যে নারী গয়না গড়ে

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ১৮:৩৭
নারীকে শ্বশুরবাড়ি থেকে যত বেশি গয়না দেবে আত্মীয়েরা বলবে মেয়ের ভাগ্য তত ভাল। আর বাবা-মা যদি মেয়েকে প্রাণ ভরে গয়না না দিতে পারে তাহলে যে মেয়ের ভাগ্যে কি ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে তা তো আমরা নিয়মিত পত্রিকার পাতায়, টিভির পর্দায় দেখছি। তবে নারী কি শুধু গয়না পরায় মনোযোগী হয় না তা মোটেই নয়। ইসমাত আরা সেই ব্যতিক্রমী নারীদের একজন। ...প্রথম কাজের অফার দিলেন বড় বোন। আর কি চাই! বিপুল উত্সাহে গয়না বানিয়ে ইসমাত তার হাতে দিলেন...। মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক নারী, আর গয়না পরে না এ কথা হাল ফ্যাশনের যুগে কেউ কেউ বিশ্বাস করলেও এক সময় গয়নাবিহীন নারী কল্পনা করাই যেত না। নবজাতক পরিবারে জন্ম নেবার আগেই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা তার জন্য গলার সোনার হার, পায়ের নূপুর বানিয়ে রাখে। গয়না না হলে যেন নবজাতককে বরণ করাই হয় না। আশীর্বাদটি জমে উঠে না। বিয়েতে যে নারীকে শ্বশুরবাড়ি থেকে যত বেশি গয়না দেবে আত্মীয়েরা বলবে মেয়ের ভাগ্য তত ভাল। আর বাবা-মা যদি মেয়েকে প্রাণ ভরে গয়না না দিতে পারে তাহলে যে মেয়ের ভাগ্যে কি ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে তা তো আমরা নিয়মিত পত্রিকার পাতায়, টিভির পর্দায় দেখছি। তবে নারী কি শুধু গয়না পরায় মনোযোগী হয় না তা মোটেই নয়। ইসমাত আরা সেই ব্যতিক্রমী নারীদের একজন। যিনি শুধু নিজে গয়না পরেন না, নিজের হাতে গয়না বানান। গয়নার কারিগর এই নারী থাকেন পুরনো ঢাকার হোসেনী দালান এলাকায়। সমপ্রতি শোনালেন তার গয়নার কারিগর হয়ে উঠার গল্প। ইসমাত আরা জানালেন, তিনি খুব ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছেন। বড় হয়েছেন বড় বোনের লালবাগের বাড়িতে। মা-বাবা হারা এই মেয়েকে কে বিয়ে করবে! এই নিয়ে ছিল পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরক্তি। ইসমাতের বড় বোন আনোয়ারা বেগম মুখে কিছু বলতেন না। বাড়ির অন্যদের হাত থেকে বোনকে আগলে রাখার চেষ্টা করতেন। তিনিই সুযোগ করে দেন পড়াশোনার। বোনের বাড়িতে থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দেন ইসমাত। এরপর ঘরে বসে থাকা ছাড়া কোন কাজ নেই। কিছু না করতে পারলে তো ইসমাতের মন ভাল থাকে না। পরে প্রতিবেশী সীমা আপার সহায়তায় সুযোগ আসে বিসিকে ট্রেনিং নেবার। বড়বোনকে জানাতেই তিনি রাজি হয়ে যান। কোন কিছু শিখে যদি ছোট বোন আয় করে তো ক্ষতি কি! কিন্তু তখনও ইসমাত বা তার বোন কেউই জানতেন না ট্রেনিংয়ে ইসমাত কি শিখবেন। প্রশিক্ষণ সেন্টারে গিয়ে ইসমাতের বিসিকের অনেক উপকরণের মধ্যে সিরামিক দিয়ে গয়না বানানোর কৌশলটি পছন্দ হয়ে যায়। তিনি প্রশিক্ষককে বলেন, এই প্রশিক্ষণটাই নিতে চাই। ট্রেইনারও রাজি হলেন। নারীরাতো সবসময় গয়না পরে, এবার তারা গয়না বানাতে শিখুক। শুরু হয় ইসমাতের প্রশিক্ষণ: ‘যখন প্রথম