পাকিস্তানের প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর মনে করেন, একাত্তর সালে পাকিস্তান যা করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। একসঙ্গে এগিয়ে যাবার জন্য বাংলাদেশকে ক্ষমা করা শিখতে হবে। কারণ আমরা একই পৃথিবীতে বসবাস করি। দুই দেশেই নতুন থেকে নতুনতর প্রজন্ম এসেছে। এখন এগিয়ে যেতে হবে। মানুষ যেন মনে করে, প্রতিশোধ নেয়া হয়নি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একাত্তরে পাকিস্তানের প্রখ্যাত লেখক ও রাজনীতিক মানিক গোলাম জিলানীর কন্যা আসমা জাহাঙ্গীর। তখন বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় ও সরব অবস্থান নেয়ায় পাকিস্তান সরকার গোলাম জিলানীকে ব্যাপক নির্যাতন করে।
পাক বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদ করায় তাকে দেশদ্রোহী আখ্যা দেয় সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোলাম জিলানীর ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। লাহোরে তার বাড়িতে থেকেই ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রণয়ন ও ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। আসমা জাহাঙ্গীর তার বাবার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা নিতে শনিবার ঢাকা আসেন। ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, আমি আজ অনেক সম্মানিত বোধ করছি। বাবা বেঁচে থাকলে তিনিও খুশী হতেন সম্মান ও স্বীকৃতির জন্য।
একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা ও অত্যাচার প্রসঙ্গে আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, গণহত্যা ছাড়া একে আর কি বলা যায়? সেটি ছিল মানবাধিকার লংঘনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।
পশ্চিম পাকিস্তানের বাতাসে তখন উন্মত্ততা। সারা বিশ্বের কণ্ঠ ছিল বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে। গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাইলে যদি মানুষ খুশি হয়, তবে তাতে ক্ষতি নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি, শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই একটি ব্যবস্থা থাকা দরকার যা পরিবর্তনকারী ন্যায়বিচার (ট্রানজিশনাল জাস্টিস) প্রতিষ্ঠা করে। বিজয়ীর দ্বারা এই বিচার হওয়া উচিত নয়। এখানে যথাযথ প্রক্রিয়া থাকা উচিত। আমি মৃত্যুদণ্ডে বিশ্বাসী নই।
তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের ন্যায়বিচার হতে পারে। তবে তা বিরোধ সৃষ্টি না করে ক্ষত প্রশমন বা পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে হতে হবে। বিজয়ীর দ্বারা বিচার হলে অনেক সময় সমাজে আরো বিরোধ সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ থেকে শিখতে হবে। সর্বোপরি আমাদের এ বিশ্বে কিন্তু একসঙ্গে বসবাস করতে হবে। আমরা একে অন্যকে দূরে রাখতে চাইতে পারি না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা কেবল অন্যান্য দেশের লোকজনকেই সম্মাননা দেয়নি, পাকিস্তানের লোকজনকেও দিয়েছে। যারা ওই দুর্দিনে এ দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলেছে এতে তাদের স্বীকৃতি দেয়া হলো।
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, আমি এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো গবেষণা করিনি। নীতিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো ক্ষেত্রেই যথাযথ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে জনগণ বিশ্বাস করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে যা হয়েছে তার অবশ্যই ন্যায়বিচার হতে হবে। আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, অতীত কখনো বাংলাদেশ-পাকিস্তান সুসম্পর্কে বাধা হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, দেশ ভাগের সময় আমরা উভয়পাশেই নৃশংসতা দেখেছি। আমরা যদি সেখানেই পড়ে থাকি তাহলে ভারতের সঙ্গে আমাদের (পাকিস্তান) কখনো চলার মতো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে না।
