অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক ‘ক্যু’

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৩৪
‘ক্যু’ সংস্কৃতির কবলে পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলোতে নিজ দলের নেতাদের সরিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। একজন আরেকজনকে সরিয়ে দিতে উঠে পড়ে লাগেন। এজন্য একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করে নিজে সেই পদে আসতেও দ্বিধা করেন না। এই সংস্কৃতি বাড়ছে এবং আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। নিজ দলের মধ্যে একজনকে সরিয়ে আরেকজন ওই পদে বসার প্রবণতা যেন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে দেশে দেশে সামরিক ক্যু কমে আসছে সেখানে গণতান্ত্রিক বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে বিরাজ করছে চরম নিষ্ঠুরতা। কে কাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে সেটাই যেন একটা প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি তৈরি করছে। দলগুলো বিশেষ করে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির মধ্যে এর পরিমাণ বেশি। এমনকি বর্তমানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডও এভাবেই ক্ষমতায় আসীন হন। তবে ১৯৩১ সালের পর সব সরকারই দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। কমনওয়েলভুক্ত দেশটির প্রতীকী প্রধান ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রানি গভর্নর জেনারেল হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন। বিশ্বে বিভিন্ন দলের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়। কিন্তু নিজ দলের মধ্যে নেতৃত্বের যে এত বেশি পরিবর্তন হয় সেটি অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির চরিত্র না দেখলে বোঝা যাবে না। নির্বাচন আসলে এ সম্ভাবনা আরো বেড়ে যায়। এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে গত জানুয়ারিতে ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড। দেশটির রাজধানী ক্যানবেরা এখন বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ক্যু ক্যাপিটাল’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। তর্কসাপেক্ষে বলা যায়, ইতোমধ্যেই পেয়েছে। আর এটা একটা গণতান্ত্রিক দেশের জন্য কতটা ভয়াবহ তা দেশটির রাজনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলেই পাওয়া যায় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বেসামরিক ক্যু’র যে সংস্কৃতি আছে সেটা অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি না দেখলে বোঝা যাবে না। ২০১৩ সালে এটা বাড়তে পারে এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো ঘটছে কোনো রক্তপাত ছাড়াই। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটা রক্তপাতের চেয়েও ভয়াবহ। ২০১০ সালে কেভিন রাডকে দলীয় রাজনীতিতে পরাজিত করে লেবার পার্টির নেতৃত্ব এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন জুলিয়া গিলার্ড। প্রায় আড়াই বছরের মতো রাড তার পদে ছিলেন। ওই সময় দেশটিতে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ারও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কেভিন রাড হেরে যান যখন অস্ট্রেলিয়ার কর্মচারি ইউনিয়নের নেতা রাতে এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। লেবার পার্টি নির্বাচনে বিজয়ী হলে রাডকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। গত বছর নাটকীয়ভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে কেভিন রাড পদত্যাগ করেন। যুক্তরাষ্ট্র সফররত রাড মধ্যরাতে ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডের সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণেই তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, গিলার্ডের প্রতি তার কোনো আস্থা নেই। এরপর তড়িঘড়ি করে নির্বাচন করে দলের নেতৃত্ব নেন গিলার্ড। এরপর রাড আর নির্বাচন করেননি। তিন মাস আগে দেশটির উত্তরাঞ্চলের এক মুখ্যমন্ত্রী টেরি মিলসকে জাপানে অবস্থানকালে পদত্যাগ করতে হয়। অস্ট্রেলিয়ান লেবার পার্টির এই নেতা ছয়মাসও নিজ দলে টিকে থাকতে পারেননি। তার আগেই তাকে সরে যেতে হয়। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় লেবার পার্টির নেতা ইসোবেল রেডমন্ডকে সরে যেতে হয় তার নিজ দলের বিরোধিতার মুখে। কেবল তিনিই নন, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এ ধরনের ঘটনায় তিনজন নেতাকে তাদের পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড গত বছর নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জে রক্ষা পেয়েছিলেন। এবার তাকে আবারো পতনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০১০ সালে তিনি ক্যু’র সুফল ভোগ করেছিলেন। নিজ দলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী কেভিন রাডকে সরিয়ে দিয়ে তিনি দলের সর্বেসর্বা হন এবং দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। অথচ চার বছর আগে জুলিয়া গিলার্ড কেভিন রাডকে সহায়তা করেন তার পূর্বসূরী কিম বিজলেকে সরাতে। গত এক দশকেই লেবার পার্টিতে পাঁচবার জাতীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়। রক্ষণশীল দলের দিক থেকে লেবার পার্টিতে এই হার বেশি। গত ছয় বছরেই চারজন নেতার আবির্ভাব হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন জন হাওয়ার্ড, ব্রেনডান নেলসন, ম্যালকম টার্নবুল এবং বর্তমানের টনি অ্যাবোট। সরকার এবং বিরোধী যে পক্ষেই থাকেন না কেন যখন-তখন এদের পদের পরিবর্তন হয় বিখ্যাত ফুটবল দল চেলসির ম্যানেজারের মতো। তাই ক্যানবেরা যে ক্যু’র রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেটি এখন বোঝাই যাচ্ছে। এই সংস্কৃতি শুরু হয় নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের রাজধানী সিডনি থেকে। এই রাজ্যে আট বছরে লেবার পার্টির পাঁচজন নেতার পরিবর্তন হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে দলটির তিনজন প্রধানমন্ত্রী হন। নিউ সাউথ ওয়েলসের এই রোগ যেন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান বিশ্বে এই সংস্কৃতি দেখে হয়তো কেউ হতবুদ্ধি হতে পারেন। যে দেশটি গত ২২ বছরের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয়নি সেই দেশটির নেতারা কেন স্বাভাবিকভাবে নেতা হতে পারছেন না সেটি হয়তো ভাবার বিষয়। এই নির্মমতা হয়তো ওয়েস্টমিনিস্টার এবং ওয়াশিংটনের পরিচালকদেরও বিস্মিত করে। ১১৩ বছরের ইতিহাসে ব্রিটেনের লেবার পার্টির কোনো নেতা অন্য কোনো নেতাকে সরিয়ে দেয়ার কথা চিন্তা করেননি। কিন্তু ব্রিটেনের লেবার পার্টির আদলে গড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টিতে সেটাই ঘটছে। ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে পার্টির নেতা বিল হেডেনকে সরিয়ে বব হককে বসানো হয়। আট বছর প্রধানমন্ত্রিত্বের পর বব হকেরও একই পরিণতি হয়। মন্ত্রিপরিষদের একটি প্রতিনিধি দল তার কাঁধে হাত রেখে তাকে পদত্যাগ করতে বলেন এবং তিনি পদত্যাগ করেন। পল কেটিং নামের এক নেতা শীর্ষ পদে আসেন এবং ছয় মাস পরে তিনিও চলে যেতে বাধ্য হন। বব হকই পর পর চারবার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার খ্যাতি লাভ করেন। তবে পল কেটিংই তাকে ক্ষমতায় আসতে মূল ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর এই খেলা সাধারণ জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেকের কাছে এটি রাজনৈতিক হাস্যরসে পরিণত হয়েছে। আর রাজনৈতিক খেলার খবর তাদের প্রচার মাধ্যমেও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে রেডিও-টেলিভিশনের আলোচনায় স্থান পায়। সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি তথা সমালোচনা চলছে।