বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাঙালি জাতির চেতনায় উজ্জীবিত ছাত্র সংগঠন। শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই নয়, মননশীলতা আর চিন্তা-চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি—সবকিছু মিলে উজ্জীবিত ছিল সংগঠনের সত্তা। সংগঠনটির অন্তস্তলে প্রোথিত ছিল এ দেশের মাটির প্রতি গভীর মমতা। তাই বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচির মধ্যে ছাত্রলীগ স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত ছিল উজ্জীবিত।
তখনকার রাজনীতি ৬০ দশকের রাজনীতি। অবশ্য কিঞ্চিত ধারায় বিভক্ত ছিল। একদিকে এনএসএফ এবং ইসলামী ছাত্র সংঘ পাকিস্তানকে কেয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী রাখতে চেয়েছিল। অন্যদিকে ছাত্র ইউনিয়ন তারা আবার মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী ছিল। প্রগতিশীল রাজনীতির কথা বললে তারা সমগ্র বিশ্বের শোষিত মানুষের কথাই বিশ্বাস করতেন। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ থাকার জন্য তারা সিআইয়ের দালাল বলে অভিহিত করতেন। ভারতের দালাল বলে ধিক্কার দিতেন। এই দ্বিমুখী প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করেই আমরা সামনের দিকে এগিয়েছি। ’৬৬-’৬৯ পর্যন্ত ছাত্রলীগ এককভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রূপকার হিসেবে কাজ করেছে। কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কোনো সংশয়, কোনো বিভক্তি ছিল না সংগঠনটির মধ্যে। ’৬৬-এর আন্দোলনে আমি কারাবরণ করি এবং ’৬৯-এর ১১ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে বের হয়ে দেখলাম ছাত্রলীগের একটি অংশ পুরোমাত্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছে যে, ক্ষমতার সকল উত্স বন্দুকের নল এবং নির্বাচন একটি প্রহসন মাত্র। তাই তারা কোনোরকম গণতান্ত্রিক পন্থা অনুসরণ না করে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্যে ক্ষমতায় যেতে চায়। তাই সংখ্যার ভিত্তিতে আসন গঠিত হওয়ায় আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তার ওপর ভিত্তি করেই আমরা ’৭০-এর নির্বাচনকে এবং স্বাধীনতাকে স্বাধিকারের আবরণে লুকিয়ে রেখে একটি ম্যান্ডেড চেয়েছিলাম। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপ্লবপন্থীরা নির্বাচনকে বর্জন করে সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না। বিপ্লবের প্রসবযন্ত্রণায় অস্থির ওই অংশটি হয়তো উপলব্ধি করতে পারেনি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সাড়ে সাত কোটি মানুষ কতটুকু ঐক্যবদ্ধ এবং প্রত্যয়ে উজ্জীবিত। সত্তরের অবিস্মরণীয় এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত নিরঙ্কুশ গণরায় শুধু বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেনি। স্বাধিকারের এই আবরণকে ছুড়ে ফেলে স্বাধীনতার পক্ষে তারা ঝুঁকে পড়ে। যারা কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকার, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে স্বীকার করেনি, তারা বিস্ময়াভিভূতভাবে এই রায়ের অন্তর্নিহিত সত্তাকে অস্বীকার করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশনকে স্থগিত করতে বাধ্য করে। ১ মার্চ একটি গণবিরোধী বেতার ভাষণের মাধ্যমে যখন এই ঘোষণাটি আসে, তখনই সারা বাংলাদেশ রোষে ফেটে পড়ে এবং সরাসরি স্বাধীনতার ধ্বনিতে সারা শহর প্রকম্পিত করে তোলে। এখানে স্পষ্ট করে জানাতে চাই, তাদের এই ষড়যন্ত্রের নীল নকশাটি সম্পর্কে আমরা আগেই অবগত ছিলাম। বঙ্গবন্ধু পূর্বাণীতে পাক জাতীয় পরিষদের সদস্যদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন—এই ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের কী হবে। আমরা ওত্ পেতে ছিলাম ঘোষণাটি এলেই আগ্নেয়গিরির লাভার মতো সমস্ত ঢাকা শহর জ্বালিয়ে তুলব। হলোও তা-ই। অসংখ্য মিছিল, মিছিলের শহর ঢাকা মহানগর সমুদ্রের গর্জনের মতো স্বাধীনতার স্লোগানে উচ্ছ্বসিত হতে থাকে। আমরা পূর্বাণীতে গেলাম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পাবার আশায়।
