দেশে চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্ডার হারাচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বিদেশি ক্রেতা (বায়ার) তাদের বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছেন। অনেক বায়ার অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন। এসব অর্ডার চলে যাচ্ছে প্রতিবেশী মিয়ানমারসহ কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্রেতারা বাংলাদেশ বিমুখ হচ্ছেন। এই আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। সাময়িক সময়ে এর প্রভাব দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে। বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রীট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের জন্য বিকল্প দেশগুলোর কথা ভাবছে। যেখানে তারা চীনের চেয়ে কম দামে পণ্য উত্পাদন করতে পারবে। প্রতিবেদনে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান টেসকো’র প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোফ রাসেল-এর বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ব্যবসায়ের জন্য ভালো স্থান ছিলো, কিন্তু আমাদেরকে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।’ এছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ভিএফ কর্পোরেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভীট গাইস জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া শুরু করেছেন।
তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ আগুনে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনার পর বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বিশ্বে প্রচার পায়। এর পরপরই দেশের সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। ওয়ালমার্টের মতো নামকরা বড় বড় আমদানিকারকরা বাংলাদেশে তাদের অর্ডার কমিয়ে ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে বলে সমপ্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।
তৈরি পোশাক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএসহ ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা রোধে বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আহ্বান জানিয়ে আসছেন। নয়তো ব্যবসায়ীরা নিজেদের রক্ষায় কর্মসূচি দেবেন বলে জানিয়েছেন।
চীন, দক্ষিণ আমেরিকার একাধিক দেশ, দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে চলমান সহিংসতায় তাদের সফর বাতিল করেছে। তৈরি পোশাক উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, মার্চ-এপ্রিল মাসে বায়াররা বড় পরিমাণে অর্ডার দেয়। কিন্তু চলমান সহিংস ঘটনায় তারা এখানে না এসে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এসব বায়ারদের আর পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এদিকে সামপ্রতিক হরতাল আর হানাহানির ঘটনায় বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট বাংলাদেশে তাদের অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বের হয়। ক্রমশ বাংলাদেশে তাদের ক্রয় আদেশ কমিয়ে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামে নিয়ে যাচ্ছে বলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক উইমেন্স উইয়ার ডেইলিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান রাইটস-এর নির্বাহী পরিচালক চার্লস কারনেগহ্যাম-এর বরাত দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রতি তাদের আস্থা নড়বড়ে হওয়ায় তুলনামূলক বেশি শ্রম মজুরির দেশ কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে চলে যাচ্ছে ওয়ালমার্ট। বাংলাদেশে মজুরি বিশ্বে সর্বনিম্ন। এখানে শ্রমিকরা ঘন্টা প্রতি ১৮ থেকে ২৬ মার্কিন সেন্ট পায়। অথচ চীনে এই হার এক ডলার ৩৪ সেন্ট। কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে ঘন্টা প্রতি মজুরি যথাক্রমে ২৯ ও ৫৫ সেন্ট। এতে ওয়ালমার্টের খরচ কিছুটা বাড়লেও সেখানে তারা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অবকাঠামো সুবিধা পাবে।
ওয়াল স্ট্রীট জার্নালের প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, টেসকো কর্পোরেশন পূর্বে ৮০ শতাংশ পণ্য চীন থেকে সংগ্রহ করলেও বর্তমানে তা ৬০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। আমদানির বড় অংশ বাংলাদেশে চলে আসার সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে টেসকো নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। টেসকো’র প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টোফ রাসেল বলেন, এর জন্য বাংলাদেশের কারখানাগুলো দায়ী নয়, দায়ী বর্তমান পরিস্থিতি। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি তুরস্ক, পূর্ব ইউরোপ এবং আফ্রিকার প্রতি ঝুঁকছে।
রপ্তানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও গার্মেন্টস উদ্যোক্তা আব্দুস সালাম মুর্শেদী জানান, সমপ্রতি দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও হরতালের কারণে শেষ পর্যন্ত তারা সেই সফর বাতিল করেছে। এর ফলে বড় একটি ক্রয়াদেশ তারা ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, শুধু তিনি নন, এ রকম শত শত উদ্যোক্তা সামপ্রতিক সময়ে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুধু পোশাক খাতে নয়, ইলেক্ট্রনিক খাতে বড় বিনিয়োগের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের সাথে একটি নির্ধারিত সভা বাতিল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একাধিক পোশাক উদ্যোক্তার সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সামপ্রতিক হরতালে তাদের উত্পাদন কমে গেছে। গার্মেন্টস খাত হরতালের আওতামুক্ত। তবুও উত্পাদন কমার ব্যাপারে তারা বলেন, পোশাক উত্পাদনের ক্ষেত্রে বন্দর থেকে কাঁচামাল আনাসহ অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয়। এ সব কিছু সঠিক সময়ে যোগান দিতে পারলে কারখানায় পোশাক তৈরি করা সম্ভব। অন্যান্য সময়ের হরতালে রাতে অতিরিক্ত কাজের মাধ্যমে তা পুষিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে হরতাল অনেক বেশি হিংসাত্মক হওয়ায় রাতে পণ্য বা কাঁচামাল পরিবহন করা যাচ্ছে না। ফলে উত্পাদন আর স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না।
এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে আব্দুস সালাম মুর্শেদী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সামপ্রতিক ঘটনা প্রবাহের কারণে ৮০ শতাংশ বিদেশি ক্রেতা অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন। ক্রেতারা ক্ষেত্র বিশেষে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অর্ডার কর্তন করেছেন। এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এক মাসে ১০ দিন হরতাল হলে স্বাভাবিক কারণে উত্পাদন কমে যাবে। ফলে যথাসময়ে জাহাজীকরণ সম্ভব হবে না। ফলে বায়ার তার নিজের ও সরবরাহকারীর নিরাপত্তার জন্যই অর্ডার কমাচ্ছেন। এসব অর্ডার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার চলে যাচ্ছে।
‘প্রতিদিনের হরতালে ক্ষতি ২ হাজার কোটি টাকা’
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বলেছে, প্রতিদিনের হরতালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর মধ্যে ৩৬০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতে। একদিন হরতাল হলে শিল্প-বাণিজ্যের তিন দিন বন্ধ থাকার সমান ক্ষতি হয়। অর্থাত্ প্রতিদিনের হরতাল অবরোধে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে জিডিপি’র প্রায় দশমিক ১২ শতাংশ। শিল্পের চাকা বন্ধ হয়ে গেলে দেশে কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে বলে সংগঠনটির সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ আশংকা প্রকাশ করেছেন।
ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাথায় হাত
উদ্যোক্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সামপ্রতিক সময়ে হরতালের কারণে অনেক উদ্যোক্তা সময়মত উত্পাদিত পণ্য জাহাজীকরণের জন্য বন্দরে পাঠাতে পারেন নি। ফলে এসব অর্ডার বাতিল হয়েছে। এসব পণ্য স্টক লটে পরিণত হবে। আবার অনেকে লোকসান কমাতে ১০ গুণ বেশি খরচ দিয়ে বিমানে পাঠাচ্ছেন। বর্তমানে বিমানবন্দরে ট্রাকে ট্রাকে পণ্য গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া হরতালের সময়ে ১০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া ৩০ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
সালাম মুর্শেদী বলেন, বড় উদ্যোক্তাদের পক্ষে এই লোকসান বহন করা সম্ভব হলেও ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবেন না।
