দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে হাসপাতালে ধুঁকছে পথশিশু শুভ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৩
‘অন্য দশজনের মত আমিও পরিশ্রম করে এ সমাজে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই ভাগ্য কেড়ে নিয়েছে ঘাতক ট্রেন। আমি বাঁচতে চাই, তবে ভিক্ষা করে না।’ কথাগুলো বলছিল ছিন্নমূল পথশিশু শুভ (১০)। বাড়ি বরগুনায় হলেও ওর ঠিকানা এখন রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল। কিছুদিন আগে ট্রেন দুর্ঘটনায় এক পা হারিয়েছে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। তবে তার এই দুর্ঘটনার খবর পরিবারের কেউ জানে না। হাসপাতাল থেকেই তাকে ওষুধ ও খাবার সরবরাহ করা হয়। আয়া হামিদা বেগম সন্তানের মত দেখাশুনা করেন। তাকেই মা বলে ডাকে শুভ। গত শনিবার সত্ পিতার বটির আঘাতে দুই হাত হারানো শিশু শান্তর সঙ্গে কথা বলতে পঙ্গু হাসপাতালে গেলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় শুভর। শান্তর পাশের বেডেই ও চিকিত্সাধীন। বাম পা হারিয়ে আর ডান পায়ে গুরতর জখম নিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তার জীবনের করুণ কাহিনী পত্রিকায় লেখার জন্য অনুরোধ জানায় শুভ। শুভ’র সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলা সদরের বাসিন্দা নৌকার মাঝি আব্দুল লতিফ তার বাবা। তারা দুই ভাই ও এক বোন। বড় ভাইয়ের নাম রাকিব ও বোনের নাম আমেনা। শুভ সবার ছোট। মা ময়না বেগম অন্যের বাসায় কাজ করেন। দারিদ্র্যতার কারণে ঠিকমতো খেতে পেত না। দু’মুঠো ভাতের জন্য অবশেষে বছরখানেক আগে সে বাড়ি ছেড়ে লঞ্চযোগে রাজধানীর সদরঘাটে চলে আসে। সেখান থেকে ফুটপাতে খেয়ে না খেয়ে শুরু হয় তার নতুন জীবন। কাগজ টুকিয়ে বিক্রি করে কোনরকম জীবিকা নির্বাহ করতো। দিনে দেড় থেকে ২শ’ টাকা আয় করতো। এভাবে দিনে কাগজ কুড়িয়ে, বিকালে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে তার সময় কাটতো। একদিন কি মনে করে কমলাপুরে গিয়ে ট্রেনে চড়ে সে চলে আসে টঙ্গী। সেখানে গিয়ে দেখে তার মত আরও কয়েকজন শিশু টোকাই। সে-ও তাদের সঙ্গে ভিড়ে যায়। সারাদিন কাজ করে রাতে ঘুমায় রেল স্টেশনেই। দুর্ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে শিশুটি জানায়, গত ১৬ মার্চ টঙ্গী রেল স্টেশনে একটি ট্রেনের ইঞ্জিনে উঠে বসে শুভ। হঠাত্ দুই কিশোর সেখান থেকে তাকে নেমে যেতে বলে। সে রাজি না হলে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এক পর্যায়ে ট্রেনটি চলা শুরু করে। ওই সময় কিশোরদের একজন তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। এ সময় তার বাম পা’টি ট্রেনের চাকার নিচে চলে যায়। মুহূর্তের মধ্যে কাটা পড়ে পা’টি । জ্ঞান হারিয়ে ফেলে শুভ। এ সময় ডান পায়ে গুরুতর আঘাত পায় সে। পরে জিআরপি পুলিশ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যায়। গত ১৭ মার্চ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. ফারুক আহমদের অধীনে শুভর চিকিত্সা শুরু হয়। বর্তমানে শুভ শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ। কিন্তু বাম পা’টি না থাকায় সেই জায়গার দিকে সারাদিন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। একটি নির্মম দুর্ঘটনা তার জীবনকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। পা হারিয়ে সে এখন প্রতিবন্ধী। ‘কাজ করবো কিভাবে? ভিক্ষা ছাড়া আর মনে হয় বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না’- এই কথা বলে শুভ কাঁদতে থাকে। শুভর কান্নায় ওয়ার্ডে উপস্থিত অনেকেরই চোখ ভিজে ওঠে। শুভ হয়তো শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু আগের মতো হাঁটতে বা দৌড়াতে পারবে না। কাজ করে জীবনধারণ করতে পারবে না। হাসপাতালের বেডে শুয়ে সেই ভবিষ্যত্ প্রতিবন্ধী জীবনের কথা ভেবেই হয়তো শুভ চিন্তিত। কর্তব্যরত চিকিত্সকরা জানান, শুভ সুস্থ হলেও তাকে ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই তাকে চলতে হবে। কৃত্রিম পা লাগানোরও সুযোগ নেই বলে জানান চিকিত্সকরা।