খাগড়াছড়িতে তীব্র পানি সংকট

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৩
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জেলার কয়েকশ সরকারি-বেসরকারি স্কুলের সুপেয় পানির উত্সগুলো বিকল হয়ে পড়ায় কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের খুবই অসুবিধা হচ্ছে। ভয়াবহ বিদ্যুত্ সংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়ে পানির কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক উত্সগুলো অকেজো হওয়ার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া দেখভালের অভাবে জেলা সদরসহ পাহাড়ি গ্রাম-গঞ্জে স্থাপিত পাঁচ হাজারেরও বেশি গভীর ও অগভীর নলকূপ, তারা পাম্প এবং পাতকূপ দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় পরিস্থিতি আরো অসহনীয় হয়ে উঠেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির এই সংকট আরো বাড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, জেলার সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির চাহিদার মাত্র ৫৮ ভাগ পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ। গত দেড় যুগ ধরে জেলায় বিশুদ্ধ পানীয় জলের উত্স সৃষ্টি করার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, জেলা পরিষদ ও অন্যান্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী অর্থ যোগান দিয়েছে। কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে তৃণমূল পর্যায়ে বরাদ্দের অধিকাংশই কার্যকর হয়নি। যেমন জেলার ৮ উপজেলার দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলেই গভীর বা অগভীর নলকূপ স্থাপিত হয়নি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ জেলায় নলকূপ স্থাপনে যে পদক্ষেপ নিয়েছে তাও পর্যাপ্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এদিকে গত কয়েক বছর ধরে জেলার অধিকাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নীচে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থা শুষ্ক মৌসুমে প্রকট আকার ধারণ করে। যার ফলে জেলার অধিকাংশ অগভীর নলকূপ, তারা পাম্প ও পাতকূপগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার ৮ উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নে প্রায় নয় হাজার নলকূপের মধ্যে বর্তমানে ৩ হাজারই অকেজো অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ২০৮টি অগভীর নলকূপের মধ্যে ৪৯১টি, ২ হাজার ১৪৫টি গভীর নলকূপের মধ্যে ৭৯৭টি, ১ হাজার ৭১৩টি তারা পাম্পের মধ্যে ৫২৯টি এবং ২ হাজার ১৯৩টি পাতকূপ বা রিংওয়েলের মধ্যে ৪৫৬টিই বিকল হয়ে রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সরকারিভাবে স্থাপিত এসব পানির উত্স সুবিধাভোগীরা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সময়মত মেরামত ও দেখভাল না করায় একবার অকেজো হয়ে পড়ার পর আর খুব সহজেই সচল করে তোলা হয় না। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের সুবিধা নিশ্চিত রাখতে যে পরিমাণ লোকবলের প্রয়োজন তার অর্ধেক লোকবলও বর্তমানে নেই বলে কর্মকর্তারা দাবি করেন। এদিকে স্থানীয়ভাবে অনেক চেষ্টা করেও দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়ন, পানছড়ি উপজেলার লোগাং ইউনিয়ন ও মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নে বেসরকারিভাবে নলকূপ স্থাপনের চেষ্টা ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এই উপজেলায় যেসব টিউবওয়েল রয়েছে তা অধিকাংশই অকেজো। যার ফলে দুর্গম এলাকাবাসী সবসময়ই নিরাপদ পানি হতে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া ৪ বছর আগে দীঘিনালায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ লাখ গ্যালন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মিত হলেও বিদ্যুত্ সংযোগ না দেয়ায় প্লান্টটি চালু করা যাচ্ছে না । জেলা সদরের পৌর এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির আয়রন দূর করার লক্ষ্যে স্থাপিত ৯টি উত্পাদক কূপের মধ্যে ৫টিই দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে রয়েছে। পৌর এলাকায় পৌনে এক লাখ মানুষের বিশুদ্ধ পানীয় জলের চাহিদা পূরণের জন্য যেখানে প্রতিদিন ১০ লাখ গ্যালন পানি দরকার সেখানে বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ গ্যালন পানি উত্পাদন ও সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র মো. রফিকুল আলম বলেন, জনস্বাস্থ্য বিভাগের সরবরাহকৃত পানি পান করা তো দূরের কথা গোসল ও ধোয়ামোছার কাজেও ব্যবহার করা যায় না। স্থানীয় এনজিও ‘আনন্দ’র কর্মকর্তা শ্যামল রোজারিও ও নাগরিক কমিটির প্রতিনিধি মো. আকবর হোসেন বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নানা অব্যবস্থাপনার কারণে জেলার অধিকাংশ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। তারা শহরের পানি সরবরাহের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন। তবে বিদ্যমান পানীয় জলের সংকটের জন্য ঘন ঘন বিদ্যুত্ বিভ্রাট ও অতিমাত্রার লো-ভোল্টেজকে প্রধানত দায়ী করেছে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ।