আ.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী ও আমার মায়ের সত্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা।” আর জন্মের পরে মুজিজা সম্বলিত অগণিত ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যার ওপর প্রত্যেক মুসলমানের বিশ্বাস রাখা অত্যাবশ্যক। যখন তিনি দুধমাতা হালিমার দুর্বল উটের পিঠে সওয়ার হন তখন এই উট শক্তি ফিরে পায়। যার ফলে হালিমা তাঁর কাফেলার লোকদের পিছে ফেলে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন তাঁর কাফেলার ঐ লোকেরা বলেছিল, হালিমা এটা কি তোমার আগের সেই উট, যা নিয়ে তুমি আমাদের পিছে পিছে অতীব ধীর গতিতে আগমন করেছিলে? হালিমা বললেন, এটা তো আগেরই সেই উট। কিন্তু এই শিশু এমন এক বরকতপূর্ণ যে, তাঁর কারণে আমার দুর্বল উট শক্তি ফিরে পেয়েছে। যখন বনি সাদ গোত্রে তাঁর বাড়ী নিয়ে গেলেন তখনও একই অবস্থা হলো- হালিমার পরিবারে অভাব- অনটন ছিল। শিশু নবীর বরকতে আল্লাহতায়ালা সচ্ছলতা দান করলেন। যখন রসূল (স.) এর বয়স ৪ বছর তখন তিনি পাহাড় ঘেরা মরুভূমির মধ্যে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছিলেন। তখন হঠাত্ আল্লাহর ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) আগমন করলেন। মুহাম্মদ (স.) কে আবিষ্ট করে ফেললেন। তাঁর বুক ফেড়ে রুহটাকে বের করলেন। এর পর আলাদা একটা তসতরিতে রেখে জমজমের পানি দিয়ে ধৌত করে আবার বুকে সংস্থাপন করলেন (একেবারে ওপেন হার্ট সার্জারির মত) যা দেখে তার দুধ বোন সায়মা ও অন্যান্য খেলার সাথীরা হালিমার কাছে দৌড়ে গিয়ে বললেন, আমাদের খেলার সাথী মুহাম্মদকে একজন লোক হত্যা করে ফেলেছে। এই কথা শুনে হালিমা উন্মাদ পাগলিনীর মত দৌঁড়ে আসছিলেন আর বলছিলেন, আমি এখন কি করবো? আমিনাকে কি কৈফিয়ত দেবো? আব্দুল মুতালিবকে কি বুঝ দেবো? এরপর মহাম্মদের কাছে এলেন, দেখলেন, সৌম্য শান্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশে আলামীন বসে আছেন। হালিমা বললেন, মুহাম্মদ! তোমার কি হয়েছে? তিনি বললেন, না আমার কিছু হয়নিতো! এ ঘটনার পর হালিমা মুহাম্মদ (স.)কে নিয়ে মক্কায় আমিনার কাছে চলে এলেন এবং বললেন, আমি মুহাম্মদ (স.)কে নিয়ে শংকিত। আপনি তাকে বুঝে নিন। আমিনা বললেন ভয় করবেন না আপনি আরো কিছুদিন তাকে আপনার সাহচর্যে রাখেন। যার কারণে আরো দুই বছর পরে ছয় বছর বয়সে রসূল (স.) মায়ের কাছে ফিরে আসেন। তারপর মুহাম্মদ (স.) ১২/১৩ বছর বয়সে যখন চাচা আবু তালেবের সঙ্গে সিরিয়া সফরে যান সেখানে মুহাম্মদ (স.) একটি গাছের নিচে ছিলেন। তথায় আখেরী নবীর আগমনের প্রতীক্ষারত পাদরী রাহেব বাহিরা তাকে নবী হিসেবে চিনতে পারেন। কারণ মুহাম্মদ (স.) গাছের ছায়ায় ছিলেন। সূর্য সরে যাওয়ায় যখন তাঁর শরীরে রোদ লাগবে ঠিক তখন ডালটি সরে গিয়ে মুহাম্মদ (স.)কে ছায়াদান করেন। এ ঘটনা কোন নবী রসূলদের ছাড়া হতে পারে না ভেবে এই তাওরাত বিশেষজ্ঞ শিশু নবীর কাছে আসেন। রসূলের চেহারা দেখে অপলক নয়নে মুগ্ধ ভরে দীর্ঘ সময় অবলোকন করছিলেন। এর পরে আবু তালেবকে সাবধান করে বললেন, আমার বিশ্বাস তাওরাত কেতাবে শেষ নবীর যে বিবরণ দেয়া হয়েছে তাতে মুহাম্মদ (স.) এই উম্মতের নবী হবেন। আপনি শিগগিরই তাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে যান। তা না হলে ইহুদীরা জানতে পারলে তার সমূহ-ক্ষতি সাধন করবে। এই ঘটনার পরে একজন ভৃত্যসহ মুহাম্মদ (স.)