রাজনৈতিক কারণে নয়, পারিবারিক কারণেই ঢাকার ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মজুমদারকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে। রফিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার জন্য এটা করেছেন তারই নিকট আত্মীয়রা। সম্প্রতি র্যাবের এক তদন্ত রিপোর্টে এমন দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রফিককে অপহরণ ও হত্যায় তার শাশুড়ি, দ্বিতীয় স্ত্রী, স্ত্রীর বড় বোন ও তার স্বামী, স্থানীয় চরমপন্থি সংগঠনের এক সদস্য ও এক দোকানদার জড়িত। গত ৫ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মনোহরপুর গ্রামের খালের পাশ থেকে হ্যান্ডকাপ পরা অবস্থায় রফিকুল ইসলাম মজুমদারের লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ উঠে, র্যাব রাজনৈতিক কারণে রফিককে ঝিনাইদহের আনন্দনগরের শ্বশুরবাড়ি থেকে অপহরণ করে হত্যা করেছে। শুধু তাই নয়, হত্যার পর বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহের জন্য র্যাব মরদেহের হাতে পুলিশের হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দেয়। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনাটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত শেষে সম্প্রতি রিপোর্ট চূড়ান্ত করে র্যাব ।
তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, গুলিস্তানে মহানগর কমপ্লেক্সে ছিল রফিকের মূল ব্যবসা। এই মার্কেটের মালিকানা ও দখল নিয়ে রফিকের সঙ্গে প্রতিপক্ষ গ্রুপের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর আগে মার্কেটের দখল নিয়ে রফিক গ্রুপের হাতে প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওয়াজিউল্ল্যাহ নামে এক ব্যবসায়ী গুম হন। ওয়ান ইলেভেনের সময় রফিক ৫টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়ে জেলে যান। এরপরই তার সঙ্গে প্রথম স্ত্রী রুজিনা ইসলামের বিচ্ছেদ ঘটে। রুজিনা কানাডা চলে গেলে প্রথম স্ত্রীর ৪ সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রফিক।
২০১০ সালে রফিক ঝিনাইদহের আয়শা সিদ্দিকা ঝরাকে বিয়ে করেন। ঝরার পরিবারের সঙ্গে ঝিনাইদহের চরমপন্থি সংগঠনগুলোর যোগযোগ রয়েছে। এর আগে ঝরা ঝিনাইদহে চরমপন্থি সংগঠন বিশেষ করে জাসদ গণবাহিনীর মহিলা দলের হয়ে কাজ করতেন। বিয়ের পর রফিক প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচ করে ঝিনাইদহের আনন্দনগরে শ্বশুরালয়ে পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেন। এতে তার সম্পত্তি ও অর্থবিত্তের ওপর চোখ পড়ে শ্বশুরবাড়ির লোকদের। ঢাকা থেকে মাঝে-মধ্যেই রফিক আনন্দনগরে রাত কাটাতেন। ঘটনার দিন রফিক সাভার থেকে মাইক্রোবাসে ঝিনাইদহের উদ্দেশে রওনা দেন। ঐ সময় মাইক্রোবাসে তার সঙ্গে স্ত্রীর বড় বোন ও তার স্বামী ছিলেন।
তদন্ত রিপোর্টে আরো বলা হয়, রফিকের সঙ্গে তার শাশুড়ির দ্বন্দ্ব শুরু হয় আনন্দনগরে একটি চরমপন্থি সংগঠনের নৈশকালীন পার্টিতে। সেখানে রফিকের সঙ্গে দুই তরুণীর অনৈতিক সম্পর্ক দেখে শাশুড়ি তাকে সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে মেয়ের সঙ্গে আলাপ করে চরমপন্থি সংগঠনের জনৈক কালুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কালু কলকাতায় অবস্থান করায় তার সহযোগী মহব্বতকে ভাড়া করেন মা-মেয়ে।
মহব্বতের ব্যাপারে তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, মহব্বত এক সময় চরমপন্থি সংগঠন জাসদ গণবাহিনীর সদস্য হিসাবে কুষ্টিয়া এলাকায় সক্রিয় ছিল। এই খুনের আগে মহব্বত র্যাবের নাম ব্যবহার করে। তার কাছে আগে থেকেই পুলিশের হ্যান্ডকাপ ছিল। র্যাবের জ্যাকেটগুলো সে কুষ্টিয়ার একটি টেইলার্স থেকে বানায়। ঘটনার দিন রাতে র্যাবের পরিচয় দিয়ে আনন্দনগরের বাসা থেকে রফিককে উঠিয়ে নিয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে দেয় মহব্বত।
স্থানীয় দোকানদার রানা সম্পর্কে তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, রানা সব সময় রফিকুলের শাশুড়ির পরিবারকে সহায়তা করতো। ঘটনার সময় রানা ঢাকা থেকে যাওয়া রফিকের গাড়ির চালক আক্কাসকে মিথ্যা অজুহাতে সরিয়ে পাশের একটি বাজারে নিয়ে যায়। এই হত্যার পর রানাকে রফিকের শাশুড়ি ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে রফিক খুনের ঘটনায় ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানায় দায়ের করা মামলার বাদী রফিকের ভাই মফিজুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের র্যাব বা পুলিশের বিরুদ্ধে কথা না বলার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জুবায়ের জানান, মামলার তদন্তে এখনও তেমন অগ্রগতি হয়নি। এ পর্যন্ত শুধু রফিকুলের মামা জাহাঙ্গীর আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