প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করি কি যে কষ্ট হতো। ওহ্, প্রশিক্ষণ নেয়া খুব কষ্ট। খুব পরিশ্রম। প্রতিদিন ফেরার পর মনে হতো নাহ্ আর নয়, আর শিখবো না। কিন্তু সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মন উসখুস করত। আজ হয়ত ভাল লাগবে’, বলেন ইসমাত। প্রথমে সিরামিক পাউডার দিয়ে ফুলদানী, ফুলসহ ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র বানানো শেখেন। পরে মনে হয় সব মেয়েরাইতো গয়না পরে। সবাই কিনে পরে। আমি যদি নিজেই নিজের গয়না বানাই কেমন হবে! প্রথম যখন গয়না বানালেন নিজের কাছে নিজেরই খুব পছন্দ হয়ে গেল। প্রথমে বানালেন কানের গয়না, এরপর হাতের ও গলার। ইসমাত বলেন, ‘প্রথম যেদিন পরলাম এত ভালো লেগেছিল আপনাদের বলে বোঝাতে পারব না।’ শুরু হলো পথচলা: গয়না দেখে প্রথম কাজের অফার দিলেন বড় বোন। আর কি চাই! বিপুল উত্সাহে গয়না বানিয়ে ইসমাত তার হাতে দিলেন। বোন খুশি হয়ে হাতে তুলে দিলেন টাকা। ইসমাতের উত্সাহ আরও বেড়ে গেল। শুরু করলেন অন্যের জন্য গয়না বানানো। এই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন স্বামী সাংবাদিক আব্দুল লতিফ রানা। তিনি তার সহকর্মীদের ইসমাতের গয়না দেখালেন। সুন্দর রঙিন বিভিন্ন ডিজাইনে করা এই গয়না দেখে অনেকেই পছন্দ করলেন। কিনে ফেললেন তখনই। অনেকে ওর্ডারও দিলেন। শুরু হলো ইসমাতের ব্যবসায়িক জীবনের পথচলা। এখন ইসমাত নিয়মিত গয়না বানাচ্ছেন। ঢাকা শহরের পাশাপাশি সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকেও আসছে তার অর্ডার। যেভাবে তৈরি হয় এই গয়না: সিরামিকের পাউডার রুটির আটার মতো বানিয়ে রাতে রেখে দেন। সকালে সেই আটা হাতের আঙুলে সামান্য পরিমাণে নিয়ে পেপসির বোতলের মুখে আলতো করে লাগিয়ে তৈরি করেন আঁক। এরপর হাতের ভাঁজে তৈরি করেন ফুলের পাঁপড়ি। বেলি, শাপলা, গোলাপ, টিউলিপ বিভিন্ন ধরনের ফুলের সাথে প্রয়োজনমতো পাতা, ডাল, আর রিং ও বল লাগিয়ে তৈরি করেন সুন্দর ডিজাইনের কানের দুল, নেকলেস, হাতের বেসলেট, বালা, আংটি এবং গলার মালা। এই কাজ সম্পূর্ণ হাতে করতে হয়। নেই কোন মেশিনের ঝামেলা। নিজের ঘরেই নিপুণ হাতে তৈরি করে যাচ্ছেন নানা রঙের ও বর্ণের গয়না। সাফল্য যখন হাতে: এখন ইসমাতের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো গয়না বানানো। তিনি সকালে রাতে দুপুরে যখনই সময় পান গয়না তৈরি করেন। নিয়মিত অর্ডার পাচ্ছেন। আর তাই তিনি বেশ খুশি। ‘আমিও এখন স্বামীর মতো আয় করি। আমার ঘরের অনেকগুলো আসবাব নিজের টাকায় কিনেছি। আমার খুবই ভাল লাগে। সংসারের আয় হয় বলে স্বামীও অনেক উত্সাহ দেন। আমার মনে হয় সব মেয়েরই উচিত সুযোগ পেলে কোন না কোন উপায়ে আয় করা। ইসমাতের দৃঢ় উচ্চারণ! তিনি বলেন, এই ব্যবসায় আজ পর্যন্ত কোন সাহায্য সহযোগিতা নিইনি। তবু এতদূর আসতে পেরেছি। যেটুকু অর্জন সব আমার পরিশ্রমের ফসল। এখন অনেক সময় এত বেশি অর্ডার আসে যে আর টাকায় কুলোয় না। তখন পার্টির কাছে অর্ডার অগ্রিম টাকা নিতে হয়। এই ব্যাপারে কোন ক্ষেত্র থেকে ক্ষুদ্র ঋণ বা সহযোগিতা পেলে ভাল লাগত।