অন্তিম শয়ানে রাষ্ট্রপতি

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৩, ২২:২৭
চিরনিদ্রায় শায়িত ভাষা সৈনিক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৩টা ৫৬ মিনিটে বনানী কবরস্থানে স্ত্রী আইভী রহমানের কবরেই তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। সকালে জন্মভূমি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে প্রথম জানাজা এবং বাদ জুমা ঢাকার জাতীয় ঈদগাহে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। উভয় জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। রাষ্ট্রপতির দাফন অনুষ্ঠানকে ঘিরে বনানীর কবরস্থান এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আজ শনিবার বিকাল ৪টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ৩-৩০ মিনিট। জাতীয় পতাকা মোড়ানো রাষ্ট্রপতির কফিনবাহী ফুল দিয়ে সজ্জিত সেনাবাহিনীর পিকআপ বনানী কবরস্থানে পৌঁছে। পরে মেজর জেনারেল বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার দশজন সশস্ত্রবাহিনী কর্মকর্তা কফিনটি পিক-আপ থেকে নামিয়ে কাঁধে বহন করে কবরের পাশে নিয়ে যান। এ সময় তিন বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল প্রয়াত রাষ্ট্রপতির প্রতি সশস্ত্র সালাম জানান। এরপর রাষ্ট্রপতির সংক্ষিপ্ত জীবনী পড়ে শোনান একজন সেনা কর্মকর্তা। মরদেহ কবরে নামানোর আগে দুই মিনিট নীরবতা পালন শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মোঃ জিল্লুর রহমানকে সশস্ত্র স্যালুট জানানো হয়। বিকাল ৩-৫৬ মিনিটে রাষ্ট্রপতির পুত্র নাজমুল হাসান পাপনসহ পরিবারের তিন সদস্য মরদেহ কবরে নামান। এ সময় সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ দল ২১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপতির প্রতি গান স্যালুট প্রদান করে। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর সেনাবাহিনীর প্যারেড দল তিনবার শূন্যে গুলি ছুঁড়ে (ভলি ফায়ার স্যালুট) রাষ্ট্রপতির প্রতি স্যালুট জানায়। দাফনশেষে প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এডভোকেট এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন রাষ্ট্রপতির কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল মুহাম্মদ ফরিদ হাবিব, বিমানবাহিনীর প্রধানের পক্ষে সহকারী বিমানবাহিনী প্রধান, কূটনৈতিক কোরের ডিন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, ডেপুটি স্পিকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং মিয়ানমার ও জাপানের রাষ্ট্রদূতের পক্ষে জিল্লুর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনশেষে প্রেসিডেন্টের গার্ড রেজিমেন্টের একটি কন্টিনজেন্ট রাষ্ট্রপতির প্রতি মরণোত্তর সালাম জানায়। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে উঠে। রাষ্ট্রপতির প্রতি সশস্ত্রবাহিনীর স্যালুটের পর মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। সবশেষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এডভোকেট রাষ্ট্রীয় সম্মানের স্বীকৃতি হিসাবে জিল্লুর রহমানের স্বজনদের কাছে জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করেন। দাফনের আগে বাদ জুমা জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতির দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজনৈতিক দলসমূহের অগণিত নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ অংশ নেন। জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ছাপিয়ে উত্তরে কাকরাইল মসজিদ, দক্ষিণে শিক্ষাভবন আর পূর্বে তোপখানা রোড পেরিয়ে পল্টন মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো এ জনস্রোত। মূলত সকাল দশটার পর থেকেই ঈদগাহ ময়দানের দিকে আসতে থাকেন রাজধানীবাসী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর, টিএসসি, জাতীয় প্রেসক্লাব, এলাকাগুলোতে জড়ো হতে থাকেন তারা। এদিন আশপাশের মসজিদগুলোতে জুমার নামাজ আদায় করেন তারা। তবে শুধু রাজধানীবাসী নয় ঢাকার বাইরে থেকেও লোকজন শরিক হয়েছিলেন জানাজায়। জুমার নামাজশেষে জাতীয় ঈদগাহে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু দ্বিতীয় জানাজার আনুষ্ঠানিকতা। তখনো আসেনি মরদেহ। ১-৩৬ মিনিটে ক্বারী মাসউদুর রহমান কোরআন তেলাওয়াত করেন। এরপর বয়ান শুরু করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফতি