মুক্তিযুদ্ধে যেসব হূদয়বান ভিনদেশি মানুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের আবারো সম্মান জানালো বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে স্বার্থ-দ্বন্দ্ব, হানাহানি ও ঘৃণ্য রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে উচ্চারিত হলো মানুষকে ভালোবাসার কথা। প্রমাণিত হলো মানব মুক্তির লড়াইয়ে দেশ, রাষ্ট্র, জাতি কোন বাধা নয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক নানাভাবে সহযোগিতা করেন। একই ভাবে এগিয়ে আসে বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন। বিশ্বের কাছে তারা তুলে ধরেন পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যার কথা, বাঙালির স্বাধিকারের দাবির কথা।
মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া এইসব প্রাণিত মানুষের জন্য এদেশের মানুষের মনে ভালোবাসা যেন চির অক্ষয়। সেই নিঃস্বার্থ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের হূদয় উত্সারিত ভালোবাসার সেই দায় যেন মোচন করলো সরকার। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর আরো একবার প্রমাণিত হলো বাঙালি জাতি এক বিশাল হূদয়ের অধিকারী। দেরি হলেও, কিন্তু তারা ভোলেনি এই বন্ধুদের অবদান।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য গতকাল রবিবার সরকারি উদ্যোগে সম্মাননা দেয়া হলো ৬৮ বিদেশি ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে দু’জনকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ দেয়া হয়। এরা হলেন— কিউবার সাবেক প্রসিডেন্ট ড. ফিদেল ক্যাস্ট্রো রুজ ও ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লর্ড হ্যারল্ড উইলসন। তাদের পক্ষে প্রতিনিধিরা এ সম্মাননা গ্রহণ করেন। এছাড়া ভারতের ৪২জন, পাকিস্তানের ১৩, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪, কিউবার ১, নেপাল ৩, জাপান ২, ইংল্যান্ড ১, অস্ট্রেলিয়া ১ এবং সুইডেনের ১ জনকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠান বিভাগে সম্মাননা দেয়া হয় ইন্ডিয়ান রেডক্রস সোসাইটি, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখাকে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা সম্মাননা দেয়া হয় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। গত বছরের ২৫ জুলাই তার পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধীর হাতে এই সম্মাননাপত্র তুলে দেয়া হয়। এরপর গত বছর ২৭ মার্চ দ্বিতীয় পর্বে ৮৩ জন, তৃতীয় পর্বে গত ২০ অক্টোবর ৬১ জন, গত ১৫ ডিসেম্বর চতুর্থ পর্বে ৬০জন বিদেশি বন্ধু এবং গত ৪ মার্চ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে সম্মাননা দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও বক্তৃতা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, মুক্তিযু্দ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম এবং সম্মাননা প্রাপ্তদের পক্ষে জাপানের প্রফেসর তোমিও মিজোকামি। এতে মানপত্র পাঠ করেন মন্ত্রী পরিষদ সচিব এম মোশাররাফ হোসেইন ভূঁইয়া।
দীপু মনি বলেন, বাংলাদেশের জন্যে এই বন্ধুত্ব উদযাপন এক গৌরবের ক্ষণ। আজ আমরা উপলব্ধি করছি, ৪২ বছর আগে কীভাবে বিদেশিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছিল। তাদের সম্মাননা জানিয়ে নিজেরা সম্মানিত বোধ করছি।
এ বি তাজুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের আয়োজনের ফলে দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় থাকবে সম্মানিত বিদেশি বন্ধুদের।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতির জন্য শোক
আমন্ত্রণপত্রে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানের নাম। সম্মাননা প্রদান করবার কথা ছিল তার। অথচ তিনি নেই। রাষ্ট্রপতি শূন্যতা শোক হয়ে বিরাজ করছিল পুরো অনুষ্ঠানে। শুরুতেই রাষ্ট্রপতির স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তৃতার শুরুতেও রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
‘আপনাদের সোনার বাংলাকে আমিও ভালোবাসি’
বিদেশি এইসব বন্ধুদের সবার অনুভূতির প্রতিধ্বনি ছিল জাপানের তোমিও মিজোকামির কণ্ঠে। বাংলা ভাষায় তার দেয়া বক্তৃতা অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের চমকে দেয়। তিনি বলেন, আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি যে, ১৯৭১ সালের আমার একটি লেখনীর জন্য আমাকে বাংলাদেশ এই সম্মাননা দেবে। পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যার বিরুদ্ধে জাপানে আমি জনমত তৈরিতে লিখেছিলাম। এতদিন পর বাংলাদেশ সরকার সেই কাজকে মনে রেখে সম্মাননা দেয়াতে আমি মুগ্ধ। তিনি বলেন, সমস্ত পৃথিবী দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের জন্য বাংলাদেশকে চিনছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য এ প্রাপ্তি। আমরা আশাকরি বাংলাদেশ আগামীতে শত্রুমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আপনাদের সোনার বাংলাকে আমিও ভালোবাসি।
অরোরার নাম ঘোষণা হতেই জেগে উঠলো মিলনায়তন
লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা পদ্মবিভূষণের নাম ঘোষণা করতেই পুরো মিলনায়তন যেন জেগে উঠলো। এই নামটি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। মিলনায়তনের প্রতিটি মানুষের মত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তুমুল হর্ষধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানালেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশীদার সেই ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধির হাতে পুরস্কার তুলে দেয়ার জন্য। এ সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া অনেক মুক্তিযোদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে তার সম্মাননা গ্রহণ সময়টিকে অভিবাদন জানালেন। জগজিত্ সিং অরোরার পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মহিন্দর সিং।
যারা সম্মাননা পেলেন
এ সম্মাননা প্রদান পর্বে ৬৮জন ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেয়া হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন—পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসু, পাকিস্তানের রাজনীতিক বেগম নাসিম আখতার, ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান শংকর রায় চৌধুরী, ভারতীয় জাদুকর পিসি সরকার জুনিয়র, নেপালের রাজনীতিক ড. নারায়ণ খাদকা, নেপালের সাবেক মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা ড. রাম সরণ মাহাত, পাকিস্তানি আইনজীবী জাফর মালিক, ভারতীয় মানবাধিকার কর্মী উত্পলা মিশ্র, জাপানী অধ্যাপক ও সমাজকর্মী তোমিও মিজোকামি ও হেইজি নাকামুরা, ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের সাবেক জিওসি লে. জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা, পাকিস্তানের মানবাধিকার কর্মী বেগম তাহিরা মাজহার আলী, ভারতীয় লেখক ও দার্শনিক আবু সায়ীদ আইয়ুব, সাবেক ভারতীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, পাকিস্তানি কবি ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, অস্ট্রেলীয় অধ্যাপক হারবার্ট ফেইথ, যুক্তরাষ্ট্রের কবি ও সমাজকর্মী অ্যালেন গিনসবার্গ, পাকিস্তানি কবি ও রাজনীতিক হাবিব জালিব, পাকিস্তানি রাজনীতিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শামীম আশরাফ মালিক, পাকিস্তানি অধ্যাপক ও সাংবাদিক ওয়ারেস মীর, পাকিস্তানি রাজনীতিক কাজী ফিরোজ মোহাম্মদ, ভারতীয় সাংবাদিক জিতেন্দ্র চন্দ্র পাল, পাকিস্তানি কবি ও মানবাধিকার কর্মী আহমদ সেলিম এবং সাবেক ভারতীয় তথ্য ও সমপ্রচার মন্ত্রী নন্দিনী সতপথি। সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি করে ক্রেস্ট ও একটি সম্মাননাপত্র গ্রহণ করেন।
