তিন দিন অতিবাহিত হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি নেই। পানির কলগুলো উপড়ে গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া টর্নেডো বিধ্বস্ত এলাকায় খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত লোকবল নেই। তাই ধ্বংসাবশেষ সম্পূর্ণ অপসারণ হয়নি। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। রবিবার পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির উদ্যোগে বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ তত্পরতা চালালেও সমন্বয়ের অভাবে ক্ষতিগ্রস্তরা প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের দাবি করলেও এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ এলাকায় ত্রাণ পৌঁছেনি বলে ভুক্তভোগীরা জানান। সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আঁছড়ে পড়ায়। দর্শনার্থীদের কারণে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্তরা। দল বেঁধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসছে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ঘুরে দেখার জন্য। আবার কোনো কোনো ত্রাণ বিতরণকারী ছবি উঠানোর আশায় ত্রাণ নিয়ে আসছে। এমনিতেই কেউ পুত্র, কেউ কন্যা, কেউ পিতা-মাতা হারিয়েছে ভয়াল টর্নেডোর ছোবলে। তাদের দীর্ঘ দিনের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে। তারপরও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নতুন জীবনের আশায় আবারো ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে।
আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আসবেন। বিকাল ৩টায় তিনি আসবেন বলে জানা গেছে। টর্নেডোর পর থেকে চান্দি, উরশিউড়া, জারুলতলা, আমোদাবাদসহ বিভিন্ন গ্রামে চোরের উত্পাত বেড়ে গেছে। সরজমিনে ভাতশালা ও চান্দিগ্রাম এবং ফুলবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজন বাতাসে উড়িয়ে যাওয়া জিনিসপত্র খুঁজে জড়ো করছে। বাড়িঘরে আবর্জনা অপসারণ করছে। গৃহবধূ হেলা বেগম (৩৫) জানান, তিন দিন ধরে বিদ্যুত্ নেই। বাড়িঘর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পল্লী বিদ্যুত্ থেকে লোকজন এসেছিল। তারা কিছু বলেনি। মিটার খুলে নিয়ে গেছে। ভাতশালা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তার এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আবুল কাশেম জানান, কেউ আমাদের সহযোগিতা করতে আসেনি। নির্বাক হয়ে যাওয়া লাকী আক্তার (২৫) জানান, আমার নিজের বাড়িও শেষ, শ্বশুর বাড়িও শেষ।
চান্দি গ্রামের হেলাল মিয়া এ প্রতিবেদকে জানান, আমার বোনের স্বামীকে গুরুতর আহত অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কুমিল্লা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে মর্গে গিয়ে টর্নেডোর সময় নিখোঁজ থাকা আমার বোন আরশেদা বেগম-এর (৪০) মৃত দেহ দেখতে পাই। গত শনিবার রাতে লাশ নিয়ে এলাকায় আসি। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করি। চান্দি গ্রামের জলিল মিয়া আক্ষেপ করে জানান, টর্নেডোর তাণ্ডবে সব বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু ভিটে-মাটি রয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ টিউবওয়েল উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। ভাতশালা গ্রামের আমেনা বেগম (৪২) জানান, আমার দুইটি ঘর ধ্বংস হয়ে গেছে। খাবার পানি পর্যন্ত নাই। পুকুরে জীবজন্তু মরে ভেসে আছে। ফুলবাড়িয়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, রবিবার দুপুর পর্যন্ত তারা সরকারি কোনো ত্রাণ পায়নি। এমনকি কেউ কোনো খোঁজ নেয়নি।