মাওলানা ওয়ালিউর রহমান খান। ততক্ষণে লোকারণ্য হয়ে যায় গোটা এলাকা। বেলা আড়াইটার দিকে জানাজা শুরু হয়। এতে অংশ নেন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হক, এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, রফিকুল ইসলাম মিয়া, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, আব্দুল্লাহ আল নোমান, ড. উসমান ফারুক, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, জাতীয় পার্টির (জেপি) মফিজুল হক বেবু, এজাজ আহমেদ মুক্তা, সাদেক সিদ্দিকী, শেখ মো. জয়নাল আবেদীন, আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদ, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সদস্য সচিব আমিনুল ইসলাম তপন প্রমুখ। জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের দ্বিতীয় জানাজার আগে সমবেত লাখো মানুষের উদ্দেশে কথা বলেন তার ছেলে বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন এমপি। তিনি বলেন, তিনি মানুষকে ভালোবেসে গেছেন। কখনো কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি। আজ আপনারা যে ভালোবাসা ও দোয়া করেছেন সেজন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। মৃত্যুর আগে তিনি জেনে গেছেন সারাদেশের মসজিদে দোয়া, মন্দির, গির্জায় তার জন্য প্রার্থনা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, কারো কাছে তার কোনো দেনা-পাওনা থাকলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আল্লাহতায়ালা যেন তাকে বেহেশ্ত নসিব করেন। এ সময় তিনি আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে আরো বলেন, আমার এমনই কপাল আল্লাহ দিয়েছেন, এই হাত দিয়েই আমি আমার মাকে কবর দিয়েছি, এখন বাবাকে কবর দিতে হচ্ছে। একথা বলেই তিনি কেঁদে ওঠেন। জানাজাশেষে পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল জিল্লুর রহমানকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। পরে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনটি ফুল দিয়ে সাজানো সেনাবাহিনীর একটি পিক-আপ ভ্যানে করে বেলা ২-৫৮ মিনিটে নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানস্থ রাষ্ট্রপতির প্রিয় বাসভবন ‘আইভিস লিগ্যাসি’তে। কফিনের সঙ্গে ছিলেন রাষ্ট্রপতির পুত্র নাজমুল হাসান পাপন এমপি। আইভিস লিগ্যাসি’র ছয়তলা ভবনের নিচে কফিনটি ৮ মিনিট রাখা হয়। এ সময় প্রয়াত রাষ্ট্রপতির আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীরা কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে কফিনবাহী সেনাবাহিনীর মোটরযানটি বনানী কবরস্থানের দিকে রওয়ানা হয়। বঙ্গভবনে বিদেশি অতিথিদের শ্রদ্ধা নিবেদন গতকাল সকালে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে হাজী আসমত কলেজ মাঠে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজার পর দুপুরে রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে আসা হয় বঙ্গভবনে। আগেরদিনের মতোই বঙ্গভবনের দরবার হলে লাল গিলাফের নীচে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে রাখা হয় রাষ্ট্রপতির সাদা কফিন। সেখানে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানের কফিনে বিভিন্ন বন্ধু দেশের প্রতিনিধি, কূটনীতিক ও বিদেশি অতিথিরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। মালয়েশিয়ার সিনেটের প্রেসিডেন্ট তানশ্রি আবু জাহের, ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ফারুক আব্দুল্লাহ, শ্রীলঙ্কার নগর উন্নয়ন মন্ত্রী এএইচএম ফওজি, তুরস্কের শ্রম ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী ফারুক সেলিক, সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ম্যাসাগোস জুলকিফলি এবং মালদ্বীপের ধর্মমন্ত্রী শাহিম আলী সাঈদসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের পক্ষে একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় রাষ্ট্রপতির কফিনে। বেলা ১২-৪০ মিনিটে শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হওয়ার আগেই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এডভোকেট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা বঙ্গভবনে পৌঁছেন। বিদেশি অতিথিরা রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় পৌঁছেছেন। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে এখনো শোকবার্তা আসছে।