কুর্দিদের সমস্যা সমাধানে স্বাধীন কুর্দিস্তান জরুরি?

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৩৬
কুর্দি গোয়েন্দা কর্মকর্তা উইসাম জুমাই নিহত— এ খবরটা চাউর হয়ে গিয়েছিলো হত্যার পরের দিনই। ঠিক পনেরো দিন খোঁজাখুঁজির পর তার বিচ্ছিন্ন ও প্রায় গলিত দেহ পাওয়া গিয়েছিলো ইরাকের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সাদিয়াহ্’র এক নির্জন প্রান্তরে। এতেও আফসোস মিটেনি হন্তারকদের; উইসাম জুমাইয়ের পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও তার বন্ধু-বান্ধবদের মোবাইল ফোনে এখনো অনবরত মেসেজ আসছে, ‘পালাও অথবা মরো। অবশ্যই বেছে নিতে হবে দুটির একটিকে। নইলে অপেক্ষা করছে জুমাইয়ের পরিণতি।’ চাচাতো ভাইয়ের পাওয়া একটি মেসেজ আরো খোলাখুলি— এবার তোমার পালা; বাঁচতে চাইলে এখনি ভাগো সাদিয়াহ্ থেকে। জুমাইকে মেরে ফেলার পর থেকে সাদিয়াহ্’র অন্তত বিশটি পরিবার পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে আরেক শহর খানাকিনের একটি উপাসনালয়ে। এ শহরটিকে ইরাক সরকার নিজেদের বলে দাবি করলেও নিয়মিতভাবে টহল দেয় কুর্দিদের নিজস্ব বাহিনী। সে জন্যই ইরাকের কুর্দিরা অন্য যে কোনো শহরের চেয়ে নিরাপদ এখানে। খানাকিনে স্থানীয়দের চেয়ে অস্থানীয়দের সংখ্যাই বেশি। আর অস্থানীয় হচ্ছে তারাই, যারা এখানে বংশপরম্পরায় বসবাস করছে না। স্থানীয় ও অস্থানীয় কুর্দিদের পাশাপাশি কিছু আরবও রয়েছে এই খানাকিনে। ইরাকে কুর্দিদের সমস্যা দীর্ঘদিনের। সম্পত্তি বিতর্কে জড়িয়ে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহিষ্কারের সূত্রপাত ঘটেছিলো ১৯৭০’র দশকে। আরবদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এ কাজটি করে যাচ্ছিলেন সুকৌশলে। সেই থেকেই কুর্দিরা স্থানচ্যুত হচ্ছিলো গণহারে। সাদ্দামের পতনের পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছিলো সত্য; কিন্তু মার্কিন সেনাবাহিনী চলে যাওয়ায় এখন আবার তা জটিল আকার ধারণ করেছে। এরভিল ভিত্তিক আধা-স্বায়ত্তশাষিত কুর্দি সরকারের সঙ্গে বাগদাদের কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হচ্ছে। ভালো হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই যেনো। সংখ্যালঘু কুর্দিদের কোণঠাসা করার উদ্দেশ্য নিয়ে কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর তেল সম্পদের ওপর পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার চেষ্টা করছে ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার। কুর্দিদের দুর্দশা ও স্বাধীনতার প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করেই এ কাজটি করে যাচ্ছে তারা। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে কুর্দিরা। যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরাকে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বের চেয়ে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে কুর্দি সমস্যা। ইরাকের নুরি কামাল আল মালিকির নেতৃত্বাধীন শিয়াপ্রধান সরকার সুন্নি উপ-রাষ্ট্রপতি তারিক আল হামিমির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলো। তারচেয়ে বেশি জটিলতা তেরি হতে পারে কুর্দিদের উপর নেমে আসা অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে। কুর্দিদেরকে আরেক সংখ্যালঘু সুন্নিদের মতো ভাবলে কেন্দ্রীয় সরকার মস্ত বড় ভুল করবে। তাদের রয়েছে নিজস্ব বাহিনী, তেল রিজার্ভ, বৈধভাবে পণ্য ঢোকার বন্দর