আমরা চারজন এবং প্রবীণ নেতাদের অনেকেই পূর্বাণীতে উপস্থিত হই। আমি অত্যন্ত সন্তর্পণে এবং সতর্কাবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে বললাম, নির্বাচন আপনাকে একক নেতৃত্বে অভিষিক্ত করছে। তাই আগামী দিনের স্বাধীনতার আন্দোলনটি আপনার একক নেতৃত্বে করতে হবে। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো ’৫২, ’৬২ ও ’৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান ছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে বঙ্গবন্ধু আমার যুক্তিকে দ্বিধাহীনভাবে সায় দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদ গঠন করার প্রস্তাব দেন। এবং পরবর্তী সময়ে পল্টন জনসভায় ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদ। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার আন্দোলন পরিচালনা করবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বকালের সর্ববৃহত্ ছাত্র-জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আমরা জানতে পারি, বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছেন ৩ মার্চ সভা করতে এবং তিনি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন। এখানে একটি দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংশয়মুক্ত করবার জন্য একটি সত্যকে আমি অবিচলিতচিত্তে তখনকার সকলকে সাক্ষ্য রেখে বলতে চাই—২ মার্চ স্বাধীন বাংলা পতাকা উত্তোলনের কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি ছাত্রলীগের ছিল না, বঙ্গবন্ধুও কোনো নির্দেশ দেননি। জনসমুদ্রে উদ্বেলিত জনতার সম্মুখে সার্জেন্ট জহুরুল হক ব্রিগেডের যে পতাকাটি ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি ছিল সেই পতাকা। কলা ভবনের ছাদের মঞ্চে আমরা চারজন উপস্থিত ছিলাম। সভাপতির নাম ঘোষিত হয়েছে। ছাদে আবদুল কুদ্দুস মাখনের পর শাহজাহান সিরাজ বক্তৃতা করছিলেন এবং ঠিক সেই মুহূর্তে ওই পতাকাটি নিচ থেকে ওপরের দিকে তখনকার ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদ নজরুল ইসলাম পতাকাটি মঞ্চের দিকে এগিয়ে দিলে আ স ম আব্দুর রব সেটি গ্রহণ করেন এবং আমরা সকলেই এটিকে নাড়তে থাকি। তখন এটি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার পতাকা উল্লিখিত হতো, তাহলে ৩ মার্চ সব পত্র-পত্রিকায় এ সংবাদটি প্রচারিত হতো। ২ মার্চের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হিসেবে এটি উল্লিখিত হতো। এর জন্য পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে পতাকা উত্তোলনের জন্য যে ব্যবস্থা সেটিও প্রতিস্থাপিত হতো এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা তুললে ওই সভার সভাপতি হিসেবে অনিবার্যভাবে অধিকারটি আমারই হতো। ৩ মার্চ পল্টন জনসভায় বঙ্গবন্ধু উপস্থিত ছিলেন আর শাহজাহান সিরাজ ঘোষণাপত্র পাঠ করে শোনান। ওই সভায় ৭ মার্চের ভাষণ দেবেন বলে ঘোষণা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর ৩ মার্চের অনুষ্ঠানে আসার উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনে যেন বিঘ্ন না ঘটে। আমি অতি বিনীতভাবে স্বীকার করি, যদিও সকল সভার সভাপতিত্ব আমি করেছি, তাই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশকেই সবসময় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে মান্য করেছি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভাতেও সংগ্রাম পরিষদেরই নেতৃত্ব ছিল। স্লোগানে স্লোগানে, খণ্ড খণ্ড বিক্ষিপ্ত বক্তব্যে আমরা ৭ মার্চের জনসমুদ্রকে ভিসুভিয়াসের মতো জাগিয়ে তুলি। তারপর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলন জাতিকে ক্রমান্বয়ে দল-মতনির্বিশেষে স্বাধীনতর চেতনায় এক কাতারে দাঁড় করায়।
২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হতো। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর সর্বত্র এমনকি সচিবালয়েও পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো হতো। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে আমরা ২২ মার্চ সংবাদপত্রের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রদান করি এবং ওই দিন সারা বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলিত হবে বলে ঘোষণা দিই। ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে লাখ মানুষের এবং ছাত্র-জনতার সমাবেশে প্রথমে করুণ বিউগলে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বেজে ওঠে। মন্টু, খসরুর নেতৃত্বে মঞ্চে স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ অভিবাদন গ্রহণ করেন। সম্পূর্ণ সামরিক কায়দায় ব্যান্ড বাজিয়ে প্যারেড করে ৩২ নম্বরে যেখানে বঙ্গবন্ধু পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিলেন, সেখানে আমি প্রথমে পতাকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করি। এবং পতাকাটি হাতে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ঊর্ধ্বে উত্তোলিত করে একটি স্লোগান প্রদান করেন ‘জয় বাংলা’। স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদের পক্ষ থেকে আমাদের ঘোষণা ছিল, যেকোনো কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো হবে, এর বাইরে তার কোনো মূল্য নেই।
