প্রাকৃতিক মত্স্যসম্পদের আধার শ্রীমঙ্গলের হাইলহাওরে নির্বিচারে মত্স্যখামার তৈরির ফলে হাইলহাওরের ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন হয়ে প্লাবনভূমির মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই বিধ্বংসী তত্পরতার ফলে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশি প্রজাতির মাছের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। একইসাথে বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক জলজ সম্পদ এবং ধ্বংস হচ্ছে অনেক জীববৈচিত্র্য। গত প্রায় দেড় দশকে মৌলভীবাজার সদর উপজেলাধীন নাজিরাবাদ, সিকরাইল এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলাধীন মির্জাপুর, ভূনবীর, হাজীপুর, বরুনা, ভাড়াউড়া প্রভৃতি এলাকায় একক বা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এসব খামার। একেকটি ১৫/২০ বিঘা থেকে ৫/৬ শ’ বিঘা পর্যন্ত আয়তনের এসব খামারের সংখ্যা শতাধিক। অভিজ্ঞ মহলের মতে হাওরের গা ঘেঁষে এমনকি হাওরের অভ্যন্তরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাছের খামার তৈরির এই ধারা অব্যাহত থাকলে মত্স্য সম্পদের প্রাকৃতিক বিকাশের এই উত্সটি অচিরেই বিপন্ন হয়ে পড়বে। মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার আংশিক এলাকায় বিস্তৃত হাইলহাওরে শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় থাকে সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর। বর্ষা মৌসুমে তা সাড়ে ১৪ হাজার হেক্টর প্লাবন এলাকায় রূপান্তরিত হয়। এখানে বিভিন্ন আয়তনের বিলের সংখ্যা ১৩১টি। প্লাবনভূমিতে মত্স্যসম্পদের প্রাকৃতিক বিস্তারের উদ্দেশ্যে ২০০৩ সালে হাইলহাওরে সরকারি উদ্যোগে তৈরি করা হয় দেশের প্রথম ‘বাইক্যাবিল মত্স্য অভয়াশ্রম’। অভয়াশ্রমে মাছের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে প্লাবনভূমি তথা সমগ্র হাওরে মাছের বিস্তৃতি ঘটানো ছিল মত্স্য অভয়াশ্রম তৈরির মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ক্ষয়িষ্ণু মত্স্যসম্পদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগটি মত্স্যখামার তৈরির হুজুগে পড়ে বহুলাংশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় মত্স্যবিভাগ এবং হাইলহাওরের মত্স্যসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প ‘মাচ’ ও ‘আইপেক’-এর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিমত, খামারে পদ্ধতিগতভাবে মাছ চাষ করে গুটিকয়েক ব্যক্তি স্বল্পমেয়াদে লাভবান হলেও হাইলহাওরের প্লাবনভূমির এলাকা সংকুচিত করে ফেলার কারণে সকল প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার ও বিচরণক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়েছে। অভিযোগে জানা যায়, প্লাবনভূমি হাইলহাওরের বিলগুলোতে পর্যন্ত পুকুর খনন ও বাঁধ দিয়ে মাছের খামার তৈরি করা হচ্ছে। সরকার থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে একশ্রেণীর মত্স্যজীবী প্রভাবশালীদের নিকট বিলের জমি বিক্রি করে দিচ্ছে এবং তারা সেখানে পুকুর-দীঘি খনন ও বাঁধ দিয়ে মত্স্যখামার তৈরি করছে।