কে তড়িঘড়ি করে মক্কায় পাঠিয়ে দেন আবু তালেব। এরপর তাঁর যখন বয়স ৪০ বছর ৬ মাস ১২ দিন হয় তখন কুরআন নাজিলের অবতারণা ছিল একটি অন্যতম মুজিজা। তিনি জাবালে নূরের গারে হিরায় অবস্থান করছিলেন। জিব্রাইল (আ.) তাঁর নিজ আকৃতিতে গুহায় আগমন করলেন। বললেন, ইকরা! পড়ুন! রসূল (স.) ছিলেন “উম্মীয়্যিনা নাবিয়্যা” উম্মী নবী, পড়ালেখা জানতেন না। তিনি বললেন, মা আনা বি ক্বারি-আমি পড়তে জানি না। জিব্রাইল (আ.) বুকে চেপে ধরলেন তারপর বললেন, পড়ুন। আগের মতই জবাব দিলেন। জিব্রাইল (আ.) আবারও বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এভাবে ৩ বার করার পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তার জ্ঞান চক্ষু উন্মুক্ত করে দিলেন। তখন সাথে সাথে পড়তে থাকলেন। সূরা আলাকের ১-৫ আয়াত পর্যন্ত। তারপর গোপনে তিন বছর দাওয়াত দিলেন। এরপর প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু করলেন। তখন তার ওপর নির্যাতন চললো। সেসময় একদিন আরবের কাফেরেরা মুহাম্মদ (স.)কে তাচ্ছিল্য করার জন্যই মূলত: বলেছিল মুহাম্মদ, তুমি যদি আকাশের ঐ পূর্ণিমার চন্দ্রটিকে দিখন্ডিত করতে পারো তাহলে আমরা তোমাকে সত্য নবী হিসাবে মেনে নেবো। রসূল (স.) আল্লাহর সাহায্যে মুজিজা প্রদর্শন করলেন। শাহাদত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করামাত্র চাঁদ দিখন্ডিত হয়ে গেল। কুরআনে চাঁদের নামে একটা সূরা আছে। যার নাম সূরা কামার। এর প্রথম আয়াতেই বলা হয়েছে “ইকতারাবাতিস ছায়াতি অন শাক্কাল কামার” অর্থাত্ কেয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে- চন্দ্র দিখন্ডিত হয়ে গেছে। কিন্তু কাফেরেরা বিশ্বাস করলো না। তারা বললো মুহাম্মদ (স.) তুমি যে সত্যিই জাদুকর আজ তার বাস্তব প্রমাণ আমরা পেলাম। ১৯৬৯ সালে রাশিয়ার তিনজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম এই মাটির পৃথিবী থেকে চাঁদের মটিতে পা রাখেন। নীল আর্মস্ট্রং, মাইকেল কলিন্স, এডউইন অল ড্রিল। এদের মধ্যে প্রথমজন চাঁদে ফাটলের চিহ্ন দেখে বিস্ময়েবিমূঢ় হয়ে পড়েন। আর ঐ ফাটলের কারণেই মূলত: জ্যোস্না রাতে চাঁদের দিকে তাকালে মনে হয় যেন চাঁদে একটা বুড়ি বসে রয়েছে। আমাদের সাহিত্য-ছড়া- কবিতায়ে ‘চাঁদের বুড়ি’ শিরোনামে অনেক ছড়া কবিতা রয়েছে। কিন্তু আসলে চাঁদে কোনো বুড়ি থাকে না। এটাও প্রচলিত আছে চাঁদের বুড়ি সূতা কাটে। সেই সূতা নিচে নেমে আসে (বিশেষ করে শরত্কালে আকাশ থেকে অতীব স্বচ্ছ ধবধবে সাদা এক ধরনের সূতা নামে) ওটা মাথায় দিলে টাক মাথায় চুল গজায় ও চুল ঘন হয় বলে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অবান্তর আজগুবি অনভিপ্রেত ঘটনা। নিঃসীম নীলাকাশের দিকে তাকালে কখনো মেঘমালাকে মনে হয় পাহাড়ের মত, হাতির মত, দত্তের মত, মানুষের মত। কিন্তু আসলে ঐগুলো তা নয়। কোন বিশেষ ব্যক্তিকে চাঁদে দেখা যাওয়ার ঘটনাটিও ওরকম একটা অবাঞ্ছিত ভাবাবেগে আল্পুত কল্পনাপ্রসূত ঘটনা। যার মধ্যে সত্যতার লেশমাত্র থাকার কোনো সুযোগ নেই। (চলবে) ই-মেইল: [email protected]