ভাষা আন্দোলন গণঅভ্যুত্থান মুক্তি সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের লড়াকু সৈনিক

আপডেট : ২১ মার্চ ২০১৩, ২২:৫৬
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০০৮-এ পুনরায় গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রতিটি অধ্যায়ে মোঃ জিল্লুর রহমানের ছিল সগর্ব উচ্চারণ। ইতিহাসের সবগুলো অধ্যায়ে তিনি ছিলেন অগ্রনায়ক। জাতির অভিভাবকতুল্য মহান সিপাহসালার। স্কুলজীবনে রাজনীতিতে হাতেখড়ি, এরপর একজন কর্মী থেকে রাজনীতির পথচলায় দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের প্রারম্ভে তিনি বলেছিলেন, একজন সাধারণ কর্মী থেকে তিনি আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে মনোনীত হয়েছেন। তাঁর এই উঠে আসা এদেশের গণমানুষের আকাঙ্ক্ষারই রূপায়ন। এ পদে আসীন হবেন কখনোই ভাবেননি তিনি। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে এ দায়িত্বে এনেছে। তিনি ছিলেন সর্বস্তরের মানুষের সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, নিরহঙ্কারী, সদালাপী, অমায়িক, বন্ধুবত্সল, উদারমনা রাজনীতিক। কাউকে আক্রমণ করা, অশালীন শব্দচয়ন কিংবা বিভেদ বিসংবাদের রাজনীতি তিনি করেননি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত জনপ্রিয়, গণমানুষের ভালবাসার প্রতীক। মোঃ জিল্লুর রহমান একটি সংগ্রামমুখর জীবনের নাম। গণতন্ত্রের লড়াকু সৈনিক জিল্লুর রহমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে আজীবন অবিচল ও অকুতোভয় ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর জিল্লুর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ছিলেন পুরোদস্তুর রাজনীতিক। তাঁর মৃত্যুতে জাতি শুধু একজন রাষ্ট্রপতিই হারায়নি, হারিয়েছে একজন অভিভাবক। যে পদটি তিনি শূন্য করে জাতিকে গভীর শোকে ভাসিয়ে দিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন, সে পদটি পূর্ণ হলেও অভিভাবকত্বের আসনটি কখনোই পূরণ হবার নয়। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি দলের দীর্ঘকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান ছিলেন একজন খাঁটি গণমানুষের নেতা। বঙ্গবন্ধুর পর সর্বোচ্চ পাঁচবার দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার সময় দলের সভাপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় এএইচএম কামারুজ্জামান দলের সভাপতির দায়িত্ব পান। তখনো জিল্লুর রহমান পান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। একই বছর আওয়ামী লীগের কমিটি পুনর্গঠন হলে তৃতীয় দফায় দলের সাধারণ সম্পাদক হন জিল্লুর রহমান। ১৯২৯ সালের ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোঃ জিল্লুর রহমান। তাঁর পিতা মেহের আলী মিঞা ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং তত্কালীন ময়মনসিংহ লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান ও জেলা বোর্ডের সদস্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই তৃণমূলে দলের স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। জিল্লুর রহমান এমএনএসহ ছয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বাকশালের প্রথম সম্পাদকসহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন পাঁচবার। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পর শেখ হাসিনা গ্রেফতারের সময় জিল্লুর রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় জিল্লুর রহমান তাঁর স্ত্রী, মহিলা আওয়ামী লীগের তত্কালীন সভানেত্রী আইভি রহমানকে হারান। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনসহ ’৭৩, ’৮৬, ’৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর-ভৈরব আসন থেকে জিল্লুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। তিনি ময়মনসিংহ জেলা শহরে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৯৪৫ সালে ভৈরব কেবি হাইস্কুল থেকে মেট্রিক, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্সসহ এমএ এবং এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। জিল্লুর রহমান ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ১৯৫২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এক ছাত্র সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন তিনি। সেখানেই ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের পুকুরপাড়ে যে ১১ জন নেতার নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেখানে জিল্লুর রহমান অন্যতম নেতা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। একইসঙ্গে তাঁর মাস্টার্স ডিগ্রিও কেড়ে নেয়া হয়। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর মাস্টার্স ডিগ্রি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। জিল্লুর রহমান ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পরিচালনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। ষাটের দশকে ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৪৬ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র থাকাকালে সিলেটে গণভোটের কাজ করার সময় জিল্লুর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে অংশগ্রহণ করেন তিনি। জিল্লুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনা এবং ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তত্কালীন দখলদার পাকিস্তান সরকার তাঁর জাতীয় পরিষদ সদস্যপদ বাতিল করে ২০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান ও সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) প্রথম সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা হত্যার পর একটানা প্রায় চার বছর তিনি কারাবন্দি ছিলেন। আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি আবারও এ দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালে আবারও কারাবরণ করেন তিনি। ১৯৯২ এবং ১৯৯৭ সালের দলীয় কাউন্সিলেও জিল্লুর রহমান পর পর দুইবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০২ সালের কাউন্সিলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হিসাবে সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেন। ১৯৯৬ সালে তিনি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি সংসদ উপনেতা হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইন জারির পর ওই বছরের ১৬ জুলাই রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতার হলে জিল্লুর রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দল পরিচালনা করেন। দীর্ঘ ১১ মাস শেখ হাসিনার জেলজীবন এবং চিকিত্সার জন্য আরও প্রায় ৬ মাস দেশের বাইরে অবস্থানকালে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবে তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল অবদান রাখেন তিনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট অবিস্মরণীয় বিজয় লাভ করে। এ নির্বাচনে তিনি ষষ্ঠবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী বিশিষ্ট নারীনেত্রী বেগম আইভি রহমান ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভানেত্রী এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার সাবেক চেয়ারপারসন আইভি রহমান গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন। পারিবারিক জীবনে জিল্লুর রহমান এক ছেলে এবং দুই মেয়ের জনক। তার ছেলে নাজমুল হাসান পাপন বর্তমান সংসদের নির্বাচিত সদস্য এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।