এবং নিজস্ব বৈদেশিক নীতি। এমনকি অনেক দেশে তাদের দূতও রয়েছে। কুর্দি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়াতেই বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। তাদের অভিযোগ— ইরাক কুর্দি অঞ্চলে কর্মরত তেল কোম্পানিগুলোর পেছনে দুরভিসন্ধি নিয়ে অর্থ ঢালছে। বাগদাদের কর্মকর্তারা হঠাত্ করে ক্ষেপে যাওয়ার পেছনেও একটি কারণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারকে পাশ কাটিয়ে এক্সন মবিলের সঙ্গে তেলচুক্তি করেছিলো কুর্দিদের আঞ্চলিক সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাগদাদ সরকার কুর্দিদের জন্য বরাদ্দকৃত কয়েক মিলিয়ন ডলার কেটে নেয়ার হুমকি দেয়। এমন হুমকির পর কুর্দি আঞ্চলিক সরকারের প্রেসিডেন্ট ইরাকের প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসক হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বাগদাদ আমেরিকার সরবরাহকৃত এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে পারে কুির্দদের বিরুদ্ধে। উভয়পক্ষই একে ওপরের বিরুদ্ধে তেল চোরাচালান ও লাভের অংক হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ তুলছে। যদিও দু’দলই তা অস্বীকার করে যাচ্ছে। বাগদাদ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়; আঘাত লাগে আত্মসম্মানে— এমন মন্তব্য করেন বাগদাদে নিযুক্ত কুর্দি সরকারের প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইহসান। কুির্দস্তানকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়ার প্রশ্নে সংবিধানের সংশোধনী আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি; যদিও তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, পশ্চিমা প্রতিপক্ষের কারণে নিকট ভবিষ্যতে এমন প্রত্যাশা করাটা দুরাশার পর্যায়েই পড়ে। উত্তরাঞ্চলীয় দিয়ালা প্রদেশের খানাকিন শহরটির অবস্থান ইরান সীমান্তের কাছাকাছি। আরেক বিতর্কিত শহর জালাওয়া’র মাধ্যমে সাদিয়াহ্ থেকে পরিচালিত হয় এ ক্ষুদ্র শহরটি। জালাওয়াতে আরব ও কুর্দিদের সংঘাত লেগেই থাকে। এ শহরে কুর্দিদের রাজনৈতিক অফিসের বাইরে তিনটি মুরাল রয়েছে। এই তিনটি ছবি যথাক্রমে একজন আরব, কুর্দি ও তুর্কির। সবাই ভাই-ভাই এটি বোঝাতেই এমন আয়োজন। কিন্তু আসলেই কি ভাই-ভাই? এই অফিসের পরিচালক খাদেম মোহাম্মদ দিয়ালার রাজধানী বাকুবা থেকে গোয়েন্দা রিপোর্টের মাধ্যমে জেনেছেন, প্রদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে যে কোনো মুহূর্তে হামলা চালাতে পারে বাগদাদ সরকার। তাই বলে খাদেম মোহাম্মদ ভীত নন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার কাজ চালিয়ে যাবো। আগের মতো দুর্বল নই আমরা। হামলা হলে সমুচিত জবাব দেবো; চাইবো আন্তর্জাতিক সাহায্য।’ বাগদাদে নিযুক্ত কুর্দিদের প্রতিনিধি ইহসান জানান, ইরাকের পরিস্থিতি ধীরে-ধীরে ইসরাইলের রূপ নিচ্ছে। জালাওয়া শহরে অতিসম্প্রতি কুর্দিদের জায়গায় জোর করে একই ধরনের ৪শ’ বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। তার মতে, ইরাকের বিচার ব্যবস্থা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। এখানে অর্থ ঢেলে বিচারের রায় নিজের পক্ষে নেয়া যায়। ব্রুকিংস ইন্টারন্যাশনাল সম্প্রতি ইরাকের বিচার ব্যবস্থাকে ‘হতাশাব্যঞ্জক’ উল্লেখ করেছে। ইহসান সরাসরিই বলে দিয়েছেন, স্বাধীন কুর্দিস্তান গঠিত হলেই কেবল কুর্দিদের সমস্যা দূর হতে পারে। আর তখন সারা ইরাক থেকে কুর্দিরা গিয়ে ওখানে থিতু হতে পারবে।